মা। এটি শুধু একটি শব্দ নয়, তারও অধিক কিছু। আমার কাছে মা একটি ফুল, একটি পাখি, একটি কবিতা। একবার মাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। ‘মা একটি ফুলের নাম/ মা একটি পাখি। / তবুও আমি সারাটা দিন/ মাকেই ছুঁয়ে থাকি।’ মাকে ছুঁয়ে থাকতে কার না ভালো লাগে! জীবজগতের সকল প্রাণীর পরম প্রিয় সত্তা মা। মা’র স্পর্শের মতো প্রশান্তির স্পর্শ পৃথিবীতে আর আছে? মা স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই আমরা পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় এসেছি। মা’র হূদয়ের একান্ত উষ্ণ উত্তাপে আমরা পুষ্ট হয়েছি। সুতরাং মা’র চেয়ে আপন পৃথিবীতে আর কিছু হয় না, দ্বিতীয় আর কিছু নেই।
মনে পড়ে, আমার গুরুতর অসুস্থতায় শিয়রে বসে কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন মা। মা’র হাতের কোমল নিবিড় স্পর্শে ফিরে পেয়েছি স্বস্তি, দূর হয়েছে ক্লান্তি। একেবারে চলত্শক্তিহীন অবস্থা থেকে জেগে উঠেছি কতবার! সে হয়েছে মা’র অবিরাম সেবায়, অসীম যত্নে, নিরন্তর পরিচর্যায়। মা-ই দিয়েছেন শক্তি, দিয়েছেন প্রেরণা, দিয়েছেন সাহস। দেখিয়েছেন নতুন পথ, শিখিয়েছেন পথচলা। কত অভিনয় মাকে করতে হয়, কত অভিনয় মা জানেন! তেতো ওষুধ খাওয়ান অসুখ থেকে দ্রুত সেরে ওঠার লোভ দেখিয়ে।
মায়ের কত রূপ! মা বন্ধু, শিক্ষক, অভিভাবক সব। মা-ই পারেন সন্তানের সঠিক ভবিষ্যত্ গড়ে দিতে। এমন এক মায়ের কথা আমরা বই থেকে পাই। এই মায়ের সন্তান একদিন মুখ বন্ধ করা খামে একটি চিঠি নিয়ে স্কুল থেকে ফিরে এল বাসায়। টিচার বলেছেন, চিঠিটা শুধু মাকে পড়তে দেবে। মা চিঠি খুলে পড়েন মনে মনে। চিঠি পড়েন আর ভাবেন। তারপর উত্সুক ছেলেকে তিনি বললেন, ‘চিঠিতে তোমার টিচার লিখেছেন যে, আপনার ছেলেটি অত্যন্ত প্রতিভাবান ও মেধাবী। সে এত বেশি প্রতিভাসম্পন্ন যে, আমাদের স্কুলে তাকে পড়ানোর মতো যোগ্য টিচার নেই। তাই দয়া করে আপনি নিজেই তাকে পড়ান।’
মা তাঁর ছেলেকে পড়ালেন। ছেলে বড় হলেন। শুধু বড় নয়, হলেন পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানী। তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য আজ স্মরণীয়। তার মধ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি, গ্রামোফোন, ক্যামেরা, দীর্ঘস্থায়ী বৈদ্যুতিক বাতি, টেলিফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ইত্যাদি। এসব আবিষ্কার মানুষের জীবনকে আমূল পাল্টে দিয়েছে। এই মহান বিজ্ঞানীর নাম টমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১)। তাঁর মায়ের নাম ন্যান্সি ম্যাথিউস এলিয়ট। মা মারা যান ১৮৭১ সালে। এডিসনের বয়স তখন চব্বিশ বছর। আবিষ্কারক হিসেবে এরই মধ্যে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। একদিন তিনি হঠাত্ একটি খাম পেলেন ঘরের পুরনো কাগজপত্রের জঞ্জালের স্তূপে। এডিসন খাম খুলে আশ্চর্য হয়ে দেখেন—এ তো সেই চিঠি, যা তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক লিখেছিলেন তাঁর মায়ের কাছে। কিন্তু এ চিঠিতে এ কী লেখা! চিঠিতে লেখা—‘আপনার ছেলেটি মানসিকভাবে অসুস্থ। এমন বোকা ও অপদার্থ ছাত্রকে আমরা আমাদের স্কুলে রাখতে চাই না—তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হলো।’ চিঠি পড়া শেষ হতেই মহাভাবনায় পড়ে গেলেন এডিসন। কেন মা মিথ্যে বলেছিলেন সেদিন? আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন মা। তিনি ভেবেছিলেন আসল কথা জানালে তাঁর ছেলে যদি হতাশায় ভেঙে পড়ে, তাহলে তাকে দিয়ে জীবনে কিচ্ছু হবে না আর। ভাবতে ভাবতে এডিসন ধন্যবাদ জানালেন মৃত মাকে। মা তুমি কত মহত্!
এভাবেই মা থাকেন সৃষ্টিতে, মঙ্গলে, কল্যাণে। মা চিরনতুন রূপকথা। শত কষ্ট মুখ বুজে সয়ে মা সন্তানের মুখে দিয়ে যান অপার হাসি। সন্তানের জন্য রচনা করেন আশীর্বাদের আলোমাখা রাজপথ। মা যে উচ্ছল সুগন্ধময় একটি স্নিগ্ধ ফুল। কবিতায় লিখেছিলাম, ‘এই যে আমার মিষ্টি হাসি/ সেই সে ফুলের দান।’
পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, যা কিছু ছন্দোময়, সুরময় তা-ই আমার কাছে মা। মা-র কোনো তুলনা হয় না। মা-র তুলনা মা-ই। মা-র মহিমা বোঝানোর জন্য কাব্য-সাহিত্যের কোনো উপমাই যথেষ্ট নয়। মা-র বিশালত্বের কাছে অভিধানের সব শব্দই অতি ক্ষুদ্র। মা-র স্নেহের আয়তন সমুদ্রকে হার মানায়, উদারতা হার মানায় আকাশকে ।
মা-র মৃত্যুকে রোধ করব বলে কবিতায় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। লিখেছিলাম ‘মা যে আমার সুখ আনন্দ, আমার কথার ছন্দ,/ মা যে আমার প্রাণ জাগা এক গোলাপ কলির গন্ধ,/ সেই গোলাপটা শুঁকবো আমি, চিরটা কাল শুঁকবো,/ আমার মায়ের যমকে আমি যে করে হোক রুখবো’।
কিন্তু মায়ের যমকে আমি রুখতে পারিনি। আজ মা নেই, মাকে নিয়ে লেখা আমার কবিতাগুলো রয়েছে। কবিতাগুলো পড়ি, আর চোখের পাতা ভিজে যায়। মা তুমি কোথায়? তুমি ফুল ছিলে, কিন্তু পাখি হয়ে উড়ে গেছ, উড়ে গেছ আকাশে? এখন তুমি কি তারাফুল? তোমার কলজের টুকরোটা ফেলে গেছ পৃথিবীতে। সে তোমাকে আঁতিপাঁতি করে খুঁজছে রাতদিন। খুঁজে খুঁজে কাঁদে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ। জীবনের সব নিয়ম উল্টে দিয়ে যদি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে, তাহলে কী যে মজা হতো মা!