উত্তর মেরুতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে চীন
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৩, ২০:২৮
আর্কটিক (উত্তর মেরু) অঞ্চলের কোন অংশেরই মালিক নয় চীন। চীনের সবচেয়ে উত্তর প্রান্ত আর্কটিক সার্কেল থেকে ১৪শ’ কিলোমিটার দূরে। তবে সেই অঞ্চলের ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে চীন। সেখানে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে দেশটি। সেখানে স্থাপনা তৈরি করছে। নিজের অবস্থান তৈরির জন্য চীন আর্কটিক দেশগুলোর সাথে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে। প্রচেষ্টার ফলও পেয়েছে চীন। অন্য ৫টি বাইরের দেশের সাথে চীনও আর্কটিক কাউন্সিলের স্থায়ী পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পেয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলের ৮টি দেশ নিয়ে আর্কটিক কাউন্সিল গঠিত। এর ফলে কাউন্সিলে ভোটাধিকার না পেলেও দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এবং অঞ্চলে একটি অবস্থান গড়তে সাহায্য করবেন এটি। আর্কটিকে বরফ গলার কারণে যে শুধু জলবায়ুর ওপরই প্রভাব পড়ছে তা নয়। বৈষ্ণিক উষ্ণতা বৃদ্ধি প্রায় ১০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল এবং ১ হাজার ৬শ’ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস প্রাপ্তির সুযোগ করে দিয়েছে সেখানে। আর্কটিক কাউন্সিলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গুস্তাফ লিন্ড বলেন, ৩০-৪০ বছর পর গ্রীষ্মে আর্কটিক অঞ্চলে সামান্য বরফ জমবে। এর ফলে নতুন সমুদ্র পথ তৈরি হবে। খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হবে। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে আর্কটিকের প্রতি চীনের আগ্রহ যতটা না অর্থনৈতিক তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। আর্কটিক ইনস্টিটিউটের একজন বিশ্লেষক আন্দ্রিজ রাসপুটনিক বলেন, এখানে প্রচুর তেল, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ রয়েছে। অঞ্চলটি লাভজনক নৌপথ হতে পারে। এসব কারণে চীনের আর্কটিকের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু চীনের মূল আগ্রহ এই অঞ্চলের কূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। সরকারিভাবে চীন আর্কটিক অঞ্চলের ব্যাপারে তাদের অবস্থানের কোন ঘোষণা দেয়নি তবে আর্কটিক দেশগুলোর সাথে সম্পর্কন্নোয়ন তাদের পররাষ্ট্র নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলেই মনে হচ্ছে।
এ বছরের প্রথম দিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হং লেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন আর্কটিক অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশিলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য সে অঞ্চলের দেশগুলোকে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর সাথে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। পরস্পরের মাঝে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস থাকতে হবে। আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী গত এপ্রিলে চীন সফরের সময় সেদেশের সাথে একটি চুক্তি করেছিলেন। এটি ছিল দু’দেশের মধ্যে প্রথম চুক্তি। আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও সিগুরদার দত্তির বলেন, অনেকগুলো ক্ষেত্রে চীনের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে চায় তার দেশ।
গতমাসে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে আইসল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট অলাফুর রাগনার বলেন, উত্তর মেরুর ভবিষ্যতের ব্যাপারে মেরু অঞ্চরের বাইরের দেশগুলোরও বক্তব্য থাকতে পারে। আর্কটিক সার্কেলের উদ্বোধনীর সময় রাগনার বলেন, এটা আমরাও উপলব্ধি করি যে, উত্তর মেরুর ব্যাপারে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর উদ্বেগের যৌক্তিক কারণ আছে। আর্কটিক ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক রাসপটনিক বলেন, আইসল্যান্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সংযোগের ক্ষেত্রে চমত্কার রুট তৈরি হতে পারে এই দেশটির মধ্যদিয়ে।
চীন ইতিমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সড়ক তৈরি করছে। চীনের মাইনিং কোম্পানিগুলো সেখানে কাজ করতে খুবই আগ্রহী। চীনের অর্থনীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করছে। তার প্রয়োজন প্রচুর জ্বালানি। উত্তর মেরুতে রয়েছ প্রচুর খনিজ সম্পদ। সে সম্পদের অংশীদার হওয়া চীনের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদি ব্যাপার। তার বর্তমান যে জিনিসটি চীনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে সমুদ্র পথ। গত সেপ্টেম্বরে জুয়েলং (বরফের ড্রাগন) নামক আইস ব্রেকারটি আর্কটিক সাগরের ভেতর দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসাগরে যায়। চীনের কোন জাহাজের এ ধরনের ভ্রমণ এটাই প্রথম। চীনের পোলার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইয়াং হুইগেনের একটি বক্তব্য পাওয়া গেছে চীনের একটি দৈনিক সংবাদপত্রে। সেখানে তিনি বলেছেন, উত্তর মেরুর বরফ গলার কারণে নতুন সমুদ্র পথ তৈরি হচ্ছে যার ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যেতে আগের চেয়ে তিন ভাগের একভাগ সময় লাগবে। চীন, ভারত, ইটালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর আর্কটিক কাউন্সিলে স্থায়ী পর্যবেক্ষকের মর্যাদা পেয়েছে। তবে চীন উত্তর মেরুতে তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে কারণ রাশিয়াও কানাডার এই অঞ্চলে চীনের অভিসন্ধি নিয়ে সংশয় আছে। সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ল বিলদ বলেন, পর্যবেক্ষক বাড়ানোর আর্কটিক কাউন্সিলের সাথে জড়িত থাকার কারণে ঐ দেশগুলো সংস্থাটির নীতি, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। সুতরাং আমি মনে করি আরো দেশকে সংশ্লিষ্ট করার কারণে আর্কটিক কাউন্সিলের অবস্থান বিশ্ব দরবারে আরো সুদৃঢ় হবে। স্থায়ী পর্যবেক্ষক হওয়ার পর চীনের প্রতিনিধি দলের প্রধান দেশে ফিরে সিনহুয়াকে বলেছিলেন, এটি উত্তর মেরুর দেশগুলোর সঠিক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। চীন প্রথমে আর্কটিক সম্বন্ধে জ্ঞান-লাভ করবে তারপর সেখানকার উন্নয়নে কাজ করবে।