নাজিরপুরের জলাভূমির ধাপ চাষ দেশের অনন্য কৃষি পদ্ধতি
মোঃ সিদ্দিকুর রহমান তুহিন
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৩
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বিলাঞ্চল দেউলবাড়ী-দোবরা, কলারদোয়ানিয়া ও মালিখালী ইউনিয়নের জলাভূমির বাসিন্দাদের ব্যতিক্রমী কৃষি উদ্ভাবন ভাসমান বীজতলা ও শাক-সব্জি চাষ। স্থানীয়দের কাছে যা ধাপ চাষ নামে পরিচিত। অর্ধশত বছরেরও কিছু আগে থেকে চলে আসা এ বিরল কৃষি পদ্ধতি আজ দেশে অনন্য। জলাভূমির এক সময়কার অনন্যোপায় বাসিন্দারা আপন মেধায় এ বিশেষ ধরনের কৃষি কৌশল অবলম্বন করে দারিদ্র্য জয়ের পাশাপাশি নিজেরা স্বাবলম্বী হয়েছেন। অপরদিকে দেশের এরূপ জলাবদ্ধ বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবন জীবিকার লড়াইয়ে টিকে থাকতে পথ দেখিয়েছেন। কৃষি বিশেষজ্ঞরাও বর্তমানে জলমগ্ন জলাভূমিতে এ ধরনের বিশেষ পদ্ধতির চাষাবাদের প্রশিক্ষণসহ কৃষকদের ব্যাপকভাবে উত্সাহিত করছেন। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের ক্রমাগত উচ্চতা বৃদ্ধিতে অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ অঞ্চলসহ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের কৃষি ভূমি জলমগ্নের যে আশঙ্কা করা হচ্ছে সেক্ষেত্রে এ পদ্ধতির চাষাবাদ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার এক অবলম্বনও হতে পারে।
নাজিরপুর উপজেলার মুগারঝোর, বেলুয়া, চিথলিয়া, উত্তর কলারদোয়ানিয়া, গাঁওখালী, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, গজালিয়া প্রভৃতি গ্রামের শত শত একর জলাভূমিতে বাণিজ্যিকভাবে ধাপের উপর শাক-সব্জির চারা উত্পাদন হয়। অর্থকরী ও লাভজনক হওয়ায় স্ব-উদ্ভাবিত এ বিশেষ পদ্ধতির চাষাবাদ এলাকার কৃষকের কাছেও অত্যন্ত প্রিয়। জানা যায়, নাজিরপুরের বিলাঞ্চলের কৃষকদের স্বরূপকাঠী উপজেলার চামী ও গগণ, বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, মরিচবুনিয়া, উমারেরপার, কদমবাড়ী এবং পশ্চিম মলুহারসহ বিভিন্ন গ্রামের জলাভূমিতে ব্যাপক হারে ধাপ চাষ হচ্ছে। এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার বর্নীর বিল, মুকসুদ পুরের চান্দার বিল, কোটালীপাড়ার বাইগ্যারবিলসহ দেশের জলমগ্ন জলাভূমির কৃষকেরা এ বিশেষ পদ্ধতির চাষাবাদে মনোযোগী হয়ে উঠেছে। জানা যায় ,গত দু’বছর আগে নাজিরপুর উপজেলার বিশিষ্ট কয়েকজন ধাপ চাষী ও উপজেলা কৃষি বিভাগের লোকজন চট্টগ্রামের কাপ্তাই হ্রদে সেখানকার কৃষকদের ভাসমান পদ্ধতির এ চাষাবাদ হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে এসেছেন। শীঘ্রই যশোরের ভবদহ বিলেও এখান থেকে একটি টিম কৃষকদের ভাসমান বীজতলা বা ধাপ পদ্ধতির চাষের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে যাবেন।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে বৈঠাকাটা বাজার সন্নিহিত মুগারঝোর গ্রামের জলাভূমিতে নয়নাভিরাম ব্যাতিক্রমী এ
