ভারতীয় ডা. কোটনিসের কাছে চিরঋণী চীন

চীনাদের কাছে কেন এই ভারতীয় চিকিত্সক এতো সম্মানিত? এই কারণ জানতে ফিরতে হবে আরো পেছনে। ১৯৩৭ সালে জাপান আক্রমণ করে বসেছে চীন। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলে চীন ও জাপানের মধ্যে। প্রতিদিনই মারা পড়ছে বহু চীনা সৈন্য। আহত হচ্ছেন অনেকে। আহত যোদ্ধাদের চিকিত্সায় ১৯৩৮ সালে ভারত একটি চিকিত্সা মিশন পাঠায় চীনে। ডা. কোটনিসসহ আরো চারজন চিকিত্সক ছিলেন মিশনে। চিকিত্সকদের অগ্রভাগে থেকে বহু যোদ্ধাহত সৈনিকের দিনরাত সেবা দেন তিনি। একসময় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চার বছর চীনাদের চিকিত্সা সেবা দিয়ে মাত্র ৩২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ডা. কোটনিস। চীনে এসে ডা. কোটনিস তার সহকর্মী এক চীনা নার্সের প্রেমে পড়ে যান। বিয়েও করেন কু কিংলান নামে ঐ নার্সকে। কোটলিসের মৃত্যুর পর কু কিংলান রয়ে যান চীনে। গত বছর চীনের দালিয়ানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের এক সন্তান ছিল। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু মাত্র ২৪ বছর বয়সে মারা যায় ছেলেটিও। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কু কিংলান বলেন, কোটনিস যখন মারা যান আমি তখন খুবই ছোট। যতদূর মনে পড়ে তিনি ছিলেন একজন হাসিখুশি মানুষ। তার সান্নিধ্যে দিনগুলো আমার বেশ ভালোই কেটেছে। চীনের সাবেক কমিউনিস্ট নেতা ও বিপ্লবী নায়ক মাও জিডোং কোটনিসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে বলেন, তার মৃত্যুতে আমাদের সেনাবাহিনী হারিয়েছে একটি সাহায্যের হাত, জাতি হারিয়েছে এক বন্ধুকে। আমাদের সবাইকে তার আন্তর্জাতিক ত্যাগের কথা মনে রাখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ঐতিহ্য অনুযায়ী চীনের নতুন প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংও তার প্রথম বিদেশ সফর অর্থাত্ ভারত সফরকালে মুম্বাইয়ে আসেন। কেকিয়াংকে স্বাগত জানান কোটনিসের ৯২ বছর বয়সী বোন মনোরোমা। মনোরোমা কোটনিস বলেন, আমরা আবেগে আপ্লুত, এতো বছর পরেও আমার ভাইকে মনে রেখেছে এবং ভালোবাসে চীনের লোকজন। চীনের প্রধানমন্ত্রী আমাদের শোক ভাগ করে নিতে আমাদের সঙ্গে দেখা করেন। এ পর্যন্ত চারজন চীনা নেতার সাক্ষাত্ পেয়েছেন মনোরোমা। নিজেও গেছেন চীন সফরে। নিজ দেশে ডা. কোটনিস তেমন পরিচিত ছিল না। যদিও তাকে নিয়ে ১৯৪৬ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। এবং পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চীনে তিনি জাতীয় নায়ক হিসেবে খ্যাত। তার প্রতি সম্মান জানাতে তার ছবি সম্বলিত স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে চীন। চীনের হেবেই প্রদেশে একটি মেমোরিয়াল গঠন করা হয়েছে। গত এক শতকে চীনের শীর্ষ বিদেশি বন্ধু মনোনীত করতে ২০০৯ সালে ইন্টারনেটে একটি নির্বাচন চালানো হয়। সেখানে কোটনিস শীর্ষ ১০ জন বিদেশি বন্ধুর তালিকায় আছেন। এর আগে চীনের নেতা হু জিনতাও ভারতে এসে ডা. কোটনিসের পরিবারকে তার একটি ছবির অ্যালবাম উপহার দেন। আর কোটনিসের পরিবার জিনতাওকে কোটনিসের ছবির একটি সিডি, তার জীবন বৃত্তান্তের একটি কপি ও হাতে বানানো একটি বিছানার চাদর উপহার দেন। ডা. কোটনিসের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে চীন বিশেষজ্ঞ শ্রীকান্ত কোন্দাপাল্লি বলেন, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অভিন্ন ইতিহাসের প্রতীক এই দুটি দেশ। ১৯৬২ সালে চীন ও ভারত সীমান্ত নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আগে ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রাম করেছে। ঐ পরিবারটির সদস্যদের দেখা করে মূলত ভারত ও চীন সেই অভিন্ন সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ১৯১০ সালে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ মহারাষ্ট্রের শোলাপুরে জন্মগ্রহণ করেন কোটনিস।