চেতনায় গার্মেন্টস শিল্প
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৩, ২১:০৪
পোশাক যেমন বস্ত্র চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানুষকে সভ্য করে তোলে পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত সহস্র অন্নের চাহিদা পূরণকেও নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প তার চরম উদাহরণ। আশির দশকে শুরু হওয়া এ শিল্প আজ ত্রিশ বছরে পনেরশ’ টাকার হেলপারের জীবন-যাপন থেকে শুরু করে পঁচিশ’ তলা ভবন তৈরিতে কত বেশি অবদান রেখেছে তা সংক্ষিপ্ত লেখনিতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিজিএমইএ-র হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে এদেশে পাঁচ হাজারেরও অধিক গার্মেন্টস কারখানা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি সংখ্যক অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে। যেখানে দেশের বিশাল জন সমুদ্রের (৪০ লক্ষ) কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশিদেরও কর্ম ক্ষেত্রের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। জাতীয় রপ্তানিতে অবদান রেখেছে ৮০%, এ শিল্প যেন শিল্প নয় সৌভাগ্যের স্বর্গদূত।
স্বর্গদূত শুধু অর্থনীতিতে নয় শিক্ষা ক্ষেত্রেও নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও একটি মাত্র টেক্সটাইল কলেজ মাত্র ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট প্রদান করতে দেরিতে হলেও তা গ্রাডুয়েশন প্রদান করার মর্যাদা পেল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সে কলেজ আর ডিগ্রি এদেশের মানুষ চিনতও না, জানতও না। অথচ যখন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্পের আন্তর্জাতিকভাবে অভূতপূর্ব সফলতা অর্জন করল একটি শক্ত প্লাট ফরম সৃষ্টি করল তখন সময়ের দাবিতে অতিদ্রুত প্রতিষ্ঠিত হল ১টি সরকারি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, ৮টি সরকারি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ২১টি বেসরকারি টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরো অনেক ট্রেনিং ইন্সটিটিউট। যেখান থেকে অসংখ্য ছাত্র/ছাত্রী বের হয়ে পুরো সেক্টর টাকে আরো সমৃদ্ধ করল। ইউরোপের শিল্প বিপ্লব নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী ঘটনা কিন্তু বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিপ্লব গল্পের হালকা বিষয় নয়। কিন্তু এমন আশীর্বাদ পুষ্ট শিল্পের প্রতি আমরা কতটা যত্নশীল বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তা প্রশ্নবিদ্ধ। এই শিল্প আমাদের জন্য আরো কত বেশি সম্ভাবনাময় হতে পারে অথবা আমাদের উদাসীনতা ও সচেতনতার অভাবে বন্ধ ও হতে পারে সে ব্যাপারগুলো আমরা তোয়াক্কা করি না। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি, মকদ্দমা করে সমুদ্র জয় করেছি , দরবার করে ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছি কিন্তু গার্মেন্টস শিল্পের জন্য কিছুই করতে হয়নি তাই স্বপ্নের শিল্পকে কতবেশি ঝুঁকির সম্মুখীন করছে তা বুদ্ধিতে না বুঝলেও অন্তর দৃষ্টিতে দেখতে পাই।
আমরা যদি দুই দশকের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানীর হিসাবের খাতা খুলি তাহলে দেখতে পাই —
স্বল্প সময়ে এমন দুর্ঘটনা ও এত বেশি প্রাণহানী কত বড় মর্মান্তিক বিষয় একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে তা বুঝা যায় এবং ঘটনাগুলো ব্যবসার উপর কিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা একটি কেস স্টাডি থেকে অনুমান করা যেতে পারে। আমেরিকাতে কোন একটি অঙ্গ রাজ্যে ইঁদুরের উত্পাত বেশ বেড়ে গিয়েছিল এবং মানুষ বিভিন্নভাবে ইঁদুর মারত কিন্তু সহজ ও উর্বর উপায় পাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় একটি কোম্পানি ‘Trap-Ease’- নামে খুবই কার্যকরী ইঁদুর মারার ফাঁদ তৈরি করে বাজারজাত করল। শুরুতেই অনেক বিক্রি হলো এবং কোম্পানি আশাতীত প্রফিট করল। কিন্তু একটি সময় গিয়ে ‘Trap-Ease’ মার্কেটে টিকতে পারল না। মার্কেটিং বিভাগ বহু চেষ্টা করেও মার্কেট ধরে রাখতে পারল না। পরবর্তীতে অনুসন্ধান করা হল মার্কেট হারানোর কারণ এবং তাতে পাওয়া গেল ‘Trap-Ease’ সত্যিকার অর্থেই একটি কার্যকরী ফাঁদ কিন্তু প্রচণ্ড নিষ্ঠুর। ইঁদুর মরে ঠিকই কিন্তু মরার আগে অনেকক্ষণ যন্ত্রণা ও কাতরানোর চেচামেচি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহ্য করার মত নয়।
ঘটনাটি যদি সত্য হয় এবং ইঁদুরের মৃত্যু যদি Product এর Market Fall করার কারণ হয় তাহলে মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু গার্মেন্টস শিল্পে কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে তা আমাদের বোধগম্য হওয়া উচিত।
লেখক :শিক্ষার্থী
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।