বিশাল বাজেটে পরোক্ষ করের বোঝা বাড়ছে
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২২:৫২
শুল্কস্তরে পরিবর্তন ও পরোক্ষ আয় নির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামী বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। তবে বাজেট পেশের আগেই এবারে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নিয়ে এনবিআর ও অর্থমন্ত্রণালয়ে মতভেদ দেখা দেয়। অর্থমন্ত্রী আগামী বছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য স্থির করতে যাচ্ছেন। যেখানে চলতি বছরেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।
এ অবস্থায় এনবিআর চেয়ারম্যান নিজেও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যকে অবাস্তব আখ্যা দেন। বিশেষজ্ঞরাও তার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, বাজেটের আকার যেভাবে বাড়ানো হচ্ছে তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থ সংস্থানই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী বছর নির্বাচনী বছর হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে হরতাল অবরোধের মত পরিস্থিতি থাকতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচনের প্রতি নজর দিয়ে সরকার কর ছাড়, ক্ষেত্রবিশেষে অব্যাহতি ও কর অবকাশের সুবিধা দিতে যাচ্ছে। আবার নতুন করের ‘দৃশ্যমান’ বড় চাপও থাকছে না। তবে একই সময়ে নাগরিক সেবা এবং পরোক্ষ করের বিভিন্ন খাতে ‘অদৃশ্য’ চাপ আসতে পারে। অবশ্য সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতিবিদরা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে অভিহিত করেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান মনে করেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হলে তা হবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বড় ধরনের কর আরোপ করতে হবে।
অন্যদিকে একধাপ এগিয়ে রাজস্ব আহরণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা এনবিআর এই লক্ষ্যমাত্রাকে বলছে ‘অবাস্তব’। এনবিআর চেয়ারম্যান বাজেটে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা করার জন্য অর্থমন্ত্রীকে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও গেছে একই অনুরোধ। এ নিয়ে অর্থ বিভাগ-এনবিআরের মধ্যে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ সামপ্রতিক সময়ে আলোচিত খবর হয়ে উঠে। তবে অর্থমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার হিসাব অনুযায়ী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকাই হচ্ছে।
রাজস্বের এ লক্ষ্যমাত্রার সাথে একমত নন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায় অসম্ভব। বিনিয়োগে মন্দা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত। এই অবস্থায় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের কাছাকাছি না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ বা ২৬ হাজারের মধ্যে থাকলে তা হয়তো অর্জনযোগ্য ছিল।’
রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা হওয়ার বিষয়ে এখনো হাল ছাড়েনি এনবিআর। সংস্থাটি মনে করছে, আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যায়ে হলেও এই লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজারে আসবে। ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে এনবিআরের বাজেট প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই লক্ষ্যমাত্রা ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’। আগামী বছর যদি জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয় তাহলে অর্জন করা সম্ভব।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এই প্রবৃদ্ধি কি সম্ভব? যদি এই প্রবৃদ্ধি হয় তাহলে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। আমার বিশ্বাস এক পর্যায়ে এটি (রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা) যৌক্তিকীকরণ হবে।
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মূলত আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) উপরই ভরসা করতে হচ্ছে এনবিআরকে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানি কমতে পারে। অন্যদিকে মুক্ত বাণিজ্য চর্চায় বিশ্ব বাণ্যিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) শর্ত মানতে গিয়ে শুল্ক আরোপের নীতি থেকেও সরে আসতে হচ্ছে। এই অবস্থায় আমদানি শুল্কের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছর থেকে খুব একটা বাড়ছে না। তবে আয়কর চলতি অর্থবছর থেকে প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। অন্যদিকে ভ্যাট চলতি অর্থবছরের ৪০ হাজার ৪০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার উপর আরো ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে আদায় করতে হবে ৫১ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য পরোক্ষ করের আরো এক দফা চাপ আসবে আগামী বছর। এনবিআর এসব প্রকাশ না করলেও অর্থবছরের শুরুতে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকবে।
বর্তমানে ১৫০০ সিসি ও এর বেশি সিসির গাড়ির মালিককে নিবন্ধন ও ফিটনেস নিবন্ধনের সময় ১৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের কর দিতে হয়। আগামী বাজেটে ১৩০০ সিসির গাড়ির মালিকও এই করের আওতায় আসবেন। শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগসহ বিদ্যমান সুবিধা বহাল রেখে নতুন একগুচ্ছ সুবিধা দেয়া হতে পারে। জমি ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ গতবারের তুলনায় অবারিত হতে পারে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে পরিবার সঞ্চয়পত্রসহ এ খাতের কয়েকটি স্কিমে কর অব্যাহতি থাকতে পারে।
পরিবর্তন আসছে শুল্কস্তরে :শুল্ক খাতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা থাকছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণায়। আমদানি পণ্যের অতিমূল্যায়ন, অবমূল্যায়ন, শুল্ক ফাঁকি রোধেও ঘোষণা থাকবে। দেশীয় শিল্পের স্বার্থসংরক্ষণে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। পাশাপাশি ৯ শতাধিক পণ্যে (এইচএসকোড সম্পন্ন) নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ হচ্ছে। শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে বর্তমান শুল্ক ৩ শতাংশের স্থলে ২ শতাংশ করা হচ্ছে। মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হচ্ছে। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিনিয়োগ উত্সাহিত করতে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি শুল্কের স্তর হচ্ছে ৩ শতাংশ, ৫, ১২ ও ২৫ শতাংশ। ৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানির শুল্ক আর ২৫ শতাংশ সমপূর্ণ প্রস্তুত পণ্যের আমদানি শুল্ক। এ দুটি শুল্ক স্তরে কোন পরিবর্তন হয়নি। এর বাইরে চাল, ডাল, গম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ সার, বীজ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ০% শুল্ক হার অপরিবর্তিত থাকছে। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কস্তরেও পরিবর্তন আসছে।
বিদ্যমান ৯ স্তরের সম্পূরক শুল্ক স্তরের স্থলে ১০ স্তর বিশিষ্ট শুল্কস্তর (১৫%, ২০%, ৩০%, ৪৫%, ৬০%, ১০০%, ১৫০%, ২৫০%, ৩৫০% এবং ৫০০%) হচ্ছে। নতুন করে ১৫% যুক্ত হয়েছে।