পোড়াইয়া হত্যা :সহিংসতার নির্মম রূপ

দেশে হত্যা-ধর্ষণ ইত্যাদি ভয়ংকর সহিংস ঘটনা প্রতিদিনই ঘটিয়া চলিতেছে। ধন-সম্পত্তির জন্য, দলীয় রাজনৈতিক কারণে, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত ঘৃণা হইতে যেমন হত্যার ঘটনা ঘটে, তেমনি জঙ্গিবাদী উন্মাদনা হইতেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়া থাকে। তবে সংখ্যায় ও বিচিত্রতায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাই বেশি ঘটিয়া থাকে। গৃহে প্রবেশ করিয়া ধর্ষণ, বাসে ধর্ষণ, নির্জন স্থানে ধর্ষণ ইত্যাদি নানান ধরনের ধর্ষণের কাহিনি আমরা প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যম হইতে শুনিতে পাইতেছি। ধর্ষণের সহিত প্রায়শই হত্যার ঘটনাও ঘটিতেছে। হত্যাও করা হইতেছে নানান কায়দায়—

শ্বাসরোধ করিয়া হত্যা, ধারালো অস্ত্র দিয়া হত্যা, বাস হইতে ফেলিয়া দিয়া হত্যা এবং পোড়াইয়া হত্যা। কিছুদিন পূর্বে ফেনীর সোনাগাজির মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে নির্যাতনের পরে পোড়াইয়া হত্যা করা হয় এবং তাহাকে হত্যার নির্দেশ দেন তাহারই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। নুসরাত হত্যাকাণ্ডটি দেশে-বিদেশে বড় সংবাদ হয় এবং দেশজুড়িয়া সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত জানুয়ারি মাসে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে এক গৃহবধৃকে কোপাইয়া ও আগুনে পোড়াইয়া হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এইদিকে আড়াইহাজারে আমেনা বিবি নামক ৭০ বছরের এক বৃদ্ধাকে হাত-পা বাঁধিয়া আগুনে পোড়াইয়া হত্যা করিয়াছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার রাতে উপজেলার পূর্বপাড়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। তাহার শয়নকক্ষেই তাহাকে হাত-পা বাঁধিয়া গৃহে আগুন লাগাইয়া দুর্বৃত্তরা পালাইয়া যায়। পরিবারের অভিযোগ, নিহতের শরীরে থাকা কিছু স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায় নাই।

দেখা যাইতেছে যে, নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচিত্র উপায় অবলম্বন করা হইতেছে। অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ১৯৮৫ সালের পারিবারিক আদালত, ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০০ ও ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ২০০৮, হাইকোর্ট নির্দেশিত পাশবিক নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ২০০৮ পাস হইয়াছে। অর্থাত্ আইনের অভাব নাই; কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ হইতেছে না। প্রয়োগ নাই বলিয়াই, মহিলা পরিষদের হিসাব হইতে জানা যাইতেছে যে, ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। ধর্ষণের ঘটনা মোট ঘটিয়াছে ৯৪২টি, ইহার মধ্যে ৬৩ জনকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হইয়াছে। অন্যান্য শারীরিক নির্যাতন ও নিপীড়ন, উত্ত্যক্তকরণ, গার্হস্থ্য সন্ত্রাস, গ্রাম্য সালিশে শাস্তিপ্রদান ইত্যাদি তো রহিয়াছেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই বদলাইতেছে না। যেকোনো তথাকথিত ‘অবৈধ’ ঘটনায় নারী-পুরুষ উভয়ে যুক্ত থাকিলেও, প্রাথমিকভাবে নারীকেই দায়ী করা হয় এবং তাহাকেই শাস্তি প্রদান করা হয়। পুরুষের দৃষ্টিতে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার এক অঞ্চল হিসাবে নারীর শরীরকে বিবেচনা করা হয়। তাইতো শাস্তিপ্রদান, শারীরিক নির্যাতন কিংবা ধর্ষণ ও ধর্ষণপ্রচেষ্টা হইয়া উঠে পুরুষের অহম কার্যকর করিবার সহজ এক পন্থা। আর ইহার বিপরীতে রহিয়াছে আইন শাসনের অভাব। ইহার ফলে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় পুরুষ নিত্যনূতন পন্থা আবিষ্কার করিতেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি প্রশাসনকে এইক্ষেত্রে যেমন অধিক সক্রিয় হইতে হইবে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টানো প্রয়োজন।