সিডর বিধ্বস্ত মঠবাড়িয়ার মাঝেরচর আধুনিক গ্রামে রূপ নিয়েছে
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৮
সিডর বিধ্বস্ত উপকূলীয় একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ মাঝেরচর। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানিসহ এ দ্বীপ গ্রামের ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। প্রায় এক হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদীর এ দ্বীপ মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমোর রাজপাড়া ইউনিয়নের মাঝেরচর সিডর পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পর এখন যেন এক আধুনিক গ্রামে রূপ নিয়েছে। দ্বীপবাসীর জন্য ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ পায়খানা, রেইন ওয়াটার হারভেস্টারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি , অধিবাসীদের জীবিকা নির্বাহে নানা উপকরণ সহায়তা, পাকা রাস্তাঘাট এ গ্রামটির চেহারা বদলে দিয়েছে। সিডরের আগে এ দ্বীপে পাকা ঘর বলতে ছিল রেডক্রিসেন্টের একটি সাইক্লোন শেল্টার আর এলজিইডি’র নির্মিত একতলা ভবনের বেসরকারি রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাইক্লোন শেল্টারটির সুবাদে সিডরের করালগ্রাস থেকে অধিকাংশ বাসিন্দা প্রাণে রক্ষা পেলেও এখানে ঘর-বাড়ি, গবাদিপশু, বৃক্ষ সম্পদ, বিনষ্ট হয়েছে ব্যাপক। বাসিন্দারা প্রাণে বাঁচার পর জীবনধারণে যখন দুর্যোগ পরবর্তী লড়াইয়ে দিশাহারা তখন এ দ্বীপবাসীর সাহায্যে এগিয়ে আসে দেশি-বিদেশি নানা সংস্থা। বৃটিশ বিজনেস গ্রুপ, এনজিও সংস্থা ফ্রেন্ডশীপ, সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন মাঝেরচরের বিপর্যস্ত মানুষের পুনর্বাসনে হাত বাড়ায়। এছাড়া ত্রাণ সহায়তাও প্রদান করে ব্যক্তি ও সংগঠন। সাতক্ষীরা পৌরসভা চরবাসীর ঘর পুনর্নির্মাণের জন্য ঢেউটিন বিতরণ করে সিডরের পরপর। ফ্রেন্ডশীপ নামের দেশের একটি খ্যাতনামা এনজিও মাঝেরচর বাসীর জীবন-জীবিকা পুনর্বাসনে এগিয়ে আসে ব্যাপক পরিসরে। এ সংগঠনটি আন্তর্জাতিকমহলকে দ্বীপের মানুষের সাহায্যে হাত বাড়াতে যে উদ্যোগ নেয় তা সিডর উপদ্রুত উপকূলে বিশেষ ও ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। বৃটিশ বিজনেস গ্রুপ মাঝেরচরের দুর্গত মানুষকে উঠে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন। তত্কালীন বৃটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী নিজে দু’বার আসেন এ চরে। সাথে আসেন দাতাগোষ্ঠী বৃটিশ বিজনেস গ্রুপের সদস্যরাও। বৃটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স রিচার্ড ডিউক অব গ্লচেষ্টার নিজেও আসেন একবার। একবার এখানে ঘুরে গেছেন সাবেক বৃটিশ হাইকমিশনার ষ্টিফেন ইভান্স। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে বৃটিশদের সহায়তায় মাঝেরচরে দ্বীপবাসীর পুনর্বাসনে বৃটিশ বিজনেস গ্রুপের সহায়তায় ১২৪ পরিবারকে ফ্রেন্ডশীপ সংস্থার তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল ১৬৪টি কংক্রিটের ঘরের। যার ১২৫টি ঘর ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে। ভূমির মালিকানা জটিলতার কারণে বাকি ঘরগুলোর নির্মাণ কাজ ব্যাহত হয়েছে। ফ্রেন্ডশীপের রিসার্চ অফিসার আবু মোহাম্মদ শিহাব ইত্তেফাককে জানান, সিডরের পর থেকে ত্রাণ সাহায্য, জীবিকা পুনর্বাসন, চিকিত্সা সেবা, কৃষি পুনর্বাসন এবং বাসস্থান নির্মাণে তাদের সংস্থার মাধ্যমে বৃটিশ বিজনেস গ্রুপ ব্যাপক কার্যক্রম মাঝেরচর বাসীর জন্য গ্রহণ করে। এ পর্যন্ত নির্মিত কংক্রিটের ১২৫টি ঘরের অধিকাংশই ছোট পরিবারের জন্য এক কক্ষ বিশিষ্ট এবং বড় পরিবারের জন্য দুই কক্ষ বিশিষ্ট ১ টি ঘর রয়েছে। ঘরগুলো সৌরবিদ্যুত্ সুবিধার জন্য সোলার প্যানেল সজ্জিত।
খাবার পানি সংরক্ষণের জন্য প্রতি ঘরে রয়েছে একটি পানির ট্যাংক। ফ্রেন্ডশীপ নিজস্ব অর্থায়নে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মাণ করেছে পরিবার প্রতি। পাশাপাশি ৩টি পাওয়ার ট্রিলার, ৩টি শ্যালোইঞ্জিন, ৩টি যন্ত্রচালিত নৌকা, ৮টি জেলে নৌকা ও জাল এবং ১৩৪টি গাভী দেয়া হয়েছে জীবিকা পুনর্বাসনের জন্য। এছাড়া দুইটি পরিবারকে মেডিসিন শপ ও গ্রোসারী শপ (মুদি দোকান) করে দেয়া হয়েছে। কৃষি উত্পাদনের জন্য জ্বালানি, সার, বীজ এবং মাছ চাষের জন্য পোনা সরবরাহ ও পুকুর পরিষ্কার করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে গাছের চারাও। প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ, ১.১ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ, তিনটি পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার), মসজিদ, বাঁধানো ঘাটও তৈরি করে দিয়েছেন বৃটিশ দাতা সংস্থাটি। তৈরি করা হয়েছে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ । পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক অনল চন্দ দাস বলেন,মাঝেরচরের বিপন্ন মানুষের জন্য বৃটিশদের এই অবদান দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সত্যি কথা বলতে, মাঝেরচর যেন একটি আধুনিক গ্রাম, বলেশ্বর নদের মাঝের দ্বীপটি হতে পারে একটি পর্যটন স্পট। পাশাপাশি বেড়িবাঁধ দিয়ে দ্বীপবাসীর সুরক্ষা জরুরি হয়ে পড়েছে।