রবীন্দ্রনাথের ‘নাইটহুড’ ত্যাগের শতবর্ষ

আজ থেকে এক শ বছর আগে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেছিলেন; স্তম্ভিত হয়েছিল বিশ্ববিবেক। ৫৮ বছর বয়সী সাহসী কবি সেদিন আমাদের শুনিয়েছিলেন মুক্তির মন্ত্র; শুদ্ধ প্রত্যয় নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য উদ্দীপনা দিয়েছিলেন। অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দমননীতির পৈশাচিকতার দিনটি ছিল ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। অথচ ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ছিল পাঞ্জাবি নববর্ষের উত্সব; শিখ সম্প্রদায়ের কাছে এটি ছিল একটি পবিত্র দিন। অমৃতসর নগর সেদিন কল-কাকলিতে মুখরিত, বর্ণিল সাজে সজ্জিত, মেলার আয়োজনে উত্ফুল্ল। অবশ্য এই আনন্দের দিনেও সেখানে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই বিশিষ্ট নেতা ডা. সইফুদ্দীন কিচলু ও ডা. সত্যপালকে রাউলাট আইনে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ছিল সেই জনসভা। সেদিনের উত্সব আর মেলায় আগত জনতা অনেকেই উত্সুক ছিল প্রতিবাদ সভার সমাবেশ নিয়ে। সব মিলে জমায়েত হয়েছিল বিশ হাজার মানুষের। তিন দিক ঘেরা এবং একটাই প্রবেশপথের সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের উদ্যানটি হয়ে উঠেছিল আলোড়িত চত্বর। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের বীভত্স আচরণ সেদিন পাল্টে দিয়েছিল অমৃতসরের আকাশ। সেদিন বাতাস হয়ে উঠেছিল রক্তের হোলিখেলায় মত্ত, পৃথিবী সেদিন বিষাদে হয়েছিল বিবর্ণ। আর ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল হাজারো মানুষের হত্যাকাণ্ড। অবশ্য উধম সিং এই নারকীয় হত্যার বদলা নেন ২১ বছর পর লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও ডায়ারকে হত্যা করে।  

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের ১৮ মার্চ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী ও দমনমূলক আইন হিসেবেই ‘রাউলাট আইন’ প্রবর্তন করে। এই আইনের অধীনে বিনাকারণে গ্রেপ্তার, অন্তরীণ ও সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণহীন বিচার ও বন্দিত্বের বেপরোয়া পদক্ষেপ গৃহীত হয়। গান্ধীজি ১৯১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত জুড়ে ‘সত্যাগ্রহ’ ও অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। রাউলাট আইনের দমন-পীড়নের ফলে বিশেষ করে পাঞ্জাবে সত্যাগ্রহ আন্দোলন এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। জনসাধারণের হিংসাত্মক ও বিশৃঙ্খল কার্যকলাপের ফলে গান্ধীজির নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গান্ধীজিকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। ১৬ এপ্রিল Indian Daily News-এ প্রকাশিত ১২ এপ্রিলে লেখা সেই পত্রে গান্ধীজিকে তিনি জানান—‘আমি জানি, আপনার আদর্শ হল যা কিছু ন্যায্য তার সাহায্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা। কিন্তু এ ধরনের সংগ্রাম বীরদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এত প্রযোজ্য নয় মুহূর্তের আবেগতাড়িত মানুষদের ক্ষেত্রে। একদিকের দুষ্কর্ম স্বাভাবিকভাবেই অন্যদিকে দুষ্কর্মকেই ডেকে আনবে। অন্যায় ডেকে আনবে হিংসাকে এবং অপমান আনবে প্রতিহিংসাকে। দুর্ভাগ্য যে সেই অপশক্তির আবির্ভাব ইতিমধ্যেই ঘটেছে।’ স্বাধীনতা সংগ্রামের নিয়ন্ত্রণ ‘আবেগতাড়িত’ জনতার হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল যথার্থই। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ছিল আবেগতাড়িত জনতার ওপর নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রূপ। আর ওই নৃশংসতার বিরুদ্ধে চরম ধিক্কার ও ঘৃণাবোধ থেকে রবীন্দ্রনাথ ‘নাইটহুড’ (স্যার টাইটেল) উপাধি ত্যাগ করেন। ভাইসরয় লর্ড চ্যামসফোর্ডকে লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর নাইটহুড প্রত্যাখ্যান করেন, যা ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রতিবাদ জানাবার এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ১৯১৫ সালে নাইটহুড উপাধি প্রদান করেছিলেন।

