জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে জিয়ানগর
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৫
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানা ভাবে উপদ্রুত উপকুলীয় উপজেলা জিয়ানগর। উপজেলার তিন দিকে কঁচা নদী ও বলেশ্বর নদ বেষ্টিত এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাছ ধরে ও দিন মজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে । নদী অববাহিকার বাসিন্দা এখানকার মানুষ প্রাকৃতিক দূর্যোগের শিকার হয় খুব সহজেই। ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন ‘সিডর’ এর আঘাতে প্রান হারায় ৬৫ জন মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচকতায় জলোচ্ছ্তাস, ঘূর্ণিঝড়,চর পড়া, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, নদী ভাঙ্গন, পানিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির হাহাকার যেন নিত্যদিনের সঙ্গী এখানকার মানুষের। প্রতিনিয়ত বাসিন্দাদের প্রতিকুল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে এই উপকুলীয় অঞ্চল জিয়ানগরের চিত্র।
উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন চর সাউদ খালীর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে লড়াই করেই বসবাস করতে হয় চরের বাসিন্দাদের। চার দিকে অথৈ পানি। নেই বিশেষ কোন খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা, কর্মসংস্থান ও বিনোদনের ব্যবস্থা। শুধু নৌকাই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তারপরও জীবনের সাথে যুদ্ধ করে দিনাতিপাত করছেন কঁচা ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চর সাউদখালীতে বসবাসরত প্রায় দুই হাজার বাসিন্দা। এ চরের বাসিন্দারা সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। চরের বাসিন্দা সূর্যবান বিবি (৬০) জানান, উপজেলার সবচেয়ে রিক্ত, নিঃস্ব ও ভূমিহীন অসহায় লোকদের বসবাস এখানে। এখানকার অধিকাংশ শিশুই চরম অপুষ্টির শিকার। নেই উন্নত শিক্ষার কোন সুযোগ সুবিধা। উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৮ সালের জরিপ অনুযায়ী এই চরটি ৫০০ একর ভূমি নিয়ে জেগে ওঠে। নদী ভাঙ্গনের ফলে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ একর জমি রয়েছে সাউদখালী চরে।
এই চরে সিডরে নিহত পলি ও আমেনার বাবা মজনু (৪৫) কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, “মোর এহন তিনডা মাইয়া আর এট্টা পোলা আছে। মুই আর মাইয়া পোলা হারাইতে চাই না। সিডরের মত বইন্নায় চরে যাতে আর কোন মানু মইরা না যায় হেইর লইগ্গা সরকার যেন আরও এট্টা সাইক্লোন শেল্টার আর বেড়ী বাঁধ দিয়া দেয়।” একই দাবী অন্য বাসিন্দারেরও ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ উপজেলায় এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়। নদী-ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিশেষ করে পাড়েরহাটের টগড়া, ইন্দুরকানী, কালাইয়া, চাড়াখালী, চন্ডিপুর, বালিপাড়া, খোলপটুয়া নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা। ইন্দুরকানী গ্রামের কঁচা ও বলেশ্বর নদের মোহনায় কাজী কান্দা ও কালাইয়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী চাড়াখালী নামের একটি গ্রাম ছিল। যা গত ৩০ বছরে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মন্মথ সিকদার (৪৮)। তিনি বলেন, “কালাইয়ার পাশেই চাড়াখালী গ্রামের আমাদের বাড়ী ছিল যা কঁচা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তাই ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো ভাসমান দিন কাটাচ্ছে।” জীবিকা নির্বাহ করছে অনাহারে-অর্ধাহারে। সামান্য জোয়ারেই প্লাবিত হয় উপজেলার নিম্নাঞ্চল। গ্রাম অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে। যার কারনে বিপাকে পড়তে হয় অধিকাংশ স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীকে। অপর দিকে জোয়ারের পানির সাথে লবন পানি মৌসুমি ফসলের ক্ষেতে ঢুকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রান্তিক চাষ। পূর্ব ইন্দুরকানী গ্রামের চাষী মজনু হাওলাদার (৪০) জানান, “বেড়ীবাঁধের অভাবে আমাদের মারাত্মক ক্ষতি হয়, জোয়ারের কারনে সময়মত ফসল কাটতে পারি না এবং রবি মৌসুমে সামান্য জোয়ার এলেই আমাদের ক্ষেতে পানি উঠে যায়, ফলে আমরা ঠিকমত চাষাবাদ করতে পারি না।” উপজেলা কৃষি অফিসার অমিতাভ মন্ডল জানান, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে জমিতে লবনাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাপমাত্রার অতিরিক্ত তারতম্য, সময়মত পানি না পাওয়া এবং অসময়ে পানি বৃদ্ধির ফলে চাষাবাদ ব্যহত হচ্ছে। ফলে চাষীরা নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।”
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১১ টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এ ব্যা জিয়ানগর উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল কবির মজনু জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপক্থলবর্তী এই এলাকার মানুষ প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্তাসের শিকার হয়। উপজেলায় সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে।