প্রায় সুস্থ হয়ে গেছে আয়শা

আয়না সামনে আনলেই চেঁচিয়ে উঠতেন আয়শা মোহাম্মদজাই। কারণ, বীভত্স রূপ নেয়া নিজের চেহারাটা দেখলে তিনি নিজেই ভয় পেতেন। এখন আর সে অবস্থা নেই; প্রমাণ আকারের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখমণ্ডলের মধ্যস্থলটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করেন কীভাবে কী করা হচ্ছে। অগ্রভাগের পুরোটা কেটে নেয়া নাক ফিরে পাচ্ছে স্বাভাবিকতা। তা দেখে তিনি বারবার বিস্মিত হন এবং ভাবেন, এও তাহলে সম্ভব, যা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। প্রায় চার বছর আগে নৃশংসতম ঘটনাটি ঘটেছিলো আফগানিস্তানের আমানপুরে। তালেবান স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন মিলে কেটে ফেলেছিলো আয়শা মোহাম্মদজাইয়ের নাক ও দুই কান। অপরাধ— শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া। এ ধরনের ঘটনা আফগানিস্তানে অহরহ ঘটছে; কিন্তু বিশ্ববাসী এর ক’টিই বা জানতে পারছে। আয়শার ঘটনাও হয়তো চাপা থেকে যেতো, যদি না বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ২০১০ সালের আগস্ট সংখ্যার প্রচ্ছদে তার বিকৃত চেহারা ছাপা হতো। এরপর থেকেই আয়শা মোহাম্মদজাই হয়ে যান তালেবানি বর্বতার প্রতীক। এ ছবির মাধ্যমে রাজনীতি সচেতন লোকজন ঠিকই বুঝে যায়, তালেবানদের হাতে নারীর জীবন কতোটা দুঃসহ যন্ত্রণার! ২০১১ সালের জানুয়ারিতে আয়শাকে নেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রেরএকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের বদান্যতায় নব জীবন ফিরে পাচ্ছেন আয়শা। তবে এ কাজ মোটেই সহজ নয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক ললাটের ত্বক প্রসারণ ছাড়াও মুখমণ্ডলের ত্বক, হাড় ও কোমলাস্থির গ্রাফটের প্রয়োজন পড়েছে। এই গ্রীষ্মে শেষ অস্ত্রোপচারটির পরেই তাকে জনসমক্ষে হাজির করা হবে। কান দু’টি এখনো ঠিক করা হয়নি। তবে দীঘল ধূসর চুলে ঢাকা থাকে বলে এই খুঁত সহজেই ধরা পড়ে না। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, নাক পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাওয়ার পরই হাত দেয়া হবে কানের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার কাজে। ম্যারিল্যান্ডের বাথেসডায় অবস্থিত রীড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে বিনা পয়সায় চিকিত্সা হচ্ছে আয়শার। অস্ত্রোপচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো ১১ মাস আগে। প্রত্যেক অস্ত্রোপচারের পরই আয়শাকে প্রয়োজনের বেশি হাসপাতালে থাকতে দেননি প্রবাসী মাতি-জামিলা দম্পতি যারা নিজেদের মেয়ের মতোই দেখাশোনা করছেন আয়শার। আয়শার বর্তমান বয়স মাত্র ২২। মাতি জানান, সে খুবই প্রাণোচ্ছল, তবে মাঝেমধ্যে বিষণ্নতা তাকে গ্রাস করে। পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেলে কী করবে— এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর সে দিতে পারে না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, সে তার স্বামীর কাছে ফিরে যাবে না। পাষণ্ড স্বামীও তার কোনো খোঁজখবর রাখে না। তালেবান প্রসঙ্গ তুললে সে চেঁচিয়ে বলতে থাকে- ‘ওরা বর্বর, ওরা মানুষরূপী শয়তান। ওরা নারীকে মানুষই মনে করে না। ভাবে শুধু ভোগের উপকরণ।’ আফগানিস্তান সম্পর্কেই মন বিষিয়ে উঠেছে আয়শার। ওখানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা খুবই কম। তার ধারণা— গেলে ওরা আবার তাকে ধরে নিয়ে যাবে। আমেরিকায় কাউকে ভালো লাগলে তার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধবেন কি-না, এমন প্রশ্ন করলে তিনি হ্যাঁ কিংবা না বলে এর জবাব দেন না। শুধু মুচকি হাসেন।