২.

‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভারতীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সূচনা। যদিও রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা অনেক আগের, সেই ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। ১৯১৮ সালে ১১ নভেম্বর বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সে সময় থেকে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ভারতের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি জানান ব্রিটিশরাজের কাছে। দিল্লিতে কংগ্রেসের ৩০তম অধিবেশনেও রাষ্ট্রশাসক পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথের এসব বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং ১৯১৮ সালে ২৩ ডিসেম্বর ‘বিশ্বভারতী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ছিল তাঁর কাছে মুখ্য।

প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশরাজকে সহায়তা করা হয় তিলক-বেসান্ত-গান্ধীজির নেতৃত্বে থেকেই। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও তার পরিণতি দেখে রবীন্দ্রনাথ গভীর বেদনায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। ভারত ও বিশ্বের পরিস্থিতি কবির মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল। এরই মধ্যে বিশ্বমানবতার আন্তর্জাতিক মিলনকেন্দ্র রচিত হলো ‘বিশ্বভারতী’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে। বিচলিত ও চিন্তিত রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হন। এসময় তিনি ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রবন্ধে সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ উদ্ঘাটন করে পশ্চিমি দুনিয়ার বস্তুতন্ত্রতা ও লোভ-লালসার প্রবল তাড়নাকে তিরস্কার করেন।

১৯১৮ সালে ৮ জুলাই বিপ্লবীদের দমনার্থে ‘রাউলাট কমিটি’র তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর জনমনে তীব্র অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যুদ্ধোত্তর ভারতে একদিক মুদ্রাস্ফীতি, শ্রমিক ছাটাই, বেকার সমস্যা, বহির্ভারত থেকে যুদ্ধসেনাদের প্রত্যাবর্তন প্রভৃতির সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের ভবিষ্যত্ ও খিলাফত সমস্যা নিয়ে এদেশীয় মুসলিমদের ক্ষোভ এবং সর্বোপরি স্বাধীনতার স্পৃহা ও প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন চলছে, ঠিক তখন ১৯১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্যার উইলিয়াম ভিনসেন্ট কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভায় ‘রাওলাট বিল’ বিধিবদ্ধ করার জন্য উপস্থাপন করেন। ভারতীয় মানুষের জন্মগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার এবং স্বাভাবিক স্বাধীনতার পরিপন্থীি বিলটি গান্ধীজিসহ ভারতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার মুখে পড়ে। ২৪ ফেব্রুয়ারি গান্ধীজি ঘোষণা করেন বিলটি প্রত্যাহূত না হলে প্রতিবাদে সত্যাগ্রহ বা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হবে। তদসত্ত্বেও মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বিলটি পাস হয়, যা এই প্রবন্ধে আগে একবার উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ স্বরাজের (Self-government within the Empire) দাবি করেছিল। অবশ্য গান্ধীজি বিলটির বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ সংগ্রামের সিদ্ধান্ত জানালে জাতীয় আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বের দিগন্ত প্রসারিত হয়।

আন্দোলনের প্রথমে ৩০ মার্চ দেশের সর্বত্র হরতাল পালনের ঘোষণা থাকলেও পরিবর্তন করে ৬ এপ্রিল হরতালের দিন নির্ধারিত হয়। কোথাও কোথাও পূর্বঘোষিত অর্থাত্ ৩০ মার্চ আবার কোথাও কোথাও ৬ এপ্রিলে বিক্ষুব্ধ জনতা শোভাযাত্রা বের করে। দিল্লিতে জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয় : হতাহত হয় অনেকেই। কলকাতা, অমৃতসর, বোম্বাই, আমেদাবাদেও গুলি চলে শোভাযাত্রার ওপর। গান্ধীজি পাঞ্জাব ও দিল্লির অবস্থা শান্ত ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বোম্বাই থেকে দিল্লির উদ্দেশে পথযাত্রা করলে পুলিশ তাঁকে বলপূর্বক আটক করে মোম্বাইয়ে ফিরিয়ে আনে ৯ এপ্রিল। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশের জনতা ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে রাস্তায় নামে। জনতা তখন পুলিশি দমননীতি প্রতিরোধে ভীষণ মারমুখী; অন্যদিকে প্রস্তুত পাল্টা আক্রমণে। এরই মধ্যে পাঞ্জাবের অমৃতসরে ১০ এপ্রিল ডা. কিচলু ও ডা. সত্যপালকে গ্রেফতার করে অজ্ঞাতস্থানে অন্তরীণ করা হয়। ফলে সংবাদটি রাষ্ট্র হবার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষুদ্ধ জনতা ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো ঘেরাও করে নেতাদের মুক্তি দাবি করতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ কয়েকবার গুলিবর্ষণ করে; জনতা আরো ভয়ানক হয়ে ওঠে। অমৃতসর, কাসুর গুজরানওয়ালায় পুলিশের সঙ্গে জনতার তীব্র সংঘর্ষ হয়। পাঞ্জাবের গভর্নর স্যার মাইকেল কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করার নির্দেশ দেন। ১০ এপ্রিল সেখানে মার্শাল ল ঘোষিত হয়। ফলে পাঞ্জাবের সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়; সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এলাকাটি।

গান্ধীজি পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলন বিদ্রোহ-বিপ্লবের স্বাভাবিক অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন হয়েছেন। আগেই লিখেছি ১২ এপ্রিল তিনি গান্ধীজিকে একটি পত্র লিখলে যা ১৬ এপ্রিল ইন্ডিয়ান ডেলি নিউজে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে গান্ধীজি এই পরিস্থিতিতে সংগ্রাম স্থগিত রাখার কথা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু যে মুহূর্তে গান্ধীজি সত্যাগ্রহ আন্দোলন প্রত্যাহারের কথা চিন্তা করছেন ঠিক সেসময় সংগ্রামের নেতৃত্ব জনতার হাতে চলে যায়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিনে তারই প্রতিদান দিতে হলো জনতাকে। এই দিন জালিয়ানওয়ালাবাগের প্রায় বিশ হাজার জনতার ওপর জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে দেড়শত সৈন্য টানা ১০ মিনিটে প্রায় ১৬৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। সরকারি হিসাবে ৪০০ ব্যক্তি নিহত ও ১২০০ জন আহতের সংবাদ পাওয়া যায়। যদিও নিহতের সংখ্যা হাজারের ওপর হবে বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। পরে বিচারে ৫১ জনের ফাঁসি ও ৪৬ জনের দ্বীপান্তর এবং বাকি সকলের ২ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এই ঘটনার পর পাঞ্জাব গভর্নর ও ডায়ারকে অভিনন্দন জানানো হয়েছিল। এই বীভত্স ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের যথার্থ সংবাদ দেশবাসী সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারেনি। তবে গান্ধীজি জানতে পেরে ১৮ এপ্রিল সত্যাগ্রহ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তাঁর কাছে জনসাধারণের হিংসাত্মক ও বিশৃঙ্খল কার্যকলাপ বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল, ইংরেজ সরকারের দমনমূলক আচরণের বিপরীতে। ফলে ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজির প্রতি খুশি হয়; অন্যদিকে দেশবাসী হতাশায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে।

মার্শাল ল ও সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বসে পাঞ্জাবের প্রকৃত ঘটনা জানতে পারেননি। তবে আজ থেকে ১০০ বছর আগে মে মাসের শেষদিকে ওই হত্যাকাণ্ডের খবর পৌঁছানো মাত্র রবীন্দ্রনাথ কালবিলম্ব না করে কলকাতায় উপস্থিত হন। এমনকি শান্তিনিকেতনে ২৯ মে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর যে পৌরহিত্য করার কথা ছিল, তা বাতিল করে দেন; সিদ্ধান্ত নেন মহাত্মা গান্ধীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা দুজনে পাঞ্জাবে গিয়ে ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করবেন। যদি এর জন্য গ্রেপ্তার হতে হয় তা-ও হবেন। এই ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করে কবি সি এফ অ্যানড্রুজকে পাঠান গান্ধীজির কাছে। কিন্তু গান্ধীজির ওপর সেই সময় পাঞ্জাবে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই পাঞ্জাব যেতে রাজি হননি। রবীন্দ্রনাথ হতাশ হন। তিনি চেয়েছিলেন পাঞ্জাবে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের আইন লঙ্ঘন করে এক বিকল্প প্রতিবাদ আন্দোলনের সূচনা করতে। যা স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করত। বিশেষত হিংসাত্মক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বিপথগামিতার চরিত্রকে সংযত করা যেত। সমস্ত আন্দোলনটা অসংযত জনতার থেকে আবার যথার্থ নেতৃত্বের হাতে ফিরে আসত। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী সে বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না।

কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশায় বাংলার কংগ্রেসী নেতৃত্বের অন্যতম শীর্ষ নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের শরণাপন্ন হন। কবি চিত্তরঞ্জনকে বলছিলেন, ‘বললুম যে, এই সময় সমস্ত দেশ মুখ বন্ধ করে থাকবে, এ অসহ্য। তোমরা প্রতিবাদ সভা ডাকো। আমি নিজেই বলছি যে, আমি সভাপতি হব।’ চিত্ত একটু ভেবে বললে, ‘বেশ। আর কে বক্তৃতা দেবে?’ আমি বললুম, ‘সে তোমরা ঠিক করো।’ চিত্ত একটু ভাবল- বললে, আপনি যদি সভাপতি হন, তারপর আর কারুর বক্তৃতা দেওয়ার দরকার হয় না। আপনি একা বললেই যথেষ্ট। আমি বললাম, তাই হবে। এবার তবে সভা ডাকো। তখন চিত্ত বললে, আপনি যখন একা বক্তৃতা দেবেন, আপনি সভাপতি, তখন সবচেয়ে ভাল হয় শুধু আপনার সভা ডাকা। বুঝলুম, ওদের দিয়ে কিছু হবে না। তখন বললুম, আচ্ছা আমি ভেবে দেখি। এই বলে চলে এলুম। অথচ আমার বুকে এটা বিঁধে রয়েছে কিছু করতে পারব না, এ অসহ্য। আর একাই যদি কিছু করি, তবে লোক জড়ো করার দরকার কি? আমার নিজের কথা আমার নিজের মতো করে বলাই ভালো। এই সম্মানটা ওঁরা আমাকে দিয়েছিল। কাজে লেগে গেল। এটা ফিরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ্য করে আমার কথাটা বলবার সুযোগ পেলুম।’ অর্থাত্ একজন প্রবল অনুভূতিশীল মানুষ, যিনি জীবনকে নিংড়ে নিয়ে জগতের সমস্তকিছু অনুভব করেছেন। তিনি কী করে স্বাভাবিক থাকতে পারেন। রাত অতিবাহিত হয় প্রচণ্ড উদ্বেগ, হাজার লোকের মৃত্যুর মিছিল আর নির্মমভাবে গুলি চালানোর দৃশ্যের কথা চোখের সামনে দেখতে পাওয়ার কষ্ট নিয়ে। কবি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, রাজনৈতিক নেতাদের কাপুরুষতায় বিরক্ত। কবিকে নিজের পথ নিজেকেই বের করে নিতে হলো। মধ্যরাত্রে বসলেন বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে একটি পত্র লিখতে। ভোর ৪টার সময় শেষ করলেন সেই চিঠি। এই চিঠিই হলো ৩০ মে তারিখের সেই ঐতিহাসিক চিঠি যার মধ্যে দিয়ে তিনি বর্জন করলেন ব্রিটিশের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি। এই পদত্যাগ পত্র ছিল ব্রিটিশের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বহুকোটি ভারতবাসীর ‘আপত্তিকে বাণীদান’ করার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করা এবং ‘নিজের কথা নিজের মতো করে’ ব্যক্ত করার এক প্রতিবাদ লিপি। তিনি লিখেছেন—

