গার্মেন্টসের কোন কোন দায়িত্বহীন মালিকদের ব্যাপারে কঠোর হইতে হইবে

বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মোটামুটিভাবে অর্থনীতির দুইটি দিকের উপর নির্ভর করে। একটি হইল কৃষিতে যখন বাম্পার ফলন হয়, আমাদের খাদ্য উত্পাদন যখন পর্যাপ্ত হয় এবং যখন আমাদের খাদ্যের অনেক বেশি আমদানি করতে হয় না তখন। তাহার সহিত আরেকটি বিষয় স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে, সেটা হইল আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের খাত অর্থাত্ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য। এই বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে যদি স্থিতিশীলতা থাকে—যাহা নির্ভর করে প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ের উপর। আমরা জানি আমাদের রফতানি আয় মোটামুটিভাবে পুরোটাই নির্ভরশীল পোশাক খাতের উপর। আমরা দেখিতে পাইতেছি যে, গত ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যখন ছিল ০.৬ শতাংশ অর্থাত্ ঋণাত্মক, তখনো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭ শতাংশ। বৈশ্বিক অর্থনীতির ঋণাত্মক প্রভাব আমাদের অর্থনীতিকে লাইনচ্যুত করিতে পারে নাই। কারণ, আমাদের প্রবাসী আয় ও রফতানি হইতে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসে সেখানে ঘাটতি পড়েনি। তাহার মানে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের পোশাক খাত অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা রাখিতেছে। কৃষিক্ষেত্রে মোটামুটিভাবে আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় রহিয়াছি। আর যখনই বৈশ্বিক পর্যায়ে কোন শক বা নেতিবাচক ঘটনা ঘটিতেছে, তাহার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে কতখানি পড়িবে তাহা নির্ভর করিতেছে আমাদের পোশাক খাতের রফতানির উপর। প্রশ্ন হইল, এই যে পোশাক খাত যাহা বৈদেশিক বাণিজ্যের তথা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এত গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছে, সেখানে যে আশংকা তৈরি হইয়াছে সেখান হইতে আমরা বাহির হইতে পারিতেছি কিনা। সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর যে চাপ তৈরি হইয়াছে বাংলাদেশের পোশাক খাতের উপর সেখান হইতে বাহির হইতে পারিলে অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা ধরিয়া রাখিয়াছিলাম তাহা হয়তো বজায় রাখিতে পারিব অর্থনীতির উপর নানাবিধ চাপ থাকা সত্ত্বেও। তাহা হইলে এই ব্যাপারে আমাদের করণীয় কী? আমাদের মনে রাখিতে হইবে, বাংলাদেশের পোশাক খাতে অনেক পোশাক কারখানার মালিক শ্রমিকদের না ঠকাইয়া ভালো মজুরি ও ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করিয়াও মুনাফা করিতেছে। কিন্তু একটি অংশ রহিয়াছে যাহারা অদক্ষ দায়িত্বহীন, যাহাদের ব্যবস্থাপনা ভালো নহে, যাহারা শ্রমিকদের ঠকাইতেছে, যাহাদের কর্মপরিবেশ খারাপ; যাহারা ভালোভাবে ব্যবসা করিতেছে, যাহারা ক্রেতাদের সহিত দরকষাকষি করিয়া ভালো দামে কাজ পাইতেছে, তাহারাও এই অদক্ষ পোশাক কারখানার মালিকদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। কারণ, বিভিন্ন কারণে যাহাদের খরচ কম, তাহারা ক্রেতাদের যে প্রতিনিধি বা এজেন্ট তাহাদের মাধ্যমে আরো কম দামে পোশাক বিক্রির প্রস্তাব করিতেছেন। এই ধরনের নানাবিধ কারণে অদক্ষদের দ্বারা দক্ষরা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছেন। তাহাদের কারণে সমগ্র পোশাক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে। তাহাদের কারণে আজকে পোশাক কারখানার মালিক এবং শ্রমিকের মধ্যে যে বিশ্বাসের ঘাটতি তাহা তৈরি হইয়াছে। তাহাদের কারণে আজকে বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হইয়াছে উহা ধীরে ধীরে আরো বেশি পুঞ্জীভূত হইতেছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতার স্বার্থে, এই পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য এই যে একটি অংশ, যাহারা অদক্ষ ও দায়িত্বহীন, যাহারা সরকারের নানাবিধ প্রণোদনার কারণে এবং শ্রমিকদের ঠকানোর কারণে টিকে আছে, তাহাদের এই খাত হইতে বাহির করিয়া দিতে হইবে। এখন বাজার অর্থনীতিতে কোন পোশাক কারখানার মালিককে আমরা জোর করিয়া বাহির করিতে পারিব না। তাই সরকারকে ন্যূনতম মজুরি দ্বিগুণের কাছাকাছি করিয়া দিতে হইবে এবং সরকার যে মালিকদের নানাবিধ প্রণোদনা দিতেছে সেই প্রণোদনাগুলি শর্তাধীন করিতে হইবে। যে সকল পোশাক কারখানার মালিকরা কর্মপরিবেশের শর্ত নিশ্চিত করিতে পারিবে না তাহাদের প্রণোদনা দেওয়া হইবে না। ফলে দুইদিক হইতে খরচ বাড়িয়া গেলে তাহারা বাধ্য হইবে এই খাত হইতে বাহির হইয়া যাইতে। শ্রমিকদের ভালো মজুরি দিয়া দক্ষতা বাড়াইয়া থাকিতে পারিলে থাকিবে।