রূপগঞ্জ উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নের হাটাবো বাজার সংলগ্ন এলাকায় বেড়িবাঁধ ও শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে জেটি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে শুকতারা গ্রুপ ও নুরজাহান গ্রুপ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই চলছে এ দখলদারিত্ব। সম্প্রতি হাইকোর্ট নদীতীরের দেড়শ ফুট এলাকাকে নদীর সীমানা ঘোষণা করলেও তার তোয়াক্কা করছে না শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুটির কর্তৃপক্ষ বরং শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলার ভেকুর মাধ্যমে উপড়ে ফেলে নদী ভরাট করে চলেছে তারা। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করতে গেলেই ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের লোকজন মামলা-হামলার হুমকি দিচ্ছে। এতে কেউ আর প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় অর্ধশত বছর আগে কৃষি জমি চাষ ও জনগণের বসবাসের স্বার্থে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে রূপসী থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে সরকার। ওই বেড়িবাঁধটি এখন পাকা সড়কে পরিণত হয়েছে। হাটাব বাজার সংলগ্ন বেড়িবাঁধের জমিতে ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে নুরজাহান গ্রুপ নামক একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমে বালুর ব্যবসা শুরু করে। পরে ধীরে ধীরে নদী ভরাট করতে থাকে তারা। পাশাপাশি শুকতারা গ্রুপ নামের অপর একটি প্রতিষ্ঠানও একই কায়দায় বেড়িবাঁধ দখলশেষে শীতলক্ষ্যা নদীও দখল করার লক্ষ্যে ভরাটের কাজ শুরু করে।
মাস ছয়েক আগে রূপগঞ্জের তত্কালীন ইউএনও আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম (বর্তমানে এডিসি ঢাকা) ও এসিল্যান্ড আসাদুজ্জামান (বর্তমানে ইউএনও শিবচর) সরেজমিনে গিয়ে বেড়িবাঁধ দখল ও শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তখন ওই দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা কোনোপ্রকার দখল ও ভরাটের কাজ করবে না বলে অঙ্গীকার করে। কিন্তু অভিযোগে জানা গেছে, ওই দুই কর্মকর্তা রূপগঞ্জে পদোন্নতি নিয়ে বদলি হওয়ার পর থেকেই শুকতারা গ্রুপ ও নুরজাহান গ্রুপের লোকজন বেড়িবাঁধ দখল ও শীতলক্ষ্যা নদী ভরাটের কাজ পুনরায় শুরু করে। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের লোকজন বলে বেড়াচ্ছে, তারা স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই কাজ শুরু করেছেন। এখানে এখন তাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। জানা গেছে, নুরজাহান গ্রুপ তাদের দখল করা জমিগুলো বর্তমানে শুকতারা গ্রুপের কাছে ভাড়া দিয়ে দিয়েছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বেড়িবাঁধ ও শীতলক্ষ্যা নদী ভরাট করে প্রায় ১২ থেকে ১৫ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি। নদীর সীমানা পিলারগুলো ভেকু দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কিছু পিলার নদীতে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট নদী ভরাট করে ফেলেছে তারা। এছাড়া বেড়িবাঁধের ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এভাবেই জেটি নির্মাণের লক্ষ্যে বালু ভরাটের কাজ করে যাচ্ছে তারা। ইতোমধ্যে জেটি নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন পিলার তৈরিসহ অন্যান্য কাজ চলছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, বেড়িবাঁধ ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে বাপ-দাদার আমল থেকে তারা বিভিন্ন ধরনের সবজি ও আখ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এসব সবজি ও আখ নিজের এলাকার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ করতেন তারা। এখানে জমির দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই সরকারি সম্পত্তির ওপর নজর পড়ে প্রভাবশালীদের। তারা বেড়িবাঁধ ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের জমিগুলো বালু দিয়ে ভরাট করে দখলে নিয়ে নিচ্ছে। যারা সবজি চাষ করতেন, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুকতারা গ্রুপের সাইট ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, শুকতারা গ্রুপ অর্ধেক জমি নুরজাহান গ্রুপের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে জেটি নির্মাণের জন্য তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই নদীর পার পাইলিং করে জেটি নির্মাণ করছেন তারা। এছাড়া কোম্পানির প্রায় ১৪৪ শতাংশ জমি কেনা রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে শুকতারা গ্রুপের প্রোজেক্ট ম্যানেজার গাফ্ফার মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের উপ-পরিচালক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে নদী দখলের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নদী দখলকারীরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের কোনো ছাড় নেই। হাইকোর্ট নদী তীরের দেড়শ’ ফুট এলাকাকে নদীর সীমানা ঘোষণা করেছে। আমরা ইতিপূর্বেও রূপগঞ্জে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি। শিগগিরই রূপগঞ্জে আবারো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মমতাজ বেগম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, সরেজমিনে লোক পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ সঠিক নয়।