বদলে গেছে এভারেস্ট জয়ের চিত্র!
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৩, ২০:২৯
হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত মাউন্ট এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে শীর্ষবিন্দুর উচ্চতার হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার (২৯ হাজার ২৯ ফুট)। হিমালয় পর্বতমালায় একটি অংশ, নেপাল এবং চীনের সীমানার মধ্যে এর অবস্থান। পৃথিবীর এই উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ সব ধরনের পর্বতারোহীদের আকর্ষণ করে। একেবারেই নতুন পর্বতারোহী থেকে শুরু করে বহু অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পোড় খাওয়া পর্বত-অভিযাত্রীরাও এতে সফল আরোহণের জন্য পেশাদার পর্বত পথ-প্রদর্শকদের পেছনে দেদারসে টাকা খরচ করতে দ্বিধাবোধ করে না। যদিও এভারেস্টে আরোহণ পর্বতারোহণের কারিগরী দিক দিয়ে অতোটা কঠিন না হলেও প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বাতাস ইত্যাদি কারণে এ চূড়াটি আরোহণ বেশ বিপজ্জনক।
পর্বতারোহীরা নেপালের পর্যটন আয়ের অন্যতম প্রধান উত্স। কারণ এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ আরোহণে ইচ্ছুক প্রত্যেক পর্বতারোহীকে নেপাল সরকারের কাছ থেকে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের একটি ব্যয়বহুল পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। এতে আরোহণ করতে গিয়ে অনেক পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন, এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে ৮ জন পর্বতের অত্যন্ত উঁচুতে ঝড়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারান। বিশেষত ডেথ জোন এ আবহাওয়া এতোটাই প্রতিকূল যে বেশিরভাগ সময় হতভাগ্য পর্বতারোহীর মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভবপর হয় না। ১৮৬৫ সালে উচ্চতা পরিমাপ শেষে রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতচূড়ার নামকরণ করে মাউন্ট এভারেস্ট। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এই নামকরণের আগে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের সম্ভানার কথা বলা হয়েছিলো। ১৮৫৫ সালে আলপাইন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন টমাস ডেন্ট তার বই ‘এভাভ দ্য স্কাই লাইন’-এ মন্তব্য করেছিলেন এভারেস্ট পর্বতে আরোহণ করা সম্ভব। জর্জ ম্যালোরি তার ১৯২১ সালের অভিযানের সময় উত্তর দিক থেকে এভারেস্টে আরোহণ করার পথ আবিষ্কার করেন। ঐ অভিযানটি ছিলো মূলত অনুসন্ধানমূলক অভিযান। তখন চূড়ায় ওঠার মত প্রয়োজনীয় উপকরণ অভিযাত্রী দলটির কাছে ছিলো না। এভারেস্টের পার্শ্বদেশে পা রাখা প্রথম ইউরোপীয় নাগরিক ম্যালোরির নেতৃত্বে দলটি উত্তরের গিরিখাতের ৭,০০৭ মিটার (২২,৯৮৯ ফুট) আরোহণ করে। সেখান থেকে চূড়াটিতে ওঠার জন্য ম্যালোরি একটি সম্ভাব্য পথের পরিকল্পনা করেন কিন্তু তার সহযাত্রীরা এরকম একটি দুঃসাহসিক অভিযানের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। তাই সেবার তিনি ফিরে আসেন। এরপর ব্রিটিশ নাগরিক জর্জ ফিনচ প্রথমবারের মত অক্সিজেন ব্যবহার করে পর্বতারোহণ করেন। তিনি ৮,৩২০ মিটার (২৭,৩০০ ফুট) উপরে উঠতে পেরেছিলেন। এভাবে ১৯৫৩ সালের আগ পর্যন্ত অনেকবারই এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা চলে। কিন্তু কেউ সফল হয়নি। উল্টো বৈরি আবহাওয়ার কবলে পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়। ১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নরগে প্রথম এভারেস্ট বিজয় করেন।
