[ রা জ নী তি ]

গণতন্ত্র কি হুমকির মুখে?

গণতন্ত্রের একটি বড় শিক্ষা পরমত সহিষ্ণুতা। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের কোনো সমালোচনা শুনতে পছন্দ করেন না। শুধু যে অপছন্দ করেন তাই নয় কঠিনভাবে নিন্দাও করেন। এভাবে গণতান্ত্রিক আচরণ থেকে আমাদের তথাকথিত গণতান্ত্রিক দলের নেতা-নেত্রীরা নিজেদের একটি দূরত্ব তৈরি করেছেন। জনগণের রাজনীতির বদলে দলতন্ত্রে আটকে থাকেন বলে দলের প্রধান নেতা-নেত্রীরা একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা করতে পারেন। এভাবে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আর বিপরীতে গণতন্ত্র লাঞ্ছিত হতে থাকে। গণতান্ত্রিকবোধ বা বিশ্বাসহীন অথবা অপূর্ণ গণতান্ত্রিক বোধের মানুষরা দীর্ঘদিন আমাদের রাজনীতির মাঠ চড়ে বেড়াচ্ছেন বলে অমিত সম্ভাবনা থাকার পরও এদেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে গতি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারছে না। আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন এদেশের রাজনীতি যদি স্বার্থপরতা ও লোভ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো তবে দেশবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি হতো। রাজনৈতিক বুলি ছাড়া প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র জায়গা করে নিতে পারেনি কখনও। তাই আমাদের রাজনীতির নিয়ন্ত্রকগণ প্রতিপক্ষ দলের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, অন্যের ভালো কাজকে প্রশংসা করা বা স্বীকৃতি দেয়ার শোভন আচরণ করতে পারেন না। দলের কর্মী-সমর্থকদের আত্মসমালোচক আর মুক্তচিন্তার আধুনিক মানুষ না বানিয়ে অন্ধ দলপ্রেমিক বানিয়ে স্বস্তি খুঁজছেন। এভাবে দেশকে ক্রমে অন্ধকারে ছুঁড়ে দিচ্ছেন তারা। স্বেচ্ছাতন্ত্রে বন্দি বিএনপি পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে এখন সামান্য সুর নরম করলেও সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে ধনুক পণ করে বসেছিল। ভেবেছিল এই অনড় অবস্থান সংঘাতের জন্ম দেবে। এতে প্রতিদিন আন্দোলন করা এবং এর মাধ্যমে কর্মী সমর্থকদের চাঙ্গা করা সহজ হবে। একটি গোলমেলে অবস্থা তৈরি করে চাই কি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সহজ পথও তৈরি হতে পারে। এই লক্ষ্যে অন্ধকারের শক্তিগুলোকে আলীঙ্গন করতে কিছুমাত্র দ্বিধা করেননি কিএনপি নেতৃত্ব। কিন্তু এ ধরনের কর্মযজ্ঞে কেনো গণতান্ত্রিক আচরণ ছিল না। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ ধ্বংস করা, সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত করা, দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করা যেন রাজনৈতিক মোক্ষ লাভের হাতিয়ার। তাই দিনের পর দিন নানা ছুতো নাতায় হরতাল অবরোধ ডেকে যাচ্ছে বিএনপি আর তার বন্ধু দলগুলো। তারা এই কাজ করে যাচ্ছে সাধারণ দেশবাসীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে। তাদের জিম্মি করে। আওয়ামী লীগ সরকারও ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনায় সকলের ঐকমত্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ার পথ তৈরি না করে একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাইছে। গণতন্ত্রের নাম ভাঙাচ্ছে স্বেচ্ছাতন্ত্রের শক্তিতে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগোরিষ্ঠতার সুবাদে সংবিধান সংশোধন করে যেভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা সাজাতে চাইছে তা তাত্ত্বিকভাবে গণতান্ত্রিক মনে হলেও পোড়খাওয়া মানুষ জানে গণতন্ত্রের নামাবরণে কিভাবে স্বেচ্ছাতন্ত্র কার্যকরী থাকছে। এমনি করে সরকারি বিরোধী সকল দলই মানুষের স্বাভাবিক জীবনের পথ চলাকে কঠিন করে তুলছে। আর ফিকে হয়ে যাচ্ছে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। দুই দলের মধ্যে সংলাপ হলে কতটা লক্ষ্যপূরণ হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তবুও মানুষ চায় সংলাপ হোক। এই দম বন্ধকর পরিস্থিতি থেকে অন্তত তৈরি হোক বেরিয়ে আসার পথ। কিন্তু বাস্তবে এক পক্ষ এগিয়ে এলেও আরেক পক্ষ সুচতুরভাবে তমসা তৈরি করছে। এসময়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনীতিতে আমরা স্বেচ্ছাতন্ত্রের