[ বা জে ট ]
পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি বেইল-আউট প্যাকেজ প্রস্তাব
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২১:০৯
পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের পদক্ষেপ বাজার উজ্জীবিত করতে সব সময়ই বিশেষ অবদান রেখেছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, প্রস্তাবিত ফান্ড বাজারে বিতরণ করা হলে আস্তে আস্তে শেয়ারের মূল্য ও সূচকের গতি ঊর্ধ্বমুখী হবে। ফলশ্রুতিতে আস্থার অভাব, যা বর্তমানে তলানীতে এসে ঠেকেছে, তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। বাজার একবার স্থিতিশীল হয়ে গেলে তারল্য ঘাটতি ও আস্থাহীনতা কোন সমস্যা হয়ে থাকবে না।
আমরা সকলেই জানি যে, দেশের পুঁজিবাজার গত প্রায় আড়াই বছর যাবত্ একটি যম-ভূতের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ৫ ডিসেম্বর ২০১০ বাজার ক্রাশ করার পর অদ্যাবধি এটি কোন স্থিতিশীল পর্যায়ে আসতে পারেনি। ৫ ডিসেম্বর ডিজিইএন-এর সাধারণ সূচক ৮৯০০ পয়েন্ট এবং লেনদেন ৩২০০ কোটি টাকায় ওঠার পর সেই যে পতন শুরু হয়েছে ৩০ এপ্রিল ২০১৩ পর্যন্ত তা প্রায় একই পর্যায়ে চলমান আছে। কারণ ৩০ এপ্রিল ২০১৩ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন হয়েছিল ১৩৬ কোটি টাকা এবং সূচক নেমে এসেছিল ৩৬১৮ পয়েন্টে। এর আগে মাঝে মধ্যে বাজারে ঝলক আসলেও তা কখনো স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী।
বাজারের সাম্প্রতিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৫ জানুয়ারি ২০১৩ লেনদেন হয় মাত্র ১০৪ কোটি টাকা, ২০ জানুয়ারি ১০৬ কোটি, ১৮ মার্চ ১৩৮ কোটি এবং ২৮ মার্চ ১১৬ কোটি টাকা। উল্লেখ্য যে, পুরো জানুয়ারি মাসই সূচক প্রায় ৪০০০ পয়েন্টের মধ্যেই অবস্থান করছিল। একইভাবে এপ্রিল ২০১৩ প্রায় পুরো মাসই লেনদেন ২০০ কোটির মধ্যেই অবস্থান করছিল এবং সূচক কখনো ৪০০০ পয়েন্টে উঠতে পারেনি। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে লেনদেন কোনদিনই ২০০ কোটির উপরে উঠতে পারেনি এবং সূচকের অবস্থানও একইভাবে খুবই শোচনীয় ছিল। অর্থাত্ সূচক মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ৪০০০ পয়েন্টের নিচেই ছিল। ১৫ মের পর থেকে সূচক ও লেনদেনের গতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী লক্ষ্য করা যায়। এর মূল কারণ হিসাবে বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ১২০০ কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ৯০০ কোটি টাকার ফান্ড ছাড়ের ঘোষণা এবং বাজেটে কালো টাকা বিনিয়োগ করার সুবিধা অব্যাহত রাখা, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডের কর অব্যাহতি, প্রিমিয়াম কর প্রত্যাহারের সম্ভাবনা এবং লভ্যাংশে করমুক্ত সীমা বাড়ানো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পর্যালোচনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, এর মধ্যে অনেকগুলোই পূর্বে বিদ্যমান ছিল; কিন্তু পরবর্তীতে তা বাতিল করা হয়। বর্তমান বাজেটে আবার সেগুলো পুনর্বহাল করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো বাজারের জন্য শুভ সংবাদ। কালো টাকা বাজারে বিনিয়োগের সুবিধা এখনো আছে এবং এই বাজেটে তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা আসছে বলে খবরে প্রকাশ। কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিয়েও ইতিপূর্বে অনেক নাটক ও বিভ্রান্তি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। যে কারণে এর সুফল সত্যিকার অর্থে বাজার পায়নি। মনে হয় কালো টাকা ধারণকারীরা সরকারের এ ঘোষণায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। যার ফলে এই খাতে উল্লেখযোগ্য কোন বিনিয়োগ আসেনি। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মানি-লন্ডারিং-এর আওতায় আনায় বৃহত্ অংকের বিনিয়োগকারীরা এই বাজারে বিনিয়োগে খুবই ইতস্তত বোধ করেছেন বলে অনুমিত হয়। আসলে মানি-লন্ডারিং-এর অজুহাতে পুঁজিবাজারে দুদকের উঁকি-ঝুঁকি, আনাগোনা বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বৈ-কি! আমার মনে হচ্ছে, অর্থবাজার ও পুঁজিবাজারে মানি-লন্ডারিংয়ের জুজুর ভয় অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে, যার অপপ্রচার এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। আমাদের মনে রাখলে ভালো যে, Best regulation is less regulation.
