ক্রিকেটে স্পট ফিক্সিং

ইহাকে বলা হয় স্পোর্টস ক্যাপিটালিজম। ইহার কেন্দ্রে রহিয়াছে খেলাধুলার প্রতি সাধারণ মানুষের অনিঃশেষ ভালবাসা, কখনও বা উন্মাদনা। আর এই ভালবাসা ও উন্মাদনাই স্পোর্টস ক্যাপিটালিজমের প্রাণভোমরা। ইহাকে পুঁজি করিয়াই কালো পুঁজি লইয়া পুঁজিপতিরা হাজির, বিনিয়োগের জন্য। দেখা গিয়াছে, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজি লইয়া দল খুলিয়াছেন যাহারা, তাহাদের ক্রীড়া সংগঠক হিসাবে পূর্ব অভিজ্ঞতা নাই, ফলে ক্রিকেটের জন্য তাহাদের ভালবাসাও নাই। টাকার অবাধ ছড়াছড়ির টুর্নামেন্টে দুর্নীতিও হইতেছে অতি সহজে। বসিয়াছে জুয়ার আসর। প্রাণবন্ত-প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সহজাত ম্যাচের সমান্তরালে, পর্দার আড়ালে চলিতেছে আরেক ক্রীড়া। অন্তরালের খেলা ঠিকঠাক করিয়া দিতেছে স্টেডিয়ামের খেলাকে। একটা দুইটা কাঁচা ষড়যন্ত্র ধরা পড়িতেছে আইপিএল-বিপিএলে। শোরগোল পড়িয়াছে ক্রিকেট বিশ্বে। পর্দার অন্তরালে যে ক্রীড়া চলিতেছে, তাহা ক্রিকেটারদের পরিণত করিয়াছে ক্রীড়নকে। একসময় ক্রিকেটে কেবল টেস্ট খেলা হইতো। সত্তরের দশক হইতে ওয়ানডে খেলা শুরু হয়। টেস্ট ক্রিকেটের সময়, এমনকি ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম দিকে ম্যাচ গড়াপেটা বা ফিক্সিংয়ের কথা কখনো শোনা যায় নাই। ম্যাচগুলিও অনুষ্ঠিত হইতো জাতীয় ব্যবস্থাপনায়, আইসিসির তত্ত্বাবধানে। কিন্তু ধীরে ধীরে ওয়ানডে ক্রিকেটে স্পন্সররা যুক্ত হইতে থাকে, বিপুল অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটিতে থাকে। ম্যাচ গড়াপেটা করিয়া জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিবার ঘটনা ঘটিতে থাকে। অনেক নামী ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে এইসকল অভিযোগ আসিতে থাকে। ক্রিকেটের ভরকেন্দ্রও ইংল্যান্ড হইতে ভারতে সরিয়া আসে, তাহার ভিত্তি ছিল দুইটি—পুরা দক্ষিণ এশিয়াতেই ক্রিকেট-উন্মাদনা লক্ষণীয়; এইখানে ক্রিকেটকে ঘিরিয়া পুুঁজি পুঞ্জীভূত হইতেছে। বাংলাদেশও সেই উন্মাদনায় অধুনা সংযোজন। বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি দেশটির জন্য শ্লাঘারও বিষয়। আর কোনো বিষয়েই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যায়ে এইরকম অর্জন করিতে পারে নাই, তা খেলাধুলা হউক অথবা অন্য যেকোনো বিষয় হউক। লক্ষণীয় ইহাও যে, দক্ষিণ এশিয়ার খেলোয়াড়েরাই ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে বেশি পরিমাণে অভিযুক্ত হইয়াছে। বিশেষত পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা এই অভিযোগে বেশি অভিযুক্ত হইয়াছেন, ভারত-শ্রীলঙ্কা হইয়া এখন বাংলাদেশও এই কলঙ্কের কালি গায়ে মাখিয়াছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ঘিরিয়া জুয়ার আসর জমজমাট হইয়া উঠিয়াছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটনির্ভর প্রিমিয়ার লিগ নামক টুর্নামেন্টে ইহার প্রবণতা বহুলভাবে বাড়িয়াছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের আদলে শুরু হওয়া এইসব লিগে ক্রিকেটের আদলই পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়িয়াছে, নির্মমভাবে দৈর্ঘ্য কমিয়াছে, রঙ আর গ্ল্যামারের সমাবেশ ঘটিয়াছে, ক্রিকেটারদের উপার্জন বাড়িয়াছে, কিন্তু সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে ক্রিকেট। সেই ক্রিকেট, যাহার একটা গাম্ভীর্য ছিল এতদিন, একটা বনেদী-ভদ্রস্থ চেহারা ছিল এতদিন। এখন প্রিমিয়ার লিগকে ঘিরিয়া জুয়াড়িরা নানান খেলায় মত্ত হইয়াছে— নূতন প্রত্যয় তৈরি হইয়াছে, স্পট ফিক্সিং। এক বা একাধিক খেলোয়াড়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ওভারে নির্দিষ্ট পরিমাণ রান করানো অথবা না করানো স্পট ফিক্সিঙের সহজ উদাহরণ। এইরকম কিছু করিতে সমর্থ হইলে খেলোয়াড় পান বিপুল পরিমাণের অর্থ, জুয়াড়ি জেতেন তাহার চাইতে অধিক পরিমাণ। দিল্লি পুলিশ আইপিলের তিনজন ভারতীয় খেলোয়াড় গ্রেফতার করিবার পর ভারতে ধুন্দুমার কাণ্ড ঘটিয়া চলিতেছে। একের পর এক পদত্যাগে বাধ্য হইতেছেন ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা। বিগত বিপিএলের একটি ম্যাচ নিয়া এইরূপ দুর্নীতির তদন্ত করিতে আসিলে আইসিসির দুর্নীতি তদন্ত বিষয়ক সংস্থা আকসুর কাছে ঐ ম্যাচ ফিক্সিঙের কথা স্বীকার করিয়াছেন ক্রিকেটার আশরাফুল। আরও অন্য ক্রিকেটারের নাম উঠিয়া আসিতেছে সহ-ফিক্সার হিসাবে। ইহার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। অর্থের লোভ দেখাইয়া খেলোয়াড়দের এই অপকর্মে প্ররোচিত করিতেছে যাহারা, তাহাদের পরিচয় উদঘাটন করিয়া বিচার করাও দরকার। প্রয়োজন বিপিএল নামক অক্রিকেটীয় এই টুর্নামেন্টের সংস্কারও। এই ধরনের টুর্নামেন্টের নজরদারি ও নীতির আওতায় আনিতে বিসিবি বা সত্ ক্রীড়ামোদীদের সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো প্রয়োজন। এই ধরনের দুর্নীতি দূর করিতে আইসিসি এবং ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে একত্রে কাজ করিতে হইবে। নচেত্ তুমুল জনপ্রিয় ক্রীড়াটি দ্রুত তাহার আস্থা হারাইবে মানুষের কাছে, মানুষও বঞ্চিত হইবে আনন্দ করিবার অন্যতম উপলক্ষ হইতে।