আন্তর্জাতিক নৌ-রুট গাবখান কি বন্ধ হয়ে যাবে

গাবখান খালসহ কঁচা নদীর পুরোটা জুড়ে এবং সন্ধ্যা ও বলেশ্বর নদীর অংশ নিয়ে যে পিরোজপুরে একটি আন্তর্জাতিক নৌ-রুট বিদ্যমান তা অজানা না হলেও তেমন প্রচারিত নয় সাধারণের কাছে। যদিও অনেকের কাছে বাংলার সুয়েজ খাল হিসেবে পরিচিতি তার। পিরোজপুরের সন্ধ্যা ও ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীকে সংযোগকারী ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘের গাবখান চ্যানেল দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথা আন্তর্জাতিক নৌ-রুট হিসাবে ৪০ বছর ধরে ব্যবহূত হয়ে আসছে। ভারতের পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশ এবং আসাম ও মেঘালয়ের নৌ-যোগাযোগের চ্যানেল এটি। অনিয়ন্ত্রিত নৌ ট্রাফিক সিগন্যাল, পাইলটবিহীন জাহাজ চলাচল আর নাব্যতা হ্রাসের কারণে এখন যা নৌ যোগাযোগ হুমকির মুখে। যে কারণে এ চ্যানেলে বাংলাদেশ-ভারত প্রটোকল চুক্তির জাহাজ এবং ঢাকা-খুলনা-মংলা-চট্টগ্রাম রুটের যাত্রী ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ চ্যানেলটি এখন বন্ধের উপক্রম। চ্যানেলের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় জোয়ারের সময় এতে মাত্র ৭/৮ ফুট পানি থাকে। ভাটার সময় সাধারণ জাহাজ চ্যানেল অতিক্রম করতে পারে না। জোয়ার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ঢাকা-খুলনা রুটের রকেট স্টিমার ঢুকলে চ্যানেলের বিপরীতগামী সকল জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয় চরের কারণে। সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১৪ আগষ্ট উভয় দিক থেকে নৌ-চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। গভীরতা কমে যাওয়ায় ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে গাবখান ক্যানেলের বাঁক সিগনাল যথাযথভাবে মেনে একমুখী জলযান চলাচলের জন্য এ কর্তৃপক্ষ বিশেষ নদী বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এর জন্য ঢাকা-মংলা ও খুলনা নৌ-রুটের একমাত্র এই গাবখান চ্যনেলটিতে জাহাজ চলাচলের উপর বেশ কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ জন্য কাউখালী স্টিমার ঘাট ও ঝালকাঠী স্টিমার ঘাটে নৌ ট্রাফিক সিগনাল রাখা হয়েছে। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি জাহাজ এবং কোস্টার কার্গো সবই নৌ ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে। কোন প্রান্ত থেকে চ্যানেলে একটি জাহাজ ঢুকলে অন্যপ্রান্ত থেকে ২-৩টি জাহাজ ঢোকে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে এক বছরে নৌ ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্যকারী দু’শতাধিক জাহাজের বিরুদ্ধে কাউখালী থানায় জিডি করা হয়। পিরোজপুর জেলার কাউখালীর সন্ধ্যা নদীর মোহনা থেকে ঝালকাঠী জেলার বিষখালী-সুগন্ধা ও ধানসিঁড়ি নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ চ্যানেল ১৮০০ সালের প্রথমে কাটা হয়। তখন অবিভক্ত ভারতে এ অঞ্চলের সঙ্গে আসামের যোগাযোগ, ব্যবসা, বাণিজ্য এই চ্যানেলের উপরে নির্ভরশীল ছিল। চ্যানেল খনন করার জন্য তত্কালীন খাল খনন সংস্থা ১৫৮ দশমিক ৫০ একর জমি পিরোজপুরের কাউখালী, ঝালকাঠীর শেখেরহাট ও গাবখান এলাকা থেকে অধিগ্রহণ করে। যা পর্যায়ক্রমিকভাবে ১৯৬৩ সালে ইপিআইডব্লিটিএ’র কাছে হস্তান্তর করা