এই প্রসঙ্গে একটু পিছনে ফিরে যেতে চাই। ২০১১ ও ২০১২ সালে বাজারকে স্থিতিশীল করতে বিশেষ করে বাজারের তারল্য বৃদ্ধি করতে বেশকিছু উদ্যোগ বিভিন্ন সংস্থা থেকে নেয়া হয়ে ছিল। এর মধ্যে আইসিবি-এর নেতৃত্বে ৫০০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড গঠন, বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (BAB) কর্তৃক আরো ৫০০০ কোটি টাকার বাজার স্থিতিশীলকরণ ফান্ড, এফবিসিসিআই কর্তৃক ৫০০ কোটি টাকার বাজার সহায়ক ফান্ড এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিজ এ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক আরো ৫০০০ কোটি টাকার বাজার সহায়ক ফান্ড গঠনের ঘোষণা ছিল অন্যতম; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এসব ঘোষণায় বাজার ক্ষণিকের জন্য চাঙ্গা হলেও তা কখনো স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। বাজারের এ ধরনের অপ্রত্যাশিত উঠানামার কারণে উপরোক্ত সংস্থা বা ঘোষণাকারীদের কোন লাভ-ক্ষতি না হলেও বাজার পেয়েছিল অশুভ ইঙ্গিত। যার বলি হয়েছেন অসংখ্য নিরপরাধ বিনিয়োগকারী। এসবের কারণেই মার্জিন লোন হিসাবে সংগৃহীত বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৫০০০ কোটি টাকা আটকা পড়ে যায়। যার পুরোটাই বর্তমানে শ্রেণীবিন্যাসিত। এই বিপুল অংকের অর্থ বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিভিন্ন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজে অনাদায়ী। এসব মার্জিন লোনের অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর ইকুইটি বর্তমানে মাইনাসে। অর্থাত্ তারা যে বিনিয়োগ করেছিলেন সেটাতো খুইয়েছেনই বিপরীতে প্রত্যেকটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ তাদের নিকট পাওনাদার। এতে তারা যেমন বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তেমনিভাবে প্রত্যেকটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও লোন প্রদানকারী ব্রোকারেজ হাউজ বিপদগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ইহা একটি উদ্বেগজনক অবস্থা। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তাবিজ-দোয়া করে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। এর জন্য চাই দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা (Political will) এবং বাজারকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে নিয়ে যেতে বড় ধরনের ধাক্কা (Big push)। এমতাবস্থায় আমি মনে করি, বাজারের গতি ফিরিয়ে আনতে এবং বাজার স্থিতিশীল করতে বেইল-আউট প্যাকেজ খুবই জরুরি যার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
অপশন-১
উক্ত প্রস্তাবের আওতায় ৫০০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা যেতে পারে। উক্ত তহবিলে বাংলাদেশ বাংকের প্রস্তাবিত ৯০০ কোটি টাকা, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি করে ৩০টি ব্যাংক থেকে ৩০০০ কোটি টাকা, আইসিবি থেকে ৬০০ কোটি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ৪টি ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা— সর্বমোট ৫০০০ কোটি টাকার একটি কনসোর্টিয়াম ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। এই ফান্ড আইসিবি, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং প্রতিষ্ঠিত ব্রোকারেজ হাউজ যাদের পরিশোধিত মূলধন, ম্যানেজমেন্ট কাঠামো ইত্যাদি সন্তোষজনক তাদেরকে এই ফান্ড ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউজগুলো তাদেরকে প্রদত্ত ফান্ড তাদের পোর্টফোলিও একাউন্ট ও ডিলার একাউন্টে ব্যবহার করবে। এই ফান্ডের সুদ ৫% হারে অথবা ব্যাংকরেট—এ দুয়ের মধ্যে যেটি অধিক সেই হারে প্রযোজ্য হবে। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলো প্রাপ্ত এই ফান্ড ৭% সুদহারে বিতরণ করবে যাতে ২% সুদহার তাদের সুপারভাইজরি ও সার্ভিস চার্জ হিসাবে পেতে পারে।
