সেনা হত্যার জের

ব্রিটেনে মুসলিম বিদ্বেষ বেড়েছে

পশ্চিমা দেশগুলোতে যেন এ এক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে- ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী কেউ কোনো অপরাধ করলে তার দায়ভার সকল মুসলমানদের নিতে হবে। সম্প্রতি লন্ডনে একজন ব্রিটিশ সেনা খুন হওয়ার ঘটনায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২২ মে ঐ হত্যার ঘটনার পর থেকে ব্রিটেনে মুসলিম বিদ্বেষ নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ইসলাম বিদ্বেষি উগ্র ডানপন্থী দল ইংলিশ ডিফেন্স লীগ (ইডিএল) এবং ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন মসজিদে হামলার চেষ্টা করেছে। গত কয়েকদিনে এসেক্স, কেন্ট, নিউক্যাসল এবং গ্রিমসবিসহ বেশকিছু শহরে মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারে হামলা চালিয়েছে ফ্যাসিস্ট ভাবধারায় বিশ্বাসী এই দলগুলো। এছাড়া রাস্তায় চলাচলের সময় উগ্রপন্থী শেতাঙ্গদের গালাগাল কিংবা কটুক্তির শিকার হয়েছেন অসংখ্য ইসলাম বিশ্বাসী মানুষ। এসব ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে। এদের মধ্যে দু’জন সাবেক ব্রিটিশ সেনাও রয়েছেন। গত ২২ মে বুধবার লন্ডনের উলউইচে একজন ব্রিটিশ সেনা খুন হন। দুই কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ছুরি এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে খুন করেন। এরপর আক্রমণকারী দুই যুবক পথচারীদের উদ্দেশ্য করে তাদের এ কৃতকর্ম ভিডিও করতে বলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত এসব ভিডিওতে দেখা যায়, হত্যাকারীদের একজন বলছেন, ‘আমি দুঃখিত যে অনেক অবুঝ শিশু এবং নারীদের লন্ডনের রাস্তায় এমন একটি হত্যার দৃশ্য দেখতে হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন এবং ইরাকে অসংখ্য শিশু ও নারীদের প্রতিনিয়ত একই দৃশ্য দেখতে হয়। ব্রিটিশ সরকার এসব হত্যার জন্য দায়ী।’ প্রায় ২০ মিনিট পর পুলিশ দুই আক্রমণকারীকে গুলি করে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে। তাত্ক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হয় খুন হওয়া ব্যক্তি একজন ব্রিটিশ সেনা এবং তার নাম লী রিগবি। তিনি কয়েক মাস আগে আফগানিস্তানে নিয়োজিত ছিলেন। পরদিন বেরিয়ে আসে আক্রমণকারী দুই ব্যক্তির পরিচয়। এদের একজন ২৮ বছর বয়সী মাইকেল আদেবোলাজো এবং অপরজন ৩১ বছর বয়স্ক মাইকেল আদেবোলাও। তারা দু’জনই নাইজেরিয়ান বংশোদ্ভূত। এদের মধ্যে মাইকেল আদেবোলাজো বেশ কয়েক বছর ব্রিটেনে নিষিদ্ধ একটি উগ্রপন্থী ইসলামিক দলের সাথে জড়িত ছিলেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর নজরদারির তালিকায় তার নাম রয়েছে। মাইকেল আদেবোলাজোর এক বন্ধু বিবিসির এক সাক্ষাত্কারে দাবি করেছেন, এমআই৫ সেনা হত্যায় অভিযুক্ত আদেবোলাজোকে তাদের জন্য কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর পরপরই পুলিশ আবু নুসাইবা (৩১) নামের আদেবোলাজোর এই বন্ধুকে বিবিসি কার্যালয় থেকে আটক করে। স্থানীয় টেলিভিশনগুলোর সংবাদে দেখা যায় প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আক্রমণের সময় ঐ দুই যুবক আল্লাহু আকবর ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন। বিবিসি’র পলিটিকেল এডিটর নিক রবিনসন নিজেই বললেন, হত্যাকারীদের বেশভূষা ছিল ইসলামি ধাচের। তার এ মন্তব্যকে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষমূলক আখ্যা দিয়ে এক ঘন্টার মধ্যেই ব্রিটেনের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমে প্রায় ৭০টির মত অভিযোগ জমা পড়ে। নিক রবিনসন অসাবধানতাবশত এটি হয়েছে বলে তার বক্ত্যব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এদিকে সেনা হত্যার ঘটনায় পর সমগ্র মুসলিম কমিউনিটির ওপর ক্ষেপে উঠে উগ্র ডানপন্থী শেতাঙ্গ দলগুলো। ঘটনার রাতেই নিউক্যাসল থেকে ছুটে আসেন ইংলিশ ডিফেন্স লীগের প্রধান টমি রবিনসন। ঐ রাতেই উলউইচে মিছিল করে শত শত ইডিএল সদস্য। এ সময় পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। টমি রবিনসন এ সময়টিকে আরব বসন্তের সাথে তুলনা করে বলেছেন, এটা হচ্ছে ইংলিশ স্প্রিং। এর মাধ্যমে মুসলমানদের ব্রিটেনের মাটি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। পরদিন এ্যাসেক্স শহরের ব্রেনট্রির দু’টি মসজিদে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। হামলা হয় কেন্টের গিলিংহ্যামের একটি মসজিদেও। এসব মসজিদে পাথর ছুঁড়ে মারার কারণে মসজিদের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে যায়। মিল্টন কিন্সের একটি মসজিদে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারা হয়। কার্ডিফ শহরের একটি মসজিদে শুকরের মাংস ফেলে যায় কিছু দুর্বৃত্ত। তবে ভয়াবহ আক্রমণের চেষ্টা হয় গ্রিমসবির একটি মসজিদে। আগুন ধরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে দুই ব্যক্তি মসজিদটিতে পরপর তিনটি পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে। মসজিদের ইমাম স্কাই নিউজকে বলেছেন, এটা হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা। তিনি বলেন, সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে ঐ সময় মসজিদে বেশকিছু শিশু-কিশোর উপস্থিত ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দুই আক্রমণকারীকে আটক করে পুলিশ। এদের একজন স্টুয়ার্ট হার্নেস এবং গেভিন হাম্প্রিস। তারা দু’জনই সাবেক ব্রিটিশ সেনা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। ২৬ মে বিবিসি’র নিউজ নাইট অনুষ্ঠানের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল উলউইচের সেনা হত্যা। ব্রিটেনের শেতাঙ্গ মানুষদের ভাবনা নিয়ে প্রচারিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক শেতাঙ্গ এ ঘটনার জন্য পুরো ইসলামিক বিশ্বাসকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ এর সমাধান হিসেবে সকল মুসলিম মানুষকে ব্রিটেন থেকে বিতাড়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। আরো আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে সেনা হত্যার ঘটনা পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে ইডিএলের ফেইসবুক ফ্রেন্ড প্রায় ৬০ হাজার বেড়ে গেছে বলে ঐ অনুষ্ঠানে জানানো হয়। গত কয়েকদিনে তা ১ লাখ ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। ২২ মে সেনা হত্যার ঘটনার আগে ফ্যাসিস্ট এই দলটির ফেইসবুক ফ্রেন্ড ছিল মাত্র ২০ হাজারের মত। মুসলিমদের ওপর আক্রমণের ঘটনার জরিপকারী সংস্থা টেল মামা (মনিটরিং এন্টি মুসলিম এ্যাটাক) নামে একটি সংগঠন সেনা হত্যা পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় ১৬৩টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করেছে বলে জানিয়েছে। মুসলিমদের ওপর এ হামলার ঘটনা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি বলে সংগঠনটির অভিমত। এসব হামলায় সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন দাড়ি, টুপি পরিহিত কিংবা স্কার্ফ এবং বোরকা পরিহিত মুসলিম নর-নারী।