স্মরণ

জগত্ কল্যাণে ত্রিকালদর্শী বাবা লোকনাথ

নিজের সুখানুসন্ধানে যখন আমরা বিভিন্ন স্থানে বেরিয়ে পড়ি পরিণামে আমরা কিন্তু অসুখি হয়ে অর্থাত্ বিফল হয়ে ফিরে আসি। এই যে, আত্মকেন্দ্রিকতার বেড়াজালে নিজেকে ব্যস্ত রেখে আমরা সর্বদা মগ্ন থাকি এর বিপরীতে আমরা তত অসুখি পরিবারের সদস্য হচ্ছি। কল্যাণ যখন সমষ্টিকল্যাণে রূপান্তর বা পরিবর্তিত না হচ্ছে ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে আসার পূর্বেই আমাদেরও বাঞ্ছিত সুখ ফুরিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অভিজ্ঞতা মন্থন করে বলেছিলেন, আমরা যত অপরের কল্যাণে আত্মবিসর্জন দিতে না পারব ততদিন আমরা স্থায়ী সুখের সন্ধান বা ঠিকানা খুঁজে পাব না। আমরা মন্দির গড়ি, মসজিদ গড়ি কিন্তু যদি সঠিকভাবে মানুষ গড়তে না পারি ততদিন মানুষের মধ্যে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন-এর ছোঁয়া লাগবে না। কবির ভাষায়, “আমাদের মাঝে কবে হবে সেই ছেলে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”। আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে অপরকে অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। আমাদের সময়ের দাবি যুগোপযোগী পরিবর্তনের সক্রিয় ধারাকে জনকল্যাণে নিবেদন করা। সংগঠন করি আমরা অথচ নিজেরাই সংগঠিত নই -এ অবস্থায় বিভিন্ন পদ-পদবী ধারণ করে আত্মমর্যাদা প্রসারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা ভাষণ দেই, কিন্তু নিজেই সেই ভাষণের অনুশাসন পালনে অভ্যস্ত নই-এই যদি হয় সামাজিক বা ব্যক্তি-জীবনের প্রেক্ষাপট তা হলে সংগঠনের মূল আদর্শ বাস্তবায়ন অলিক কল্পনাপ্রসূত। ভোগবিলাস আত্মকেন্দ্রিক জগতে মানুষকে আচ্ছন্ন করে আত্মমগ্ন করে তোলে যা সমষ্টিকল্যাণের রাস্তা রুদ্ধ করে দেয়। আজ যারা বিভিন্ন সংগঠনে বিভিন্ন পদে নাম লেখাতে ব্যস্ত তারা তাদের ভুল বুঝতে সক্ষম হবে। সমস্যা মানুষই তৈরি করছে অবচেতন মনে কিন্তু যখন সচেতন ব্যক্তিত্বের কর্মপ্রয়াস উপলব্ধি হয় তখন সে তার স্ব অবস্থানে ফিরে আসে। আমাদের জীবনধারায় পরিবর্তন আনা খুবই জরুরি। এই পরিবর্তন নিজে থেকে না চাইলে কাহারও জীবনে ফিরে আসে না। আমরা সহজলব্ধ জিনিসে সহজেই মুগ্ধ হয়ে পড়ি। সত্যিকার ভাল জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি না। সমুদ্রে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার লোক অবগাহন করে পবিত্র হচ্ছে, এতে সমুদ্রের ফিরে তাকাবার সময় নেই। সেইরূপ অনাথের নাথ বাবা লোকনাথ অনন্ত প্রেমের সাগর, তার চরণছায়ায় কত মানুষ পবিত্র হল তার ঠিকানা নেই। আমরা যদি পুকুর বা খালের সাথে সংযোগ রাখি একদিন তা ফুরিয়ে যাবে কিন্তু সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত হলে তা ফুরাবে না। ভগবান শংকারাচার্য তাঁর গীতার ভূমিকাভাষ্যে বলেছেন, “অধিক গুণসম্পন্ন কয়েকটি মানুষ একটি শুদ্ধভাবকে আশ্রয় করে উজ্জীবিত হয়ে এগিয়ে গেলে ঐ ভাবটি চিরস্থায়ী হয়। সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে অগণিত মানবিক কল্যাণের রাস্তা প্রশস্ত করে”। বর্তমানে পৃথিবীতে চলছে অমানবীয় সংঘাতবহুল সংগ্রাম। পরস্পরের মধ্যে পার্থিব সম্পদ আহরণে চলছে অসম প্রতিযোগিতা। চরমপ্রাপ্তি বোধহয় এর মধ্যেই নিহিত আছে। এই স্বার্থময় প্রতিযোগিতায় বিভেদ এর রাস্তা হয় প্রশস্ত। বাবা লোকনাথ সাধন শেষে ঘোষণা করলেন, “তোদের ভগবানের সাথে আমার দেখা হয়নি। আমি দেখেছি আমাকে, আমি বদ্ধ আছি কর্মে; আর কর্ম বদ্ধ আছে সংসারে। সংসার বদ্ধ আছে জিহ্বা আর উপস্থে। যে এই দুটিকে সংযম করতে পেরেছে সেই সিদ্ধি লাভ করতে পেরেছে”। অর্থাত্ জীবে জীবে যার অধিষ্ঠান তিনিই সবার মাঝে বিরাজমান। পবিত্র। যীশুখ্রীষ্ট যেমন বলেছেন, “আমি এবং আমার পিতা এক”। এ আত্মোপলব্ধিই সর্বভূতে তাঁর বিদ্যমানতা প্রমাণ করছে। এই বস্তুর অন্বেষণই সকল ধর্ম ও মতের মূল ভিত্তি। একেরই স্মরণ বহুভাবে, বহুনামে ও বহুপথে। এই চেতনার বিকাশে মুছে যাবে বিভেদ, গড়ে উঠবে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা। সৃষ্টি হবে পুষ্পিত ভালবাসা ও অভিন্ন হূদয়। “মোরা অন্ধ জ্ঞানহীন, কীবা বুঝি তাঁর, অহং-এর ঘোরে করি আমার-আমার”। লেখক :সেবাইত ও সাধারণ সম্পাদক, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, স্বামীবাগ, ঢাকা