আলোচ্য লোন-এর মেয়াদকাল হবে ৭ বছর, যার মধ্যে ২ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। অর্থাত্ ২ বছরের মধ্যে তারা কোন লোন পরিশোধ করবে না। ঋণ বিতরণের ২ বছর পর থেকে পরিশোধকাল আরম্ভ হবে। গ্রেস পিরিয়ড দেবার উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে করে এই ২ বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলো একটি সন্তুষ্টজনক তারল্য বা ক্যাশফ্লো সৃষ্টি করতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুই বছর পর থেকেই ঋণ গ্রহণকারী মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে মূল টাকা সুদসহ পরিশোধ করিতে বাধ্য থাকবে।
উক্ত ফান্ডের কাষ্টোডিয়ান ও বিতরণের অভিভাবক হিসাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন যে কোন দুইটি ব্যাংক এবং আই,সি,বিকে নিয়োজিত করা যেতে পারে। তারা ব্যাংকে একাউন্ট খোলাসহ এই ফান্ডের যাবতীয় কার্যক্রয় অর্থাত্ বিতরণ ব্যবস্থা, আদায় কার্যক্রম ইত্যাদি নিশ্চিত করবে। ঋণ বিতরণের সময় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান অর্থাত্ মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ প্রতিটি স্তরে দুই কোটি টাকা হিসাবে ঋণ গ্রহণ করবে। যা এক একটি ট্রান্স হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং সেইভাবে পরিশোধ প্রক্রিয়াও নির্ধারিত হবে।
অপশন-২
উপরোক্ত প্রথম প্রস্তাব সরকারের কাছে গৃহীত না হলে সরকার আলোচ্য অপশন-২ বিবেচনা করতে পারে। উক্ত প্রস্তাবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রস্তাবিত ৯০০/- কোটি টাকার ফান্ড এবং আই.সি.বি কে ৭০০/- কোটি টাকার সহায়ক তহবিল, রাষ্ট্র মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংকগুলো দ্বারা ৯০০/- কোটি টাকার একটি তহবিল এবং সরকারের প্রস্তাবিত ২০১২-২০১৩ এর বাজেট থেকে পুঁজি বাজারের জন্য ২৫০০/- কোটি টাকার একটি তহবিল বরাদ্দ করা যেতে পারে। উক্ত তহবিলের কাস্টোডিয়ান, বিতরণ প্রক্রিয়া ও সুদহার ইত্যাদি অপশন-১-এ বর্ণিত নিয়মাচার অনুযায়ী হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রতিটি ব্যাংকের ফান্ড কস্ট এর তুলনায় বিতরণকৃত ঋণ এর সুদহার ৫% হওয়ায় এক্ষেত্রে ব্যাংকের আয়ে সম্ভাব্য ঘাটতি দেখা দিবে। এই অবস্থা দূরীকরণার্থে সরকারের তরফ থেকে ফান্ডকস্ট ও লেনডিং রেট-এর Differential cost সরকার কর্তৃক সাবসিডাইজ করতে হবে। অর্থাত্ ব্যাংকগুলোর ফান্ডকস্ট ১০% হলে ৫০০০/- কোটি টাকায় সরকার কর্তৃক ৫% হারে মোট ২৫০/- কোটি টাকা প্রতি বছর পুঁজিবাজারের স্বার্থে সাবসিডাইজ করা লাগবে। একইভাবে ফান্ডকস্ট ১২% হলে ৫০০০/- কোটি টাকায় বছরে ৩৫০/- কোটি টাকা সাবসিডাইজ করা লাগবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাজারে গতিশীলতা ফিরে আসলে সরকার পুঁজিবাজার থেকে যে আয় পাবে তা অবশ্যই প্রদত্ত সাবসিডি থেকে অনেক গুণ বেশি হবে। তাই এক্ষেত্রে সরকারের কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকার কারণ নেই।
অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে যে, এই ধরনের ফান্ড সব সময়ই পুঁজিবাজারকে গতিশীল ও চাঙ্গা করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। এই ফান্ডের প্রদান উদ্দেশ্য হবে বাজার থেকে প্রদত্ত গাইড লাইনের আওতায় যথার্থ পরিমাণে শেয়ার ক্রয় করে তুলে নেয়া। ফলে বাজারে সরবরাহরত শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যেসব শেয়ার মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলো ক্রয় করবে তা দুই বছরের জন্য লক-ইন থাকবে। পুঁজিবাজার থেকে শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তুলে নেয়ার এই প্রক্রিয়া প্রায় বছরখানেক সময় ধরে চলবে। এর ফলে বাজারে একদিকে