চাষাবাদের ব্যাপক দেখা মেলে। বর্ষার শুরু অর্থাত্ আষাঢ় থেকে কার্তিক পর্যন্ত এ পাঁচ মাস কৃষকদের ভাসমান ধাপের উপর শাক-সব্জির চারা উত্পাদন ও তা বিক্রির সময়। আষাঢ়ে এসব গ্রামের নিচু জমি পানিতে প্লাবিত হওয়ার সাথে সাথে কৃষকরা নেমে পড়ে ধাপ চাষে। কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টেপাপানা, গুড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সাথে খড়কুটা এবং নারিকেলের ছোবড়াগুড়া মিলিয়ে স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় ভাসমান বীজতলা বা ধাপ। যা পচে তৈরি হয় জৈবসার। ১০০-১৮০ ফুট লম্বা ৫-৬ ফুট চওড়া এবং এক-দেড় ফুট পুরু বীজতলা পানিতে তৈরি হয়, যা থাকে ভাসমান। পুরুষরা ধাপ তৈরি, চারা স্থাপন, পরিচর্যা ও চারা বিক্রির কাজ করে। নারীরা ও ছোট ছেলে মেয়েরা বাড়িতে বসে চারা তৈরির প্রাথমিক স্তর অর্থাত্ বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানোর কাজ করে। শ্যাওলা, নারিকেলের ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে ছোট ছোট বল আকারের বস্তু তৈরি করে থাকে। স্থানীয় ভাষায় একে টেমা বা দৌল্লা বলে। এর মধ্যে বীজ রেখে অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়। যা পরে ভাসমান বীজতলা বা ধাপের উপর স্থাপন করে নির্দিষ্ট সময় পরিচর্যার পর চারায় পরিণত করা হয়।
এছাড়া ধাপের উপর সরাসরি কিছু কিছু সব্জির অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়। ধাপ চাষীরা লাউ, সিম, বেগুন, বরবটি, করল্লা, পেঁপে, টমেটো, শশা, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, মরিচ ইত্যাদি শাক-সব্জি ও মশলার চারা তৈরি করে ধাপের উপর। কেউ কেউ লাল শাক, ঢেঁড়স, হলুদ ইত্যাদিও ফলায়। দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি ক্রেতারা এসে ক্ষেত থেকে শাক-সব্জির চারা ক্রয় করে নৌপথে নিয়ে তা সব্জি আবাদকারীদের কাছে বিক্রি করে। মুগারঝোর গ্রামের ধাপ চাষী রুহুল আমীন (৩৫) জানান, অতিবৃষ্টিতে বিপর্যয় না ঘটলে (আষাঢ় থেকে কার্তিক) পাঁচ মাসে চারবার চারা উত্পাদন করে বিক্রি করা যায়। কৃষক আলাউদ্দিন গাউস (৬০) জানান, তার বার্ষিক আয়ের প্রধান উত্স ধাপ চাষ। তিনি বছরে এই চাষ দিয়ে দু’আড়াই লাখ টাকা লাভ করেন। তিনি আরো জানান, ১০০ ফুট দীর্ঘ একটি ধাপ তৈরি এবং সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির চারা উত্পাদনে পাঁচ মাসে খরচ হয় ৬/৭ হাজার টাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে ঐ চারা বিক্রি হয় ১৬/১৭ হাজার টাকা। চারা তোলা শেষে কান্দির সব্জি ক্ষেতেও ধাপ ব্যবহার হয়, যা জৈবসারের কাজ করে। এই গ্রামের নবতিপর কৃষক সেকেন্দার আলী । তার বয়স যখন ৪০ তখন থেকে এই ধাপ পদ্ধতি চালু হয়েছে এবং নিজে ঐ সময় থেকে এ চাষে নিয়োজিত হন। এই অঞ্চলে এরূপ বিরল ও ব্যতিক্রমী এ চাষ পদ্ধতির তিনি একজন পথিকৃত । এখন ছেলে, ছেলে বউ, নাতি বউ এরা এ চাষে ব্যাপৃত। এ প্রবীণ কৃষক বলেন, ঘরের বৌ-ঝিরা এখনকার মত আগে এ কাজ করত না। বর্তমানে মহিলারা এ কাজে পুরুষদের সহায়তা করায় চাষের খরচ কমেছে, লাভ বেড়েছে। এদিকে এ ধাপ চাষকে কেন্দ্র করে নাজিরপুর বিল অঞ্চলে গাঁওখালী, বৈটাকাটা ও মনোহরপুর বাজারে ধাপ তৈরির বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদের হাট বসছে এবং এ সকল জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও বিক্রি করেও শতশত লোকের জীবন জীবিকাও চলছে।
লেখক- ইত্তেফাকের নাজিরপুর সংবাদদাতা