হয়। ৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। প্রথমে চ্যানেলের তত্ত্বাবধানকরত পানি ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (ওয়াপদা)। তখন চ্যানেলের প্রশস্ততা ছিল ২৫০ মিটার। তবে বর্তমানে তা হ্রাস পেয়ে ১০০ মিটার এবং কোন কোন স্থানে এরও কম। নৌযানের মাষ্টাররা জানান, এ চ্যানেলটি না থাকলে দেশের দু’টি সমুদ্র বন্দর মংলা ও চট্টগ্রাম সংযোগকারী নৌযানগুলোকে সুন্দরবন, বরগুনাসহ উপকুলীয় নৌ-রুটে হয়ে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথ বেশি ঘুরতে হতো। চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে গেলে সরকারি-বেসরকারি জাহাজ স্টিমার কার্গোসহ চলাচলকারী নৌযানগুলোর বাড়তি পথ ঘোরার কারণে তার পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে সেই সঙ্গে বেড়ে যাবে পণ্যসামগ্রীর দামও। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিদিন এই চ্যানেল দিয়ে নৌ-বাহিনীর জাহাজসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজ, স্টিমার, কার্গো, কোস্টার, ট্যাঙ্কার চলাচল করে। যার মধ্যে ভারতীয় পণ্যবাহী নৌযানও রয়েছে। আর এসব নৌযানের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে তিনশ’ কোটি টাকার পণ্য আমদানি রপ্তানি হয়। গাবখান চ্যানেলের প্রশস্ততা হ্রাস পাওয়ায় দু’টি জাহাজের মুখোমুখি সংঘর্ষেও ঘটনাও ঘটেছে একাধিক। আবার চ্যানেলের মাঝে মাঝে কিছু ডুবোচর সৃষ্টির ফলে চ্যানেলটি তার গতিপথ পরিবর্তন করে বহু ফসলি জমি ও বেড়িবাঁধ ধ্বংস করে ফেলেছে। গাবখান চ্যানেল এখন যে জন্য বন্ধ হাবার উপক্রম হয়েছে তা হলো ঝালকাঠির অংশের বিভিন্ন স্থানে চর জেগে নব্যতা হ্রাস পাওয়া এবং বিপজ্জনক বাঁকের সৃষ্টি হওয়া। পাশাপাশি পরিকল্পিত ড্রেজিং এবং সুষ্ঠু তদারকির অভাবে চ্যানেলটির এই নব্যতা হ্রাস, যার নেপথ্যে রয়েছে নদীর স্রোত কমে যাওয়া। নদীর পাড়ে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও ব্যাপকহারে সেতু নির্মাণের ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পাবে বলে নদী বিশেষজ্ঞদের অভিমত। চ্যানেলের এসব সমস্যার পাশাপাশি আরো একটি বড় সমস্যা হচ্ছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। চ্যানেলের সিগন্যাল অফিসে কর্মরত মাত্র দু’জন স্টাফকে দিনে ১২ ঘন্টা করে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারা টেলিফোন অপারেটর হয়েও পাহারা দেয়া, সিগন্যাল ফ্লাগ উঠানামাসহ যাবতীয় কাজ তাদেরকেই করতে হয়, পায় না কোন ছুটিও। অয়ারলেস চালানোর কর্মী নেই, অয়ারলেস অপারেটর, নৈশ প্রহরী ও সিগন্যাল ফ্লাগম্যান এবং আরো ১ জন টেলিফোন অপারেটর প্রয়োজন। প্রায় তিন দশক ধরে চ্যানেলে চর সৃষ্টি হলেও এসময়ের মধ্যে স্থায়ীত্বশীল কোন ড্রেজিং করা হয়নি। তবে জানা যায়, দু’-একবার ড্রেজিং করার পরে মাটি তীরে না ফেলে খালেই ফেলা হয় বলে কাজের কাজ হয় না। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিইটিএ’র বরিশাল অফিসের ঊর্ধ্বতন উপ-পরিচালক এম.এম আবদুল হাই জানান, চ্যানেলের সংস্কারের জন্য একটি বড় প্রকল্প পাস হয়েছে এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ড্রেজিং বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তবে কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি । [লেখক :ইত্তেফাকের কাউখালী সংবাদাদাতা]