মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ মাস পিরোজপুরের মাটিতে হুমায়ূন আহমেদ

সদ্য প্রয়াত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধকালে প্রায় পাঁচ মাস পিরোজপুর শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামে কাটিয়েছেন। তাঁর বয়স যখন ২৩ বছর তখন ৭১’র ৫ মে পিরোজপুরের এসডিপিও বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ পাক সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। হুমায়ূন আহমেদের নানা সৃষ্টিতে পিতার কর্মস্থল, পেশা, সাহিত্য চর্চা, মুক্তিযুদ্ধে আত্মদান ইত্যাদির প্রভাব ছিল । পুলিশের চাকুরীর সাথে “সাহিত্য সূধাকর”ছদ্মনামে তাঁর বাবার সাহিত্য চর্চ্চা ও মুক্তিযুদ্ধে বাবার আত্মদান নানা রচনায় প্রতিফলিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ লেখেন পিরোজপুরে বসে ৭১’র অসহযোগ আন্দোলনের সময়। তৃতীয় উপন্যাস ‘শ্যামল ছায়া’ রচনার প্রেক্ষাপট ছিল মুক্তিযুদ্ধ। তখন পিরোজপুরে মা ও ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে মুক্তাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহনের ঘটনার মিল উপন্যাসে খুঁজে পাওয়া যায়। আবার ‘জননী ও জোছনার গল্প’এ মুক্তিযুদ্ধে পিরোজপুরের ঘটনা, তাঁর বাবার অবদান ও আত্মদানসহ যে কথা গুলো উঠে এসেছে তা মুক্তিযুদ্ধকালে হুমায়ূনের পিরোজপুরের অবস্থান এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। স্বাধীনতা পর পিরোজপুরকে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আপন করে নিয়েছিলেন। এখানে তাঁর শহীদ পিতার কবর রয়েছে, রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে পিতার আত্মোত্স্বর্গের স্মৃতি তেমনি তাঁর এক বোনেরও বিয়ে হয়েছে পিরোজপুরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা এডভোকেট আলী হায়দার খানের সাথে। হুমায়ূন স্বাধীনতার পর সপরিবারে পিরোজপুরে ছুটে এসেছেন বার বার। তাঁর প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন ৮০ দশকের শুরুতে পিরোজপুর মহিলা কলেজে ভর্তিও হয়েছিলেন এ কলেজে প্রভাষক পদে হুমায়ূন আহমেদের বোন সুফিয়া হায়দারের চাকুরী করার সুবাদে। তাঁর সন্তানদের নিয়ে পিরোজপুরে এসেছেন পিতার কবরের পাশে। কবরের ফলকে লেখা ‘নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে-রয়েছ নয়নে নয়নে।’ শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ-সাহিত্য সুধাকর, মহকুমা পুলিশ প্রধান, জন্ম ২১ ফেব্রুুুুুুয়ারী ১৯২১-ময়মনসিংহ, মৃত্যু ৫ মে ১৯৭১, পিরোজপুর। হুমায়ূন আহমদের ইচ্ছা ছিল বাবার কবর থেকে কিছু মাটি নিয়ে নূহাশপল্লীতে প্রতিস্থাপন করা। কিন্তু সে আশা মেটার আগেই নিজেই চলে গেলেন চিরতরে। তবে একজন হুমায়ূন ভক্তের পাঠানো এ মাটি পরে তার মা-ভাই-বোনেরা নূহাশ পল্লীর কবরে ছড়িয়ে দেন। তাঁর পিতার নামে পিরোজপুর হাসপাতাল সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ সড়ক’। ৭১’র ২৫ মার্চের আগে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্র হুমায়ূন , বোন সুফিয়া ও ভাই পদার্থ জাফর ইকবালকে নিয়ে পিরোজপুরে চলে আসেন মা-বাবা ও অন্য তিন ভাই-বোনের কাছে। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাক সেনাদের সশস্ত্র আক্রমণের খবর তিনি পেয়ে ছিলেন তাঁর বাবার সাথে পিরোজপুর থানায় গিয়ে পুলিশ অয়ারলেসের মাধ্যমে ঐ রাতেই। এরপর ২৬ মার্চ থেকে পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্বাদের অস্ত্রাগার দখল, শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন, সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি ইত্যাদি পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক তত্পরতা দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। ভাই জাফর ইকবালসহ তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণও নেন। পিরোজপুর মহকুমা ট্রেজারীর অর্থ ও অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে যাওয়ার সাথে হুমায়ূনের বাবা তত্কালীন এসডিপিও ফয়জুর রহমানের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়ে ছিল পাক বাহিনী। ৭১’র ২ মে ট্রেজারীর টাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে গেলে ৪ মে পিরোজপুর শহর পাক বাহিনী দখলে নেয়। এর আগেই হুমায়ূন মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে প্রথমে নাজিরপুর থানায় ও পরে নাজিরপুরের বাবলা গ্রামে জনৈক মোবারক খানের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। এই বাড়ীতে মে’র ৩ তারিখে তার বাবা পরিবারের সাথে মিলিত হন এবং জীবনের শেষ বারের মত ৫ তারিখে হুমায়ূনসহ ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন ফয়জুর রহমান। পাকবাহিনীর হাতে এ দিন পিতা শহীদ হলে পিতার মৃত্যুর তিন দিন পর পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তিনি স্বরূপকাঠির গুয়ারেখা মৌলভী বাড়িতে আশ্রয় নেন। এ বাড়ীতে প্রায় আড়াই মাস থাকার পর ময়মনসিং থেকে আসা তাঁর নানা শেখ আবুল হোসেনের সাথে সপরিবারে ঢাকায় চলে যান। গুয়ারেখায় পরিবার নিয়ে আত্মগোপনের জীবনে সাথে আনা ট্রাংক ভর্তি বইও ছিল প্রচুর। ইকবাল, তাদের ছোট ভাই শাহীন, ওই বাড়িতে আশ্রয় নেয়া পিরোজপুরের কোর্ট ইন্সপেক্টর মোঃ আলাউদ্দিনের ছেলেরাসহ এ বাড়ির সমবয়সী ছেলেরা দলবেঁধে খেলাধুলা, মাছধরা, নৌকা চালানো, গাছে চড়া ইত্যাদি নানা আমোদ-ফূর্তিতে ব্যস্ত থাকলেও হুমায়ূনকে তাদের এই হৈ-হুল্লোড়ে পাওয়া যেত না। বইয়ের পাতায় মাথা গুজে সারাদিন পড়ে থাকতেন তিনি। মাঝে মাঝে রেডিওতে গান শুনতেন এবং সুযোগ পেলে গোপনে আকাশবানী কলিকাতা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দে র অনুষ্ঠান শুনতেন। তিনি একবার শর্ষিনা মাদ্রাসায় ভর্তির জন্যও গিয়ে ছিলেন। যুদ্ধের মধ্যে হুমায়ূনরা সপরিবারে ঢাকায় চলে যাওয়ার পর মুক্তদেশে ঐ গ্রামে তাঁর আর যাওয়া হয়নি, তবে মা আয়শা ফয়েজ ও ভাই জাফর ইকবাল গিয়েছেন। লেখক ইত্তেফাকের ষ্টাফ রিপোর্টার ও পিরোজপুর অফিস প্রধান