‘হতভাগ্য পাঞ্জাবীদিগকে যে রাজদণ্ডে দণ্ডিত করা হইয়াছে, তাহার অপরিমিত কঠোরতা ও সেই দণ্ডপ্রয়োগবিধির বিশেষত্ব, আমাদের মতে কয়েকটি আধুনিক ও পূর্বতন দৃষ্টান্ত বাদে সকল সভ্য শাসনতন্ত্রের ইতিহাসে তুলনাহীন। অন্তত আমি নিজের সম্বন্ধে এই কথা বলিতে পারি যে, আমার যে সকল স্বদেশবাসী তাহাদের অকিঞ্চিত্করতার লাঞ্ছনায় মনুষ্যের অযোগ্য সম্মান সহ্য করিবার অধিকারী বলিয়া গণ্য হয়, নিজের সমস্ত বিশেষ সম্মান-চিহ্ন বর্জন করিয়া আমি তাহাদেরই পার্শ্বে নামিয়া দাঁড়াইতে ইচ্ছা করি। রাজাধিরাজ ভারতেশ্বর আমাকে ‘নাইট’ উপাধি দিয়া সম্মানিত করিয়াছেন, সেই উপাধি পূর্বতন যে রাজপ্রতিনিধির হস্ত হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম তাঁহার উদার-চিত্ততার প্রতি চিরদিন আমার পরম শ্রদ্ধা আছে। উপরে বিবৃত কারণবশত বড় দুঃখেই আমি যথোচিত বিনয়ের সহিত শ্রীলশ্রীযুক্তের নিকট অদ্য এই উপরোধ উপস্থাপিত করিতে বাধ্য হইয়াছি যে, সেই ‘নাইট’ পদবী হইতে আমাকে নিষ্কৃতিদান করিবার ব্যবস্থা করা হয়।’

এই ঐতিহাসিক চিঠি বড়লাটের কাছে পাঠানোর পূর্বে কবি সেটি অ্যানড্রুজকে পড়তে দিয়েছিলেন। তাঁর সেই চিঠি পড়ে অ্যানড্রুজ বলেছিলেন, ভাষাটা একটু নরম করা যায় কি না। রবীন্দ্রনাথ এর কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল তীক্ষ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। অ্যানড্রুজ নিজেই বলেছিলেন—Such a look as I had never seen in the eyes of Gurudev before or after.

