আমসত্ত্ব গৃহিণীদের আয়ের উত্স

আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন যদিও হাতের নাগালেই পাওয়া যায় আম, কাঁঠাল বা অন্যান্য ফলের জেলি বা আমসত্ত্ব, তবে এক সময় নারীদের নিপুণ হাতের উপরই টিকে ছিল এই নান্দনিক শিল্পটি। এখন সেটা অনেকটাই ঘরকুনো হয়ে পড়েছে। তবু কেউ কেউ নিজের মতো করে আগলে রেখেছেন এই শিল্পটিকে। দক্ষিণাঞ্চলের শহর নোয়াখালীর গৃহবধূ “ফেরদাউস আক্তার” জানান, আমি সাধারণত প্রতিবছরই আমসত্ত্ব করি। এটা আমাদের পরিবারের প্রতিদিনকার আপরিহার্য খাবার। আমার সন্তানরাও এটা খুব পছন্দ করে। এখন আমসত্ত্বের প্রচলন আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। তবে একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। আর বাণিজ্যিকভাবে আমসত্ত্বের প্রচলন হওয়ার দরুন অনেকে এখন আর বাসায় বানাতে চায় না। কিন্তু এটাও সত্য নিজের হাতের বানানো খাবারের সাথে কখনোই বাইরের খাবারের তুলনা হয় না। এটা যতটা আনন্দের ততটাই স্বাস্থ্যকর। অতিথি আপ্যায়ন,পড়শীর বাড়ি নিমন্ত্রণ কিংবা দৈনন্দিন খাবারের সাথে আমসত্ত্ব ছিল নিত্যদিনের বিষয়। আর গৃহিণীদের গুণাগুণও নির্ভর করতো এর স্বাদ তৈরির যথার্থতার উপর। আমসত্ত্ব বাংলার কম-বেশি সবখানেই পরিচিত। তবে এর তৈরি প্রক্রিয়ায় বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে করে থাকে। ফলে স্বাদটাও অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। সাধারণত গ্রামের নারীরা পুরনো ডালা, কুলা কিংবা পাটির উপর আমসত্ত্ব তৈরি করে থাকে। ছাঁকুনি আর মিহির উপরই এর স্বাদ নির্ভর করে। এই মজাদার ঐতিহ্যসমৃদ্ধ খাবারটি প্রমাণ করে বাঙালির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কথা। তবে এখন অনেকটাই কমে গেছে নারীদের বাসায় আমসত্ত্ব তৈরির মানসিকতা। একসময় যেখানে নারীরা এ নিয়ে রীতিমতো উত্সবে মেতে উঠতো। আমসত্ত্বের বাণিজ্যিকীকরণও অসংখ্য নারীর স্বপ্ন পূরণ করেছে। ঘুচিয়েছে অর্থনৈতিক সংকট। কথা হয় আমসত্ত্ব ব্যবসায়ী লক্ষ্মীপুরের ‘শাহানা বেগমর’ সাথে। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই চাহিদাসম্পন্ন একটা খাবার। তবে সবসময় এর গ্রাহক পাওয়া যায় না। তবু মোটামুটি স্বচ্ছলতায় আছি বলা যায়। গ্রাহকদের চাহিদার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের আমসত্ত্ব তৈরি করি। কারণ, কারো টক পছন্দ আবার কারো মিষ্টি, কেউবা দু’টোর মাঝামাঝি। আমসত্ত্বের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করতে পারি। এর জন্যে উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে’। প্রাচীন এই ঐতিহ্যটির তৈরির মানসিকতা বা ইচ্ছা এখন অনেকটা কমে গেলেও এটা সত্যি যে, এখনো গ্রাম বাংলার নারীরা আমসত্ত্বের উত্সবে মেতে উঠে এই মধুমাসে। প্রাকৃতিকভাবে সারা বছর ফল না পাওয়ায় সারা বছর ধরে ফলের স্বাদ পাওয়ার এই চেষ্টাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় নারীদের সেই সময়গুলোর কথা যখন শিকারী পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে এগিয়ে ছিল সভ্যতা বিনির্মাণে।