সমাজের শরীরেও ‘সুপারবাগ’

অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদে জারি রাখলে শেষতক তা-ই এক ধরনের ‘নিয়মে’ দাঁড়িয়ে যায়। বলাই বাহুল্য, তথাকথিত এই নিয়মে ভর দিয়ে যে ব্যবস্থা কার্যকর থাকে, সেটিকে অব্যবস্থাও বলা যায় না, পুরোদস্তুর তা কুব্যবস্থা। এতে কল্যাণকর কিছু ঘটার তিলমাত্র সম্ভাবনা তো থাকেই না, উল্টো পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়; তৈরি করে ‘সুপারবাগ’।

বলা হচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে রোগজীবাণুর বিনাশ তো ঘটেইনি, উপরন্তু আরেক বিপদ ‘সুপারবাগ’ হাজির, যা চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তেমনি কুব্যবস্থা জিইয়ে রাখতে রাখতে আমরা ব্যবস্থাবিনাশী ‘সুপারবাগ’ আবির্ভাবের ইন্তেজাম পাকা করেছি। বিদ্যমান কুব্যবস্থায় অভ্যস্ত ও অভিযোজিত হয়ে এই ‘সুপারবাগ’ নিজেই প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আজ।

বিজ্ঞান মানলে বলতে হয়, অ্যান্টিবায়োটিককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া সুপারবাগকে আয়ত্তে আনতে কালঘাম যথেষ্টই ছুটবে। সমাজবিজ্ঞানের কথাও সমানভাবে বিজ্ঞানআশ্রিত: অব্যবস্থা-কুব্যবস্থা সমাজে এতটাই শিকড় বিছিয়েছে যে, এর উত্পাটন রীতিমতো এখন চ্যালেঞ্জ। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সদম্ভে ক্রিয়াশীল এই সুপারবাগকে কতটা বশে আনা যাবে, প্রশ্নটি ১৬ কোটি মানুষের জীবন-নিংড়ানো পরিপ্রেক্ষিত থেকে উত্থিত।

ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারে’ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেরা বাংলাদেশ! এক লাইনের এই তথ্যে দেশের গভীরতর ব্যাধির লক্ষণ পরস্ফুিট। ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে না দেওয়া যদি অব্যবস্থা হয়, ব্যবস্থার নামে নৈরাজ্য চালানো কুব্যবস্থা। নিয়মের মধ্যে থেকে যাদের দায়িত্ব পালন করার কথা, তারাই এন্তার নিয়ম ভাঙেন। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শাস্তি তো দূর অস্ত, তিরস্কার পর্যন্ত জোটে না তাদের কপালে। উল্টো দম্ভ-দাপটে তারা যেমন দোর্দণ্ড, সহায়-সম্পদেও তারা হন দরিয়াসমান।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বলছে, স্বাধীন গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ এ বছর চার ধাপ পিছিয়ে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫০-এ জায়গা করে নিয়েছে। গত বছরের আরেক জরিপ বলছে, খেলাপি ঋণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ‘এক নম্বর’। অর্থমন্ত্রী গত ২৮ এপ্রিল সংসদে দাঁড়িয়ে স্বীকার করলেন, পুঁজিবাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। ব্যাংক খাতের অবস্থাও নাজুক। এখানেও সেই ‘সুপারবাগ’।

অর্থমন্ত্রীর এই সরল স্বীকারোক্তির জন্য ‘বাহবা’ হয়তো তার প্রাপ্য, কিন্তু তার এ কথায় ব্যবস্থায় গরলের বিষয়টি যুগপত্ স্বীকৃত ও প্রমাণিত। সুপারবাগের ‘সুপার পাওয়ার’ কতটা বিধ্বংসী যে যার অধীন থাকার কথা, তিনিই আজ বলছেন, বশে নেই! তাহলে কী উপায় রইল গোলাম হোসেন?

ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন আরো বলছে, সামগ্রিকভাবে ‘আইনের শাসন’ সূচকে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। কিছু জিনিস আছে সংখ্যাতাত্ত্বিক জরিপ দিয়ে তার ব্যাপ্তি-ব্যাপকতার কণামাত্রও ধরা যায় না। উদাহরণ: নুসরাত হত্যাকাণ্ড। এ কথা বলা জায়েজ যে, এটি একটি মাত্র অন্যায়ের ঘটনা। কিন্তু এই বিবৃতিতে ঘটনার যে নৃশংসতা, বর্বরতা, ভয়াবহতা, তার কিছুমাত্র কি ধরা পড়ে? ভুক্তভোগী স্বজনের বুকউজারি বেদনা, হূদয়নিংড়ানো আহাজারির কথা না হয় বাদই দিলাম; না শোক সংখ্যায় ধরা যায়, না দীর্ঘশ্বাস ফিতা দিয়ে মাপা যায়!

১৫-১৬ জন পরিণত মানুষ রীতিমতো আলাপ-আলোচনা করে হত্যার ছক কষেন। দিনক্ষণ ঠিক করে, ‘দায়িত্ব’ ভাগ করে, সবকিছু আয়োজন করে ‘অপারেশন’ চালান। কোনো সমাজব্যবস্থায় এমন ‘সুপারবাগ’ তৈরি হতে পারে? সার্বিক ব্যবস্থা কতটা নিজেদের পক্ষে ‘সহায়ক’ মনে করলে তারা ধরেই নেন, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ঠিক পার পেয়ে যাবেন?

যতটা এখন পর্যন্ত উন্মোচিত, এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশের প্রশ্রয়, ক্ষমতাবানদের আশ্রয়ের বিষয়টি স্পষ্ট। আসামিরাও আদালতে দেওয়া তাদের জবানবন্দিতে বিষয়টি কবুল করেছেন। সুতরাং পুরো ঘটনার উপসংহারে পৌঁছতে আমাদের এতটুকু বেগ পেতে হয় না। একটি ভাত টিপলে পুরো হাঁড়ির খবর যেমন অজানা থাকে না, এক নুসরাত হত্যাকাণ্ড গোটা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয়াবহ সুপারবাগের উপস্থিতি জানান দেয়। নানাবিধ অগ্রযাত্রার দুরন্ত গতিতে যত খুশি নিজেকে শামিল করুন, এক দণ্ডের জন্য স্থির হয়ে একটু নিরিবিলি প্রশ্নটির সম্ভাব্য উত্তর ভেবে দেখা দরকার।

ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের মতো সংস্থাগুলোর জরিপ বা গবেষণা প্রতিবেদন উঠে আসা ফলাফলের মাত্রা নিয়ে আপনি যত খুশি প্রশ্ন তুলুন, পরিস্থিতি অস্বীকার করার জো কিন্তু একেবারে নেই। এরপরও যদি করেন, চক্ষুষ্মান হয়েও তাহলে আপনি অন্ধ। বলাই বাহুল্য, অন্ধের দেশে এই অন্ধত্বের চিকিত্সা করানোর দরকার নেই। কেননা, অন্ধের দেশে আলো ও অন্ধকার দুই-ই ধারণা মাত্র।

n লেখক : সাংবাদিক

hello.hasanimam@gmail.com