এই প্রতিবাদ সম্ভব হয়েছিল কারণ কবি বাল্যকাল থেকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বলপ্রয়োগ ও দখলদারী নীতিকে ঘৃণা করে এসেছেন। ‘পথ ও পাথেয়’, ‘সদুপায়’, ‘দেশহিত’, ‘ছোটো ও বড়ো’, ‘স্বাধিকারপ্রমত্তঃ’, ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রভৃতি প্রবন্ধে তা প্রকাশ করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশরাজের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করে বীভত্স পাশবিকতার প্রতিবাদ করেন তিনি। অন্যায়-অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামশীল পরাধীনলাঞ্ছিত স্বদেশবাসীর জন্য কাতর রবীন্দ্রনাথ সমকালীন বিশ্বে রলাঁ, বারবুস ও গোর্কির মতোই ভূমিকা পালন করেছিলেন। পক্ষান্তরে গান্ধীজির কাছে ইংরেজদের পৈশাচিক দলননীতি ও পাঞ্জাবের ঘটনাবলিকে একান্তই অভ্যন্তরীণ ও স্বতন্ত্র বিছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছে। বরং তিনি খিলাফত সমস্যর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে ২৪ নভেম্বর সভাপতি হিসেবে নিখিল ভারত খিলাফত সম্মেলনে যোগ দেন। এই সম্মেলনের কয়েক মাস পর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের স্মরণ দিবস উপলক্ষে কবি ইংরেজিতে একটি ভাষণ লিখে জিন্নাহ সাহেবকে পাঠান। তার একটি অংশ—‘আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে পাঞ্জাবে এক মহাপাপাচার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ... তারা তাদের অভিপ্রায়মতো দুনিয়াটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।’

১৯১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে অমৃতসরে কংগ্রেসের বাত্সরিক অধিবেশনে গান্ধীজির ভাষণে শর্তসাপেক্ষে ইংরেজকে সহযোগিতা করার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং পাঞ্জাব ও দেশের অন্যান্য জায়গায় দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য দোষী করা হয় মুক্তিপাগল দেশবাসীকে। আত্মসমালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়ায় গান্ধীজির নীতি আদর্শ ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। অন্যদিকে দেশের সব হাঙ্গামা ও পাঞ্জাবের হত্যাকাণ্ডের জন্য ইংরেজ সরকারকে দায়ী করেছেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ তাঁর ‘নাইট’ উপাধি বর্জন ও প্রতিবাদপত্র কংগ্রেসের সভা থেকে প্রশংসা পায়নি। পাঞ্জাবের ঘটনাবলির সংবাদ পরিবেশন এবং তার তীব্র সমালোচনার জন্য ‘Bombay Chronicle’-এর সম্পাদক হর্নিম্যানকে (B G Horniman) পুলিশ গ্রেফতার করে নির্বাসিত করে। তাছাড়া Tribune পত্রিকার সম্পাদক কালীনাথ রায়কেও কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজি তাঁর মুক্তির জন্য চেষ্টা করেন। অন্যদিকে পাঞ্জাবে দীর্ঘকাল একটানা সামরিক আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একমাত্র স্যার শঙ্করণ নায়ার ভাইসরয়ের ‘একজিকিউটিভ কাউন্সিল’ থেকে পদত্যাগ করেন ১৯ জুলাই। ১৯২০ সালের ১ আগস্ট গান্ধীজি ‘কাইজার-ই হিন্দ’ উপাধি ত্যাগ করেন। ১৯২০ সালে ২২ জুলাই কবি অ্যানড্রুজকে এক পত্রে বিলেত থেকে পার্লামেন্টে ডায়ার সংক্রান্ত আলোচনা ও বিতর্ক সম্পর্কে ব্রিটিশ শাসকদের পাশবিকতা ও নির্লজ্জতার কথা বলেছেন ক্ষোভের সঙ্গে। তবে পাঞ্জাবের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের পর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আচরণে কবি ব্যথিত হয়েছিলেন; আস্থা ও ভরসা শেষপ্রান্তে পৌঁছেছিল। তবু তিনি স্বদেশের জন্য বিবেকী মানবতাবাদের আদর্শকে লালন করে গেছেন; আর শান্তিনিকেতনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।

শত বছর আগে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ও রবীন্দ্রনাথের ‘নাইটহুড’ উপাধি ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা। আর তীব্রতর হয়েছিল ভারতীয়দের দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধের আবেগ। কবি ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছিলেন। এজন্য শত বছর পরও রবীন্দ্রনাথের ওই প্রতিবাদী চেতনা আমাদের পথ চলার নিশানা হয়ে রয়েছে।