প্রজন্মের ফুটবল গ্রাম উদয়কাঠি

রত্নগর্ভা হাওয়া বেগমের পাঁচ ছেলে লিটন, শাকিল, এমিলি, এমেকা আর সাব্বির। দক্ষিণের ফুটবলের কিংবদন্তি জলু সরদারের মেয়ে এ হাওয়া বেগমের গর্ভজাত সন্তান জাতীয় ফুটবল তারকা জাহিদ হাসান এমিলি আর শাকিল আহমেদ দু’ভাই আজ দেশের বাইরেও যাদের সুনাম। সাথে তিন ছেলে লিটন, এমেকা আর সাব্বিরও দাপিয়ে বেড়ায় ঢাকার মাঠ। গ্রামের উদয়কাঠি স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে কোন এক শুভক্ষণে, হয়তো পাড়ার কোন এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যাদের ফুটবল জীবনের সূচনা। এর আগে ভাই-বন্ধুদের সাথে খেলার ছলে ফুটবলে হাতেখড়ি। এমিলি-শাকিলদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী ইউনিয়নের উদয়কাঠিতে। দক্ষিণাঞ্চলের এ গ্রামের নামের সাথে ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। প্রায় শতবর্ষের ফুটবলের ঐতিহ্য এ গ্রামটির। এমিলির নানাদের হাতে এ ঐতিহ্যের সূচনা। আর এমিলি-শাকিলরা এ ঐতিহ্যমণ্ডিত গর্বকে ছড়িয়ে দিয়েছে সারা দেশে। নানা জলু সরদার, নূরু সরদার, লতিফ সরদার, সৈয়দ আলী গত শতকের মধ্যভাগে পিরোজপুরসহ সন্নিহিত এলাকার খ্যাতিমান ফুটবলার। তাদের আপন নানা আব্দুল জলিল সরদার, জলু সরদার নামে যার সমধিক পরিচিতি, তিনি তিন বছর আগেও যখন বেঁচে ছিলেন তখনও প্রজন্মের সাথে সদলবলে মাঠে যেতেন। তবে খেলতে নয়, উত্সাহ যোগাতে। নব্বই দশকেও পিরোজপুর স্টেডিয়াম ও সরকারি স্কুল মাঠে জলু সরদার যখন খেলতে নামতেন তখন সমর্থক-দর্শকদের মাঝে উত্সাহ-আনন্দের জোয়ার বইতো সত্তুরোর্ধ এ ক্রীড়াবিদের অদম্য-তেজদীপ্ত ক্রীড়াশৈলী দেখে। এমিলির বাবা ইদ্রিস আলী সেদিনও দক্ষিণাঞ্চলের মাঠ কাঁপিয়েছেন দুর্দান্ত দাপটে। ঢাকায়ও খেলেছেন বাটা কোম্পানির হয়ে। তাই শাকিল-এমিলিদের রক্তেও প্রবাহিত ফুটবল। বড় ভাই লিটন বর্তমানে ঢাকা ব্রাদার্সের অধিনায়ক, ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে খেলছেন। অনুজ এমেকাও খেলছেন ঢাকা মোহামেডানে। সর্বানুজ সাব্বির ব্রাদার্সে খেলছেন, দেশের বাইরে খেলেছেন নেপাল ও ইরানে অনূর্ধ্ব ১৬ দলের হয়ে। মামাদের মধ্যে আব্দুল হাই সরদার ষাট ও সত্তুর দশকের নামকরা ফুটবলার। মামা আব্দুর রশীদ সরদার ও চাঁন সরদার, চাচাতো ভাই দেলোয়ার সরদার, মামাতো ভাই জামাল-কামাল, সুজন, সবুজ বিভিন্ন প্রজন্মের ফুটবল খেলোয়াড়। এর মধ্যে জামাল-কামাল ঢাকা মাঠের খেলোয়াড়। ফকিরাপুল, ফরাসগঞ্জ, বিআরটিসিসহ বিভিন্ন দলে খেলেছেন। লিটনের হাত ধরে সহোদর আর মামাতো ভাইদের ঢাকার মাঠে অভিষেক। উদয়কাঠি স্পোর্টিং ক্লাব কয়েক দশক ধরে দক্ষিণাঞ্চলের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বহুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। পিরোজপুর জেলা দল শাকিল-এমিলি ও ভাইদের ছাড়া কল্পনা করা যায় না। শাকিল-এমিলিরা এ গর্বিত উদয়কাঠি গ্রামের ফুটবল খ্যাত সরদার বংশের উত্তরাধিকার। ফুটবলে বংশীয় ধারাকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে নিজেদের জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত করতে পেরে খুবই তৃপ্ত তারা। বাবাকে মনে করেন তাদের এই প্রতিষ্ঠার আদর্শিক অনুপ্রেরণা রূপে। মায়ের উত্সাহকে সর্বাগ্রে সম্মান দেন, মা হাওয়া বেগম সাহস যোগান সন্তানদের। এক সময় জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন তার বড় ছেলে লিটন। লিটন ব্রাদার্স, বিআরটিসি ও শান্তিনগরে খেলেছেন। শাকিল খেলেছেন ব্রাদার্স, ফকিরাপুল, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, শেখ জামালে। এমিলি-শাকিল এবার মোহামেডানে খেলবে। ফুফাতো ভাই পুলিশ কর্মকর্তা নাসির আহমেদের প্রচেষ্টায় এমিলি ৯৯’সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হন। তার প্রথম খেলা অনূর্ধ্ব ২০ ফুটবলে। এরপর চলন্তিকা, শান্তিনগর, বিআরটিসি, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স, ফকিরাপুল, ব্রাদার্স, আবাহনী লিমিটেডে। সর্বশেষে গত বছর শেখ রাসেলে। খেলেছেন নরওয়ে, পাকিস্তান, ভারত, উজবেকস্থান, তুর্কেমিনস্থান, বাহরাইন, কাতার ইত্যাদি দেশে জাতীয় দলের হয়ে। লিটন, শাকিল, এমিলি, এমেকা আর সাব্বিরদের শেকড় পিরোজপুরের এই ফুটবল গ্রাম উদয়কাঠি আজ ধন্য, প্রজন্মের অহংকার তাদের পূর্বসূরি জলু সর্দারদের স্মৃতিতে। সাথে সার্থক মা হাওয়ার গর্ব, আজ তিনি রত্নগর্ভা জননী।