এই ক্রান্তিকালে মানিক মিয়ার বড় প্রয়োজন

‘মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নীতির প্রশ্নে ছিলেন অটল। লেখনীর মাধ্যমে ও নীতির প্রশ্নে আপস না করে কীভাবে একটি রাষ্ট্রের মানচিত্র বদলে দেয়া সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন তিনি। রাজনীতিবিদদের সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা দিতেন। বর্তমানে রাজনীতি বিপর্যস্ত, গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখন মানিক মিয়া থাকলে অভিভাবকের ভূমিকা রেখে রাজনীতিবিদদের বুঝিয়ে ভালো পথে চলার উপদেশ দিতে পারতেন। জাতির এই ক্রান্তিকালে তাঁর মতো সাহসী, নির্ভীক ও চিরঞ্জীব সাংবাদিকের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।’ বাংলায় গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল শনিবার রাজধানীতে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে জাতীয় পার্টি (জেপি) আয়োজিত আলোচনা সভায় উপরোক্ত কথাগুলো বললেন আলোচকরা। জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এসময় উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভায় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, মানিক মিয়া ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কলম সৈনিক, বঙ্গবন্ধু অসি হলে তিনি ছিলেন মসি। তবে তাঁকে আমরা সঠিক শ্রদ্ধা জানাতে পারিনি। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জেপি আলোচনা সভার আয়োজন করলেও অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলগুলো করে না। এর অর্থ হল, আমাদের গণতন্ত্রের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে আমরা সচেতন নই। তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্র এখনও নির্মাণের পথে। নানা চড়াই-উত্রাইয়ের মধ্যে রয়েছে। মানিক মিয়া কিসের পক্ষে ছিলেন তা যদি আমরা না জানি তাহলে চলমান লড়াইয়ের নিষ্পত্তি কঠিন হবে। মানিক মিয়া ছিলেন সামরিক স্বৈরতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে; তিনি ছিলেন গণতন্ত্র, বাঙালি ও বাঙালিত্বের পক্ষে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, ’৬৫ সালের যুদ্ধের পর মানিক মিয়া একবার পশ্চিম পাকিস্তানে যান। তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন সম্পাদক ছিলেন। আক্রমণের ভয়ে যখন তাঁর সঙ্গীরা ভীত ছিলেন, তখন মানিক মিয়া তাঁদের বলেছিলেন, যুদ্ধের মধ্যে বসবাসের সাহস অর্জন করতে হয়। এখনও আমরা একটি যুদ্ধের ভিতর আছি। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধী ও গণতন্ত্র একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে হাজারবার আলোচনা হতে পারে। নির্বাচনের হাত ধরেই গণতন্ত্র হাঁটে। কিন্তু যাদের হাতে রক্ত তাদের হাত ধরে গণতন্ত্র হাঁটতে পারে না। জঙ্গিবাদকে ঐক্যবদ্ধভাবে দমন করতে না পারলে বাংলাদেশের মানুষ ঠকবে। পায়ে পেরেক ঢুকলে তা সরানোর সময় ব্যথা হয়, কিছু রক্তপাত হয়। যে জাতি শরীর থেকে পেরেক বের করতে পারে না, সে জাতিকে আজীবন খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয়। মানিক মিয়ার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেন, একসময় ইত্তেফাক ছাপা হত ৯ নম্বর হাটখোলা রোডে আমার শশুরের প্রেস থেকে। সেখানে গিয়ে তিনি আমার শ্বশুরের চেয়ারেই বসতেন, আমার স্ত্রীকে নাম ধরে ডেকে কথা বলতেন। তিনি বলেন, মানিক মিয়ার লেখনী ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। তাঁর মানের কিংবা পর্যায়ের বা উচ্চতার কেউ এখনকার সংবাদপত্রে নেই। থাকলে জাতি বড় উপকৃত হত। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মানিক মিয়া এমন উচ্চতার সাংবাদিক ছিলেন, যাঁকে বঙ্গবন্ধু খুব সম্মান করতেন, কোন কোন ক্ষেত্রে ভয়ও পেতেন। এখন অনেকেই হঠাত্ সম্পাদক বনে যাচ্ছেন, কেউ টাকার জোরে, কেউ হচ্ছেন অন্যের ইশারায়। তাঁদের পক্ষে আবার অনেকে কথাও বলছেন। জাতির এখন ক্রান্তিকাল, তাতে সন্দেহ নেই। এখানে মাঝামাঝি কোন পথ নেই। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশে গণতন্ত্র থাকলে আগামীবারও আমরাই ক্ষমতায় আসবো, বারবার আমরাই ক্ষমতায় আসবো। আর গণতন্ত্র না থাকলে আমরা জেলে থাকবো। জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও ‘নিউজটুডে’ সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানিক মিয়াকে নিয়ে আলোচনা করে আমরা সাংবাদিকরা উজ্জীবিত হই। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা আশ্বস্ত হই। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা যখন আক্রান্ত হতেন তখন তিনি ফুঁসে উঠতেন। একসময় ‘ইত্তেফাক’ যারা বন্ধ করেছিলেন, যারা এর কণ্ঠ চেপে ধরেছিলেন তারা কেউ এখন রাজনৈতিক বা সাংবাদিক মঞ্চে নেই। কাজেই সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে কেউ কখনও টিকে থাকতে পারে না, আন্দোলনও দমানো যায় না। ছাই চাপা আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় আজ যে অবক্ষয়, সেখান থেকে মুক্তি পেতে মানিক মিয়ার মত সাহসী কলম সৈনিকের খুব দরকার। দলের অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী বলেন, দেশ আজ অনিশ্চয়তায়। গণতন্ত্র বিপন্ন, গোটা জাতি শঙ্কিত। এরকম দুঃসময়ে মানিক মিয়া বেঁচে থাকলে অভিভাবকের ভূমিকা রাখতে পারতেন। অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য মফিজুল হক বেবু, আমেনা বারী, আব্দুল লতিফ মল্লিক ও এজাজ আহমেদ মুক্তা, শিক্ষা ও ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন, জেপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী, যুগ্ম-মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, মহিলা পার্টির সভানেত্রী নাজমুন নাহার বেবী, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক মীর হারুনুর রশীদ, দপ্তর সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।