উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ রহিয়াছেন চরম উত্কণ্ঠার মধ্যে। বাঁধ ভাঙ্গিয়া যে কোনো সময় জলমগ্ন হইয়া যাইতে পারে বিস্তীর্ণ এলাকা। ভাসিয়া যাইতে পারে মাঠের ফসল। বাঁধ মেরামত করা না হইলে তাহাদের জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিবার আশংকা। সম্প্রতি এই খবর ছাপা হইয়াছে পত্রিকান্তরে। প্রকাশিত সচিত্র সংবাদে দেখা যায়, শ্যামনগরের দক্ষিণ পাতাখালি এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙিতে ভাঙিতে একেবারেই কংকালসার হইয়া গিয়াছে। ভরা নদী ফুঁসিতেছে। পূর্ণিমায় কিংবা বর্ষায় পানির চাপ বাড়িলে ভাঙিয়া দুর্বল হইয়া যাওয়া বাঁধ উহা সামলাইতে পারিবে না। জানা যায়, উপকূলীয় জনপদ রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড সাতক্ষীরা জেলায় ১১টি পোল্ডারের আওতায় ৮০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে। এর মধ্যে বিভিন্ন অংশে ৪৮ কিলোমিটার বাঁধের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহ মেরামত করিবার জন্য ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ চাহিয়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠান হইয়াছে। সেই পত্রের জবাব না আসা পর্যন্ত স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অপেক্ষা করিতেই হইবে। কিন্তু জোয়ারের পানি ততদিন নাজুক বাঁধের কিনারায় শান্ত হইয়া বসিয়া থাকিবে এমন আশা করা যায় না। বর্ষা আসিয়া গিয়াছে। নদীর পানি ফুলিতেছে। পূর্ণিমায় জোয়ার আসে, আসিবে। মহাসেন গিয়াছে, সিডর-আইলার ক্ষত শুকায় নাই। সেই দুর্যোগে যে বিপন্ন দশার সৃষ্টি হইয়াছিল, সেই সময়ে যেইসব বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল, সেইসবও অনেক ক্ষেত্র্রে পুরাপুরি সংস্কার হয় নাই। এখন বিপদ স্কন্ধের কাছে শাঁ শাঁ করিতেছে। শুধু সাতক্ষীরা জেলা বলিয়া কথা নহে, উপকূলীয় অন্যান্য জেলাতেও যেইসব বেড়িবাঁধ দেওয়া হইয়াছে, সেই সবের অনেক স্থানে ভাঙিয়া গিয়াছে কিংবা ধসিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো পত্রিকায় এই ধরনের একটি-দুইটি খবর প্রকাশিত হইয়া থাকে। গত রবিবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হইয়াছে চট্টগ্রাম রক্ষা বেড়িবাঁধের হালফিল দুরবস্থার খবর। হালিশহর থানাধীন চৌচালা হইতে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধের কমপক্ষে ৬টি স্থানে মাটি সরিয়া গিয়াছে। সাম্প্রতিক মহাসেনের আঘাতে বাঁধের নানা স্থানে ফাটল দেখা দিয়াছে। ঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ। সময়ান্তরে বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেওয়া, মাটি ক্ষয়ে যাওয়া কিংবা ধসিয়া পড়া কোনো অকল্পনীয় ব্যাপার নহে। এইসব বাঁধের বেশিরভাগই কাঁচা। মাটির বাঁধ ভাঙিবে, ক্রমান্বয়ে ধসিয়া পড়িবে-ইহাই স্বাভাবিক। এইসব বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণই হইল বড় কথা। যখন যেখানে ফাটল দেখা দেয় কিংবা ভাঙ্গন শুরু হয়, তখনই মেরামত করা হইলে সমস্যা বাড়িতে পারে না। কিন্তু ক্ষতি একেবারে স্কন্ধের উপর আসিয়া না পাড়িলে আমরা হুঁশিয়ার হই না। মেরামত-সংস্কারের কাজ একটা অব্যাহত প্রক্রিয়া। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রকৌশলিগণের নিয়মিত তদারকি একান্ত প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের একটা ভূমিকা থাকা আবশ্যক। বাঁধে ফাটল কিংবা ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিবার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিকারের পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত কর্তব্য। বাঁধ নির্মাণের পর উহার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান থাকা দরকার। সময়ের কাজ সময়ে করা না হইলে সমস্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কথায় বলে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ। ইহা সাধারণ লোকে বুঝিতে পারে। কিন্তু যাহারা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাহারা বুঝিতে চাহেন না। ইহাই পরিতাপের বিষয়। শুকনা মৌসুম গিয়াছে । বাঁধ সংস্কারের কাজ তখনই হইতে পারিত। এখন তো বর্ষা আসিয়াই গিয়াছে। এমতাবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব উপকূলীয় সকল বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহ মেরামত করা কর্তব্য।