স্বরূপকাঠির কুটির শিল্প ঐতিহ্যময় সম্ভাবনা

স্বরূপকাঠি অর্থাত্ নেছারাবাদ উপজেলা পিরোজপুর জেলার প্রধানতম শিল্পসমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ- পরোক্ষ জড়িত হাজার হাজার মানুষ যুগ যুগ ধরে জীবন ধারণ করে আসছে। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা,সংস্কৃতি, ধর্ম চিন্তাাসহ সর্বত্রই এ শিল্পের প্রভাব লক্ষণীয়। ছোবড়া শিল্পঃ স্বরূপকাঠির শিল্পের মধ্যে অন্যতম ছোবড়া । বৃটিশ আমলের শেষ দিকে উপজেলার বালিহারী গ্রামের আসমত আলী শ্রীলংকায় নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে পাপোশ তৈরির কাজ সরেজমিনে দেখে এসে নিজ গ্রামে পাপোশ তৈরির কাজ শুরু করেন। নারিকেলের ছোবড়া কাঠের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে আঁশ তৈরি করা হতো। আর আঁঁশ দিয়ে রশি এবং রশি ও আঁশ মিলিয়ে তৈরি করা হয় পাপোশ। দিন দিন পাপোশের চাহিদা বাড়ায় পরে ঐ গ্রামের কিছু ব্যবসায়ী পাপোশ তৈরির কাজে জড়িয়ে পড়েন। এখানের তৈরি পাপোশ পশ্চিম পাকিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেয়া হত। এর আগে পাকিস্তানে শ্রীলংকা থেকে পাপোশ আসতো। পাপোশের সাথে নারিকেলের ছোবড়ার রশিও (কাতরা) তৈরি হতো। পাপোশ ও রশির চাহিদা বাড়ার কারণে এ অঞ্চলে ছোবড়া শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ফলে স্থানীয় শিল্প উদোক্তারা ও সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৬১ সালে উপজেলার কৌড়িখাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় বিসিক শিল্পনগরী । এ শিল্প নগরীতে নারকেল ও সরিষার তেল, রাইস মিল, স-মিল, আয়ুর্বেদিক ওষুধ, ছোবড়া, বেকারী, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কাঠ শিল্পঃ শতবর্ষের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বরূপকাঠির কাঠ শিল্প। প্রথমে আসামের বনাঞ্চল, মধ্যে সুন্দরবন এবং বর্তমানে স্থানীয় বাগানের গাছের উপর নির্ভর করে এই কাঠ শিল্পের আরম্ভ, বিকাশ ও বর্তমান উত্পাদনশীলতা। এই তিন উত্স থেকে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে আগত বিভিন্ন গাছ প্রক্রিয়াজাত করার সাথে এলাকার হাজার হাজার মানুষ সম্পৃক্ত। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে শতাধিক স-মিল, করাত-নির্ভর ডাউই সমপ্রদায়, নৌকা নির্মাণ শিল্প ইত্যাদি। স্বরূপকাঠি ও ইন্দুরহাটে তৈরি হয়েছে ভাসমান ও স্থায়ী কাঠের বাজার। বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বহু কাঠের আড়ত্। যেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ চালান দেয়া হয়। নার্সারী শিল্পঃ স্বরূপকাঠি উপজেলায় উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আকলম গ্রামের মো. হাছেন আলী ও মো. আব্দুল হাকিম নিজ বাড়িতে মাটির টালিতে বিভিন্ন উদ্ভিদের বীজ বপনের মাধ্যমে চারা উত্পাদন করে সর্ব প্রথম নার্সারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন। তাকে অনুসরণ করে ঐ গ্রামের অনেক কৃষিজীবি মানুষ শুরু করেন নার্সারী শিল্প। পরবর্তীতে এ শিল্প আকলম গ্রামে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে এবং পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলার ৪৮৪.৬ হেক্টর জমিতে নার্সারী শিল্প গড়ে উঠেছে। আকলম, শর্ষিনা, সোহাগদল, ধলাহার, মাহমুদকাঠি, আরামকাঠিসহ ৪১ টি গ্রামে ১৯৪২টি নার্সারী রয়েছে। এ শিল্পের সাথে উপজেলার প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত থেকে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে। এ সকল নার্সারীতে আম, কাঠাল, জাম, লিচুসহ বিভিন্ন জাতের ফল, আমলকি, হরতকি, বয়রাসহ বিভিন্ন জাতের ভেষজ উদ্ভিদ, শিরিষ, মেহগিনি, শিশু, পাহাড়ী নিমসহ বিভিন্ন জাতের বনজ উদ্ভিদ, গোলাপ, বেলী, সূর্যমুখী ফুলসহ বিভিন্ন জাতের ফুল, কেকটাস, ক্রিষ্টমাস, থুজাসহ বাহারী উদ্ভিদের চারা কলম উত্পাদিত হয়। এ নার্সারী দিন দিন শিল্পে বিকাশ লাভ করায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এখানকার নার্সারীতে উত্পাদিত বিভিন্ন জাতের বনজ, ফলদ, ভেষজ ও ফুল জাতীয় চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন চালান হচ্ছে। কামার শিল্পঃ প্রায় ২’শ বছর পুর্বে স্বরূপকাঠির সন্ধ্যা নদীর অববাহিকার পূর্ব পাড়ের গড়ে ওঠা দ্বীপ চরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মুসলিম ও হিন্দু সমপ্রদায়ের বসতিতে প্রায় ১৫০ বছর পূর্বে মাধব কর্মকারের চার পূর্ব পুরুষের লোকজন সর্বপ্রথম লোহা, দা, বটি তৈরির কাজ শুরু করেন। এ ভাবে স্বরূপকাঠি ও ইন্দুরহাটে গড়ে উঠেছে কামার শিল্প। বংশানুক্রমে এখানকার দু’শতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী কামার শিল্পের এ পেশায় জড়িত থেকে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। বিগত দিনে সুন্দরবন থেকে কাঠ পরিবহনের জন্য কাঠামী নৌকা তৈরির গজা লোহা, পাতাম লোহা, কুঠার ও ঘরের কাজে খেরি লোহা, কামার তালা, খোন্তা কোদাল, দা, বটি, কাছি, ছুরি ইত্যাদি ব্যাপকহারে ব্যবহার হত, কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐ দা, বটি, ছুরি ছাড়া অন্য সরঞ্জামাদির ব্যবহার দিন দিন কমে যাওয়ায় কামার শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে। ডকইয়ার্ড ঃ নদীমাতৃক এ অঞ্চলে বিগত দিনে নৌ পথে চলাচল ও পণ্য পরিবহনে কাঠের নৌকার প্রচলন থাকলেও পরিবর্তনের ছোঁয়ায় ইঞ্জিন চালিত স্টিল বোডি লঞ্চ, ট্রলার, কার্গো ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সব নৌযান নির্মান করতে স্বরূপকাঠি, কালিবাড়ি, বরছাকাঠি, বালিহারী, ডুবিরহাট প্রভৃতি স্থানে খালের তীরে ছোট বড় ২০ টি গড়ে ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে । নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বেসরকারি উদ্যোগে এ শিল্পের অগ্রযাত্রা এগিয়ে চলছে। বেসরকারিভাবে গড়ে উঠা এ ডকইয়ার্ড শিল্পে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছেন প্রায় দু’ হাজার শ্রমিক কর্মচারী। ডকইয়ার্ডগুলোকে কেন্দ্র্র করে ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, হার্ডওয়ার ও রংয়ের দোকান গড়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এলে এ শিল্পই হতে পারে কোটি কোটি টাকা আয়ের অন্যতম উত্স এবং কর্মসংস্থান হতে পারে হাজার হাজার মানুষের। স্বরূপকাঠি উপজেলায় সম্ভাবনাময় ডকইয়ার্ড শিল্পের দিন দিন প্রসার ঘটায় খুলে যেতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার। ক্রিকেট ব্যাট শিল্পঃ স্বরূপকাঠির অগ্রসরমান একটি শিল্পের নাম ক্রিকেট ব্যাট শিল্প। ১৯৮৮ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিন্না গ্রামের মো. আব্দুল লতিফ সর্বপ্রথম তার বাড়িতে এ ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা গড়ে তুলে এ শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। ক্রিকেট খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠায় ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ফলে উপজেলার গগন, উড়িবুনিয়া, জিলবাড়ি, বিন্না, চামীসহ বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠে প্রায় দেড় শতাধিক ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা। এখানকার তৈরিকৃত ক্রিকেট ব্যাট ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালান হয়। এ শিল্পের সাথে প্রায় ৫ হাজার লোক জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। ২০০৬ সালে পি কে এস এফ এর উদ্যোগে সিটি ব্যাংকের সহায়তায় এ ক্ষুদ্র শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বিন্না গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা নিলুফার ইয়াসমিনকে ৪ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার প্রদান করা হয় এবং ২০০৭ সালে কানাডার হলিফ্যাক্সে ক্ষুদ্র ঋণ ও ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা বিষয়ক এক সম্মেলনেও নিলুফার ইয়াসমিন প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ওই সম্মেলনে নোবেল বিজয়ী ড. মোহাম্মদ ইউনুসও যোগদান করে ছিলেন। ক্রিকেট ব্যাট শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, এ শিল্প লাভজনক হলেও প্রয়োজনীয় কাঠের অভাব, বিদ্যুত্ সমস্যার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন না। পোল্ট্রি শিল্পঃ দেশে পোল্ট্রি শিল্পের সূচনা লগ্নের কিছুদিন পর থেকে স্বরূপকাঠির অন্য শিল্পের পাশাপাশি পোল্ট্রি শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯৪ সনে উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের মাহমুদকাঠি গ্রামের মো. কবির হোসেন সর্বপ্রথম পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে এ শিল্পের সূচনা করেন। প্রায় ৩ শতাধিক পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে এ উপজেলায়। ২০০৭ সনের ১৫ নভেম্বর সাইক্লোন সিডর এ শিল্পকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন অনেক ফার্ম মালিক চরম আর্থিকভাবে মার খেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও উদ্যোক্তারা এ শিল্পকে আজও টিকিয়ে রেখেছে। এ শিল্পের সাথে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ জড়িত থেকে সংসার জীবন যাপন করছে। বিগত দিনে এ শিল্পের প্রসার ঘটলেও মুরগীর বাচ্চা ও খাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এ শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুন শিল্প উদ্যোক্তারা। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে রোগবালাই প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণসহ নিয়মিত বিদ্যুত্ সরবরাহ ব্যবস্থা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদানের দাবি ফার্ম মালিকদের। লেখকঃ ইত্তেফাকের স্বরূপকাঠি সংবাদদাতা