গত সপ্তাহে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট বিজয়ের ৬০ বছর পূতি হয়ে গেল। বিজয়ের ৬ দশক উদযাপনে নেপালে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। শোভাযাত্রার মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। ৬০ বছর আগে এ অভিযান ছিলো অনেক বেশি বিপদসঙ্কুল, অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাদের সাফল্যের পর আর কেউ এভারেস্ট বিজয়ে আসবে সেটা ভাবেননি এডমন্ড হিলারি। তার মতে, যেহেতু তারা এটি বিজয় করেছেন সেহেতু অন্য কেউ এতে আর আগ্রহ দেখাবে না। কিন্তু কোনো এক অদম্য ইচ্ছা বা কারণে মানুষ এভারেস্ট জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সফলও হচ্ছে। গত ৬০ বছরে এভারেস্টে উঠেছেন প্রায় হাজার মানুষ।
এক সময়ের বিপদসঙ্কুল এই এভারেস্ট এখন পরিণত হয়েছে এক বিরাট বাণিজ্যে। যারা এখন অভিযানে যেতে চান তাদের পারমিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে দক্ষ শেরপাদের খুঁজে পাওয়ার জন্য খরচ করতে হয় ১০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ডলার। পর্বত আরোহণের কাজ এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে। কারণ এখন পর্বত আরোহীদের কাছে থাকে আধুনিক যন্ত্রপাতি, আছে বিভিন্ন উচ্চতায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ থাকার মতো ক্যাম্প। ফলে আবহাওয়া যখন অনুকূলে থাকে তখন শত শত অভিযাত্রী যান এভারেস্ট বিজয়ের জন্য। তাই এখন এভারেস্ট অভিযান নিয়ে নানা সমালোচনা দেখা দিচ্ছে। অনেকে বলতে চাইছেন এভারেস্ট বিজয় এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। তেনজিং নোরগের ছেলে জেমলিং নোরগে বিবিসিকে বলেন, এভারেস্ট অভিযান নিয়ে এ বাণিজ্যে তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, এ অভিযান নিয়ে এখন যা হচ্ছে তা দেখলে হয়তো তার বাবা খুশি হতেন না। এর অপব্যবহার হচ্ছে এবং এটা থামানো দরকার। এক্ষেত্রে নেপাল সরকারই কিছুটা করতে পারে। তবে এর মাধ্যমে শেরপা জনগোষ্ঠির যে আয়ের পথ খুলেছে এ কথা স্বীকার করেন তিনি। কিন্তু অনেক পর্বত আরোহী এর সঙ্গে একমত নন। তাদের মধ্যে এভারেস্ট বিজয়ের স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের জন্য এ সুবিধা উন্মুক্ত রাখা উচিত। তবে বাস্তবচিত্র ভিন্ন। প্রতিবছর অভিযাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এভারেস্টে দূষণের পরিমাণও বাড়ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সুবিধার জন্য এ সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৯০ সালের দিকে মাত্র ১৮ শতাংশ অভিযাত্রীরা এভারেস্ট জয়ে সফল হতে পারতেন। এখন সে হার ৫৬ শতাংশে ঠেকেছে। গত বছর একদিনে ২৩৪ জন এভারেস জয় করেন। কিন্তু এর আগে ১৯৮৩ সালে এ সংখ্যা ছিলো ৮। আর এর এক দশক পরে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ জনে। এ মুহূর্তে এভারেস্ট জয়ে মানসিক ও শারীরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। এখন এটা সম্পূর্ণটাই বাণিজ্যিক। এ কারণে প্রকৃত আগ্রহীদের চেয়ে অভিযাত্রীদের সংখ্যা বেশি। যার ফলে এভারেস্ট বিজয়ের কীর্তিও যেন খাটো হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে নেপাল কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা এভারেস্ট আরোহীদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেবেন তারা।