হাতে বন্দি থাকায় যখন যার হাতে বল আসছে সেই পক্ষই নিজের মত করে খেলতে চাইছে। আর বিপন্ন হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিপর্যস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। ১/১১ নিয়ে যত সমালোচনাই থাক না কেন সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন কিন্তু অন্য রকম। গণতন্ত্রের ধারক-বাহকরা বুক ফুলিয়ে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াত। নির্বাচন ব্যবস্থাকে নিজেদের ইচ্ছাধীন করে ফেলেছিল। মানুষের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে, দুর্নীতিগ্রস্ত এদের মুখোশ উন্মোচন সম্ভব নয়। এক এগারোর নায়কদের মনে যা থাক না কেন, অতিবড় ক্ষমতাবানও যে শেষ পর্যন্ত বিচারের মুখোমুখি হতে পারে—সে বিশ্বাসটি মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পেরেছিলেন সে সময়ের স্বনির্বাচিত দেশ পরিচারকগণ। এতবড় ঝাঁকুনির পর আশাবাদী মানুষের প্রত্যাশা ছিল—১/১১ পরবর্তী সময় থেকে রাজনীতিকগণ শিক্ষা নেবেন। নিজেদের কদর্য চেহারা উন্মোচিত হয়েছে ভেবে সমঝে চলবেন। নতুন করে পরিশুদ্ধ হবেন। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। দুধে ধোয়া তুলশী পাতা হয়ে গেলেন মার্কামারা দুর্নীতিপরায়নরা। রাজনৈতিক মামলার গঙ্গাস্নানে সকলে পবিত্র হতে থাকলেন। গণতন্ত্রের দীর্ঘ খরায় মুহ্যমান মানুষ যখন প্রতিমুহূর্তে প্রতীক্ষা করছে গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য তখন বরাবরের মতো অসহিষ্ণু আচরণ করে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপির কাঠামোগত বিন্যাস আর এই দলের রাজনীতির খেলোয়াড়দের চরিত্র বিচার করে এখানে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা হবে—এমনটি আশা করে না সাধারণ মানুষ। কিন্তু দিন বদলে দেয়ার অঙ্গীকার না করলেও আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের আস্থা থাকত। মানুষ ভেবেছিল, বিপন্ন গণতন্ত্র এবার জীবন ফিরে পাবে। সোহরাওয়ার্দী-বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন আহম্মদের আওয়ামী লীগের নৌকার মাঝিরা অতটা দক্ষতার সাথে না হলেও নৌকা গন্তব্যে নিতে পারবে। বিপুল বিজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে—অমন প্রত্যাশা ছিল অনেকেরই। অনেকদিন পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠত হবে, এ আশায় বুক বেঁধেছিল মানুষ। কিন্তু না, দলের ভেতর বা বাইরে কোথাও নির্ভেজাল গণতন্ত্রের পথ রচনা করতে পারলো না আওয়ামী লীগ। বিএনপি নেত্রীর পক্ষে গণতন্ত্রের পথে কতটা দৃঢ় হওয়ার সুযোগ আছে তা নিয়ে মানুষের মনে যথেষ্ট সন্দেহ। কিন্তু নানা কলঙ্ক এবং ঝড়-ঝাপটার পরও গত নির্বাচনে ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়া বিএনপি নিঃশেষ হয়ে গেছে এমন ভাবার কারণ নেই। একারণে সুস্থ মানুষদের নিয়ে গণতন্ত্রের পথে হাঁটার চেষ্টা তো করতেই পারত বিএনপি। কিন্তু অমন আশা করা বাতুলতা। যেখানে অনেক বেশি শক্তি ও সম্ভাবনা থাকার পরও আওয়ামী লীগ জনমতের ওপর ভরসা করার মতো সাহস দেখাতে পারছে না, সেখানে বিএনপি এ অবস্থায় দুঃসাহস দেখাবে কেমন করে! তারপরও এই সত্যের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে যে, সময় ও পরিস্থিতির অনেক রূপান্তর হয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা অনেক বেড়েছে। বিএনপির শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অসংখ্য নেতাকর্মী দলের শাপমোচন প্রত্যাশা করে। চিহ্নিত মন্দ মানুষদের ছায়া থেকে দলকে মুক্ত দেখতে চায়। এমন সুস্থ অবস্থায় ফিরতে হলে একমাত্র গণতান্ত্রিক আচরণই পথ দেখাতে পারে। এই সত্য মানতে হবে পুত্রদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং নিজের কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসততার রটনা থাকলেও বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এখনও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্য আছে। কিন্তু নানা ঝড়-ঝাপটা ও বয়সের কারণে তিনি সম্ভবত এখন আর তেমন বলিষ্ঠতা দেখাতে পারছেন না। আর এ সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত সুযোগ সন্ধানী মানসিকতার অনেক নেতা। যাদের প্রতি সাধারণ বিএনপি কর্মীদের আস্থা অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু এরাই তাদের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলতে চাইছেন বেগম জিয়াকে। বিএনপি নেত্রীকে এই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই দুঃসময়ে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। সাধারণের আস্থায় ফিরতে হলে দলে সত্ নেতৃত্বের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। বিএনপির প্রতি ভালবাসা আছে এমন সাধারণ নেতা-কর্মী সমর্থকদের ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির বিকল্প নেই। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় দলকে বিভ্রান্ত করে। এ সময়ের আওয়ামী লীগের দশা বোধ করি তেমন। বিবেচনায় রাখা উচিত গত নির্বাচনে এই দলের বাক্সে পড়া বিপুল ভোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগের নয়। বিএনপির শাসনকালের নৈরাজ্যে বিপন্ন, বিরক্ত মানুষের ভোটে ওজনদার হয়েছিল মহাজোটের বাক্স। প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হেঁটে নির্বাচনে গেলে এই ভোটগুলো সব সময় শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। মুক্তচিন্তার দেশপ্রেমিক মানুষদের এই মূল্যবান ভোট আওয়ামী লীগের পক্ষে অনেকটা স্থায়ী করার সুযোগ ছিল। কারণ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য থেকে বেড়ে ওঠা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগই ভোটারদের প্রথম পছন্দ হওয়ার কথা। কিন্তু ১/১১ পর পরিবর্তীত বাংলাদেশে মানুষ যখন সততা ও নিষ্ঠায় বিপন্ন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী নেতৃত্বের ঐকান্তিকতা প্রত্যাশা করছিল তখনই সাতপুরোন স্বেচ্ছাচারিতার কালো মেঘ দেখে শংকিত হচ্ছে তারা। গণতান্ত্রিক বোধের অভাবেই বোধ হয় এই সত্যটি বুঝতে চাইছেন না যে, এদেশের অতি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষও এখন অনেক বেশি অধিকার ও রাজনীতি সচেতন। আবেগে আশ্রিত থেকে তারা কর্তাভজা হবে না। আর অমনটি করতে হলে বঙ্গবন্ধুর মতো তেমন মাপের কর্তা হওয়া চাই। আমাদের মহান রাজনীতিকরা হয়তো কষ্ট পাবেন তবুও বলতে হবে সচেতন বিপন্ন দেশবাসীর কাছে এখন বড় প্রশ্ন চলমান রাজনীতি কী মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে? রাজনীতির অঙ্গন থেকে কী গণতান্ত্রিক আচরণ নির্বাসিত হচ্ছে? প্রতিদিন জনগণের নাম ভাঙ্গিয়ে রাজনীতিকরা আর কত নিজেদের স্বেচ্ছাচার চালিয়ে যাবেন? বিএনপি নেতৃত্ব যেভাবে ক্ষমতায় পৌঁছার সিঁড়ি খুঁজতে অশুভ শক্তিগুলোকে বন্ধু বানিয়ে নিজেকে শক্তিমান করতে চাইছে তাতে দলটির প্রতি জনগণের প্রত্যাশার অপমৃত্যু ঘটছে। বলা হয় অধিক ফলবতী বৃক্ষ বিনীত হয়। তাই নুয়ে আসে ডাল পালা। কিন্তু বিপুল জনসমর্থন বিনীত করতে পারলো না আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে। সুশাসন উপহার দিতে না পারলেও হাম্বরা ভাব থেকে গেল। গণতান্ত্রিক বোধ না থাকায় সরকার দলের নেতা-নেত্রীরা সমালোচনা থেকে পথের দিশা খোঁজার চেষ্টা করলেন না। দলীয় নেত্রী সুযোগ পেলেই স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করেই সমালোচকদের স্থূল শব্দবাণে বিদ্ধ করতে থাকলেন। এসকল আচরণ স্বেচ্ছাতন্ত্র থেকে জন্ম নেয়া। এভাবে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা এখন টর্নেডোর মত আঘাত করছে। এর আসুরিক তোড়ে গণতন্ত্র ডুবন্ত দশায়। আমরা মনে করি গণতন্ত্র বিপন্ন হলে সবচেয়ে বড় আঘাত সইতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। তাই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে শুধু সিংহাসনের দিকে তাকালে চলবে না, দেশ এবং দল উভয়ের স্বার্থেই দূরদৃষ্টি নিয়ে তাকাতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে এবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় না আসতে পারলে বা ক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারলে সব শেষ হয়ে যাবে না। বরঞ্চ দলের জন্য স্থায়ী লাভ জনগণের আস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করা। প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হাঁটা ছাড়া সে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়