যেমন তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি সরবরাহরত শেয়ারের সংখ্যা কমে গিয়ে যেসব শেয়ার সার্কুলেশনে থাকবে তার মূল্য বৃদ্ধিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এই ধরনের পুশ ও পুল পদ্ধতি বাজারে একটি সন্তোষজনক ভারসাম্য সৃষ্টি করে বাজারকে স্থিতিশীল ও বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের পদক্ষেপ বাজার উজ্জীবিত করতে সব সময়ই বিশেষ অবদান রেখেছে। বলতে দ্বিধা নেই যে, প্রস্তাবিত ফান্ড বাজারে বিতরণ করা হলে আস্তে আস্তে শেয়ারের মূল্য ও সূচকের গতি ঊর্ধ্বমুখী হবে। ফলশ্রুতিতে আস্থার অভাব, যা বর্তমানে তলানীতে এসে ঠেকেছে, তা বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে। বাজার একবার স্থিতিশীল হয়ে গেলে তারল্য ঘাটতি ও আস্থাহীনতা কোন সমস্যা হয়ে থাকবে না। বাজার আপন গতিতে সচল থাকবে। বর্তমানে তারল্য সমস্যা ও আস্থাহীনতার কারণে বাজার তার অন্তর্নিহিত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে, যার কারণে কখনও কখনও বাজার ঘুরে দাঁড়ালেও তা স্থিতিশীল থাকছে না।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাজারের এ জাতীয় দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় বেইলআউট স্কিম খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮ সালে ওবামা প্রশাসনের শুরুতেই আমেরিকার অর্থনীতি বিশেষ করে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসলে ব্যাংক ব্যবস্থা উন্নয়নে ট্রাবল এ্যাসেট রিলিফ প্রোগ্রাম (TARP)-এর আওতায় ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পুঁজিবাজার উত্তরণে ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়। যার সুফল শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্ব পেতে শুরু করেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ হংকং এর পুঁজিবাজার বিরাট ধাক্কা খেলে সে দেশের সরকার ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজারে ঢেলে দিয়েছিল। একই বছর ৩ সেপ্টেম্বর ওয়াল স্ট্রিট ৪০০ বিলিয়ন ডলার একটি মাত্র দিনে হারিয়ে ফেললে মার্কিন জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাদেরকে সান্ত্বনার বাণী শোনাতে এবং এই সংকটময় সময়ে ধৈর্য ধারণ করতে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে অভয় দান করতে হয়েছিল। তার পদক্ষেপের ফলে পরদিনই বাজার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিলে আসে। ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় যে অর্থনৈতিক মহামারী দেখা দিয়েছিল, যার ফলে থাইল্যান্ড, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে বড় ধরনের বেইলআউট প্যাকেজ গ্রহণের ফলে তিন বছরের মধ্যে দেশগুলো সংকট উত্তরণে সফলতা লাভ করে। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে তাইওয়ানে পুঁজিবাজার আঠার মাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আসলে সে দেশের সরকার ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঢেলে দিয়ে বাজারকে উজ্জীবিত করে।
নিম্নবর্ণিত অবস্থা থেকে আমাদের বাজারের করুণ চিত্র পরস্ফুিটিত হয়।
তারিখ সূচক লেনদেন
৫/১২/২০১০ ৮৯০০ ৩২.৫০ বিলিয়ন
৩০/৬/২০১১ ৬১১৭ ৯.৫৪ বিলিয়ন
২৯/১২/২০১১ ৫২৫৭ ৪.৫৯ বিলিয়ন
২৮/৬/২০১২ ৪৫৭২ ১.৭৭ বিলিয়ন
৩০/১২/২০১২ ৪২১৯ ২.৪৯ বিলিয়ন
৩১/৩/২০১৩ ৩৭২২ ১.৬৭ বিলিয়ন
৩০/৪/২০১৩ ৩৬১৪ ১.৩৬ বিলিয়ন
সুতরাং এই মুহূর্তে সময় নষ্ট করার কোন জো নেই। সরকার সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে প্রস্তাবিত বেইলআউট প্লান বাস্তবায়নে এগিয়ে আসলে বাজার অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে। সরকারের জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংকার
Email :aquadirchoudhury@gmail.com