বাস্তবতার সাথে সঙ্গতি রেখে বাজেট ধার্য করুন :সিপিডি
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২২:৫২
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সার্বিক পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বাজেট নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির ডিসটিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকবে। সমঝোতার ভিত্তিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ করতে না পারলে আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির উপর বিভিন্ন ধরনের অভিঘাত পড়তে পারে। তাই এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে বাজেট নির্ধারণ করতে হবে। দেশের সামপ্রতিক অর্থনেতিক পরিস্থিতি তুলে ধরতে গতকাল সোমবার সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। এ সময় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বৈদেশিক মন্দাভাব সত্ত্বেও দেশের বৈদেশিক খাতের আয় ভালো হয়েছে। রাজস্ব আয় এবং এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) ব্যয়ের পরিস্থিতি ভালো। মোদ্দকথা, অর্থনীতি স্তিমিত হলেও ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। তবে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব কম। বর্তমানে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হারও গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেও ব্যাংকের ঋণের সুদহার কমছে না। তাছাড়া উন্নয়নমুখী বিনিয়োগের চাহিদাও কম। কমে গেছে শিল্প খাতের যন্ত্রপাতি আমদানির পরিমাণও।
বর্তমান সরকারের গত চার বাজেটের মূল্যায়নে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত চার বছরে দেশের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের উপরে উঠে এসেছে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে। কৃষি খাতে ঋণ ও উপকরণ বিতরণে বড় ধরনের কোন সমস্যা হয়নি। পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পাওয়ার পদ্ধতি সহজ হয়েছে। তবে এ সময়ে নেতিবাচক দিক রয়েছে অনেক। এই সময়ে সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। সুশাসনের অভাবে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধস হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের দুর্নীতির রেকর্ড হয়েছে। ডেসটিনিসহ বিভিন্ন এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) কোম্পানিতে দুর্নীতির কারণে মানুষ টাকা হারিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক পিছিয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রালয়ের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর দূরত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। অনেক বিতর্ক সত্ত্বেও নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভারতের সাথে ট্রানজিটের মূল্য নির্ধারণে বিতর্ক, পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, লোকসানী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বেসরকারিকরণে মন্থর গতি, ভর্তুকি নিয়ে বড় সমস্যা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুদ মওকুফে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯০০ কোটি টাকার যে তহবিল দিচ্ছে এ ধরনের উদ্যোগ আরও আগেই নেয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া সুশাসনের বদলে তহবিল বলেই মনে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এ সময় সিপিডির পক্ষ থেকে তিনি অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
সামষ্টিক অর্থনীতি: বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বড় ধরনের নিম্নগতি দেখা গেছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১০ শতাংশেরও বেশি। এনবিআরের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে পড়ছে। মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ হলেও পরিমিত। সরকারি বিনিয়োগ বা উন্নয়ন খাতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত রয়েছে।
ব্যাংকিং খাত: সিপিডির মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং অতি সতকর্তার প্রবণতা। ব্যাংকের মূল সূচকগুলোর কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে কিছু চাপও রয়েছে। গত ৫ বছরের মধ্যে বর্তমানে ব্যাংকের ঋণ খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি।
বিদ্যুত্ খাত: অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়ন করা প্রয়োজন উল্লেখ করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাধ্যমে ৩৮০০ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তবে তা উত্পাদন করা যাচ্ছে না। ফলে ভর্তুকির চাপ বেড়ে গেলে জনগণ তার সুফল পাচ্ছে না।
পদ্মা সেতু: ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ দিয়ে পদ্মা সেতু করা বেশ কঠিন। এডিপি থেকে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলে তার প্রভাব পড়বে শিক্ষা, স্ব্াস্থ্য খাতসহ অন্য উন্নয়নমূলক খাতগুলোতে। আগামীতেও এডিপি থেকে এ ধরনের বরাদ্দ অব্যাহত রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই বিদেশি বিকল্প অর্থায়নের উত্স অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সভরেন বন্ড: সাভার ট্র্যাজেডিসহ দেশের সামপ্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সুদের হার বিবেচনায় সরকার সভরেন বন্ড ছাড়লেও তা আদায় করতে পারবে কিনা তা ভেবে দেখা দরকার।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: সিপিডির মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতিতে আগের তুলনায় বেশি প্রভাব পড়ে। সামনে এ অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সমঝোতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। সিজিই’র বিশ্লেষণ উল্লেখ করে সিপিডি জানিয়েছে, হরতালের কারণে জিডিপি কমে প্রায় ০.৯ শতাংশ, রফতানি কমে ২.৪ শতাংশ, আমদানি কমে ০.৮ শতাংশ, রাজস্ব আয় কমে ০.৭ শতাংশ এবং ভোগ কমে ০.৮ শতাংশ।