বাজেট ভাবনা-২০১৩-১৪

রপ্তানিমুখী শিল্পে ঋণের সুদ হ্রাস এবং ইনসেন্টিভ প্রয়োজন

আগামী ৬ জুন মহান জাতীয় সংসদে পেশ হবে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বাজেট। বিরোধীদলকে সংসদে এসে বাজেট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছেন মাননীয় স্পীকার। বাজেট সংবাত্সরের আয় ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারিত থাকে। রাজস্ব অংশ ছাড়াও বার্ষিক উন্নয়ন কার্যবিবরণী বিধৃত থাকে এই এক বছরের অগ্রীম হিসাব তালিকায়। বাজেটের মোট আকার হতে পারে ২২২ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ৭৪ হাজার কোটি টাকা থাকছে বার্ষিক উন্নয়ন কার্যসূচিতে (ADP), চলতি অর্থবছর ২০১২-২০১৩ বাজেটের আকার ছিল ১৯৩ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ADP’র ৫৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা কাঁটছাট করা হয়েছে। এ বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য থোক বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রাথমিক কাজে প্রায় পুরোটাই ব্যয় করা হয়েছে। আগামী বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য ৬.৮৫ হাজার কোটি টাকা রাখা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মত ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিতে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া এধরনের বৃহত্ প্রকল্প গ্রহণ বাস্তব সম্মত হচ্ছে না। কয়েকজন অর্থনীতিবিদ এ প্রকল্পকে ফলস প্যারাডাইম (False Paradim) বলেছেন। নির্বাচনী ওয়াদা পূরণের অংশ হিসাবে সরকারকে এর বাহিরে যাবারও উপায় নেই। এটাকে সরকারের মেয়াদের শেষ বর্ষের এবং নির্বাচনী বছরের বাজেট বলা হচ্ছে। জাহাজ নির্মাণসহ রপ্তানিমূখী শিল্প ঋণের সুদ কমানো এবং রপ্তানি মূল্যের উপর ইনসেন্টিভ প্রথা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। পোশাক শিল্পখাত পুরোন হওয়াতে এ সেক্টর থেকে সরকার ইনসেন্টিভ স্থগিত রাখতে পারে। তবে ফ্যাক্টরিগুলোতে গ্যাস, বিদ্যুত্, শ্রমিকদের হাসপাতাল, মজুরি প্রথা আপডেট রাখার কর্ম-পরিকল্পনা ২০১৩-১৪ বাজেটে নিয়ে আসতে হবে সরকারকে। তিন যুগ ধরে পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতে ইনসেন্টিভ দেয়া হচ্ছে। এ কারণ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে পোশাক কারখানার নিয়ন্ত্রণ প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের হাতে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্প দেশের মোট রপ্তানির একটি বৃহত্ অংশ অর্জন করছে। শিল্প সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে রপ্তানিমূখী সকল পণ্য মূল্যের উপর এ ইনসেন্টিভটা হওয়া প্রয়োজন। শাক-সবজি, আলু, পান ইত্যাদির সঙ্গে আরো কিছু অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। রপ্তানিমূখী শিল্প ও রপ্তানি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ কাজের Fixed-k & Working-K উপর সুদের হার Single digit এ নামানো প্রয়োজন। তবে কৃষিভিত্তিক খাতে এক সংখ্যার সুদ ধার্য আছে। পোশাক শিল্পের চতুর্মূখী বিপর্যয় বাজার সক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলেছে। এখাতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ ছিল বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত কিংবা প্রত্যাহার করলে দেশের এক কোটি লোকের মধ্যে একটি অংশ বেকার হয়ে পড়বে। যেখানে ঘরে ঘরে চাকরি সংস্থান করা একান্তই প্রয়োজন ছিল। এই নির্বাচন পূর্ব ওয়াদা সরকারের ভেস্তে গেছে। শ্রমিক অসন্তোষ, ঘন ঘন ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও কারণে ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান স্বয়ংভর হবে পোশাক রপ্তানি খাতে। পোশাক শিল্প সংকট দূর, রপ্তানি আয় বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পোশাক ও পাট শিল্পের রপ্তানি কমে যাওয়াতে পণ্যবাহী জাহাজ, ড্রেজার (Dredger), ওসানগোয়িং টাগ (Ocean Going Tug), যুদ্ধ জাহাজ রপ্তানি খাতকে গুরুত্ব দিলে জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব। GDP ৭% হতে ১২% পর্যন্ত ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন। হরতাল, অবরোধ, সহিংস আন্দোলন শিল্প উত্পাদন ব্যাহত করছে সত্য, এটা বন্ধ করার জন্য রাজনৈতি স্থিতিশীলতা দরকার। বর্তমান সময়ে অনেকে উত্পাদন খরচ মেটাতে পারছে না। জ্বালানি ঘাটতি ও ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। জাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানি শিল্পে ঋণের সুদ হার হ্রাস, ক্ষেত্রবিশেষে মওকুফ এবং সার্বিকভাবে ইনসেন্টিভ আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। সেজন্য বাজেটে অতিরিক্ত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংভরতা, খাল কাটার সুফল। বছরে প্রায় ৪ কোটি টন খাদ্যশস্য ও খাদ্য পণ্য উত্পাদনের জন্য নদী খনন, পানি প্রবাহ, সার উত্পাদন, স্থানীয় সরকারের রাস্তাঘাট খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। প্রত্যেক অর্থবছর শেষে ADP’র টাকা ব্যয় ও ছাড় করাতে তাড়াহুড়া লেগে যায়। বহু বছরের পুরানো অভ্যাস থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে না প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীরা। PPP উদ্যোগ আধুনিক ও সময় উপযোগী। চার বছর পার হয়ে গেছে শুধু নীতিমালা ও কমিটি গঠন কাজেই। গত এগার মাসে বরাদ্দ অর্থের ৩০% এর উপরে ব্যয় করতে সক্ষম হয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। ADP’র অন্যান্য প্রকল্পের খরচ করতে পেরেছে ৬৪% মাত্র। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের বাজেটের মেয়াদ শেষ হতে বাকী মাত্র ১ মাস। অনেকে অব্যয়িত অর্থ ফেরত যাওয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বলে মনে করছেন। ইতিমধ্যে বৈদেশিক কিছু অর্থ ফেরত চলে গেছে। নারী সক্ষমতা ও উদ্যোক্তা বাড়ানোর জন্য ১০০ কোটি টাকা চলতি বাজেটে বরাদ্দ ছিল। ব্যয় হয়েছে মাত্র ২০ কোটি টাকা। এজন্য এখাতে নতুন বাজেটে বরাদ্দ খাকছে মাত্র ৮০ কোটি টাকা। অর্থ ফেরত যাওয়াকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বলার কারণ PP, DPP, অর্থ ছাড়ের ফাইল, অনুমোদন ইত্যাদি প্রায়শই বিলম্বিত হয়। সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের বেতন-ভাতা চালাতে ঋণ নির্ভর হয়ে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট হতে ১ লক্ষ কোটি টাকা ভূয়া ঋণ, ঋণপত্র ও গ্যারান্টি ইস্যু হয়েছে। অনেকে এ টাকা নিয়ে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন। ফলে এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো স্বাভাবিক ঋণ দান কাঠামো হারিয়ে ফেলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসমূহ তাদের মূলধন বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থের বরাদ্দ চেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। বৈশ্বিক মন্দার কবলে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রনোদনা প্যাকেজ দিতে হবে। শেয়ার ছেড়ে ব্যাংকগুলো অর্থ সংগ্রহ করলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে। পরিবহন, বিদ্যুত্, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্ম ইত্যাদি খাতকে ADP তে অগ্রাধিকার হিসাবে জোর দেয়া হয়েছে বেশি। ২০১৩-১৪ বাজেট নিয়ে এতো অলোচনা হয়েছে যে, এবারের বাজেটের গোপনীয়তা বলতে তেমন কিছু থাকছে না। সুপারিশ ও মন্তব্য আসতে পারে কিন্তু কি সিদ্ধান্ত করা হবে তা প্রকাশ না করাই ভাল ছিল মাননীয় অর্থমন্ত্রীর। বাজেট ধারাবাহিকতায় এ অর্থমন্ত্রীর ৫ম বারের বাজেট, পুনরায় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে ৬ষ্ঠ বাজেট দিবেন অথবা সরকার পরিবর্তন হলে গণতান্ত্রিক সরকারের অর্থমন্ত্রী তার ১ম বারের বাজেট পেশ করবেন। শেষ বাজেট হিসাবে সরকারের জনপ্রিয়তা অর্জনের বিশেষ উদ্যোগ থাকছে। অনেকগুলো অপ্রচলিত প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে এবারের বাজেটে। অতিরিক্ত অর্থব্যয়ের নির্দেশনা ঠিকই থাকছে কিন্তু বাড়তি ব্যয়ের অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি কি হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় ও সঙ্কা থেকেই গেল। শোনা যাচ্ছে ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন করারোপের ব্যবস্থা আসছে। বছরে কোন ব্যক্তি ৫ লক্ষ টাকার Gross Profit অথবা আয় করলেই তাকে বাধ্যতামূলক আয়কর দিতে হবে। আয়কর ক্ষেত্র ও কর আদায় Supervision শক্ত করতে হবে। ডান-বাম নিষ্ক্রিয় হলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। নাগরিকগণ সে সমস্ত কমন সার্ভিস ভোগ করে তাদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় সময় মতই করতে হবে। তাছাড়াও স্বল্পমূল্যে আরো কিছু কমন সার্ভিস বাড়িয়ে কর আদায় ক্ষেত্র বাড়ানো যায়। কালো টাকা সাদা করার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাবও আসছে নতুন বাজেটে। অবৈধ টাকার উপর করারোপ করে সাদা করার পদ্ধতি ঠিক নয়। সরকার সংবিধান ও আইনের সাথে সঙ্গতি রেখে মাঝারি ও বৃহত্ শিল্পে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের স্বার্থে এনবিআর অথবা দুদক Capital (k) Explanation চাইবে না মর্মে ঘোষণা দিতে পারে। অন্যভাবে অবৈধ টাকা সাদা করার ঘোষণা করা ভুল হয়ে যেতে পারে। World Bank ১২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে দেবার অঙ্গীকার ছিল কিন্তু বিভিন্ন অনিয়ম ও গড়মিল পাওয়াতে তারা পূর্বের প্রতিশ্রুতির সমপরিমাণ অর্থ অন্য তিনটি প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য পুনরায় ফিরে এসেছে। দাতাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভুলত্রুটি আমাদেরকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ উন্নত দেশের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য মধু মিশ্রিত ব্যবহার করতে হবে। রূঢ় বা রাবিশ হলে চলবে না। আমাদের আগামী বাজেট হোক গণমুখী ও বিনিয়োগকারীদের নিকট গ্রহণযোগ্য। সবচেয়ে বড় কথা Corruption Deduction, Managerial Accounts এবং Bank Balance Administration কার্যকর করার ব্যাখ্যা আগামী বাজেটে থাকলে সরকার সফল হতে পারে, অন্যথায় নয়। লেখক :সাবেক ট্রেজারার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়