গ্রীম ব্রাদার্স রূপকথার দুই রূপকুমার
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৩, ১৮:২৬
জার্মানিতে একটি সড়কের নাম রাখা হয়েছে মারচেন স্ট্রেজ অর্থাত্ রূপকথার সড়ক। এতদিন আমরা রূপকথার রাজ্যের কথা শুনে আসছিলাম। কিন্তু এই প্রথম শুনলাম জার্মানিতে হ্যানাউ শহর থেকে ব্রেমন পর্যন্ত যে সড়কটি সবুজ বন আর ডানে-বাঁয়ে ছোট ছোট গ্রাম রেখে ২৭০ কিলোওয়াট পর্যন্ত চলে গেছে, তার নামই রূপকথার সড়ক। ছুটির দিনে এই শহরে ছেলেবুড়ো সকলেই রূপকথার সড়কে হেঁটে বেড়ায়। এই রূপকথার হ্যানাউ শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রূপকথার দুই রূপকুমার জ্যাকব গ্রীম ও হীল হেলম গ্রীম। আজীবন রূপকথার সংগ্রহ ও রূপকথা লেখার জন্য তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে উক্ত সড়কের নাম দেয়া হয়েছে রূপকথার সড়ক। বিশ্ব শিশুসাহিত্যে জ্যাকব গ্রীম ও হীল হেলম গ্রীম, গ্রীম ব্রাদার্স বা গ্রীম ভায়েরা নামেও সুপরিচিত।
জ্যাকব গ্রীম ১৭৮৫ সালে এবং হীল হেলম গ্রীম ১৭৮৬ সালে জার্মানিতে হেসে রাজ্যের হ্যানাউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তারা দুই ভাই স্টাইন এ্যান্ডার কিনশ্চিনে শৈশব কাটান এবং মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে জ্যাকব গ্রীম হেস্টফালিয়ার রাজার লাইব্রেরিয়ান ও ছোটভাই হীল হেলম গ্রীম ঐ শহরে অন্য একটি লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক পদে কর্মজীবন শুরু করেন। তাদের দু’ভাইয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল এক সঙ্গে গল্প লেখা, এক সঙ্গে ভ্রমণ করা, এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, এমনকি এক সঙ্গে ঘুমানো। অল্প বয়স থেকেই তারা লোকের মুখে গল্প শুনতেন এবং পরবর্তীকালে এসব গল্প সংগ্রহ করে ও লিখে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। একটি রূপকথার বিভিন্ন প্রকারভেদ খুঁজে বের করার জন্য জার্মানির সমস্ত এলাকা দুই ভাই ঘুরে বেড়িয়েছেন।
আদিযুগের মানুষেরা বিশ্বাস করতো কোনো মানুষের আসল নাম ফাঁস হয়ে গেলে তার আত্মা ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিশ্বাসের ওপর একটি চমত্কার রূপকথা সংগ্রহ করে লিখে গেছেন গ্রীম ভাইয়েরা। গল্পটি এ রকম- গরীব এক জাতঅলা রাজাকে এসে বলল, আমার মেয়ে খড় থেকে সোনা বুনতে পারে। লোভী রাজা তক্ষুণি সোনালী চুলের মেয়েটিকে তার জেলখানায় বন্দী করে এক বস্তা খড় আর একটি চরকা দিয়ে বললেন, বাঁচতে যদি চাও, খড় বিছিয়ে সোনা বানাও। রাত্তিরে মেয়েটি সন্ত্রস্ত হয়ে যখন কাঁপছে অদ্ভুত একটা লোক এসে হাজির হয়ে বলল- কেঁদে-কেটে কি লাভ? আমি যদি কাজ করে দেই আমায় কী দেবে? মেয়েটি তাকে গলার হার দিতেই লোকটা কাজে বসে গেল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখে সারা ঘর সোনায় সোনা। কিন্তু লোভী রাজা সেদিনও তাকে বললেন, বাঁচতে যদি চাও খড় বিছিয়ে সোনা বানাও। সেই রাত্রে অদ্ভুত লোকটি এসে মেয়েটির আংটির বদলে আবার সেই অসাধ্য সাধন করল। রাজাও মেয়েটির কাছে একই বিস্ময়ের পুনরাবৃত্তি দাবি করলেন। এবার সেই বিতিকিচ্ছিরি লোকটা বলে বসল, রাণী হলে তোমার প্রথম সন্তানকে আমায় যদি দাও, তাহলে তোমার কাজটা করে দিতে পারি। মেয়েটি ভেবেচিন্তে দেখল, সে কি করে রাণী হবে। অতএব, শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। রাজা ধন-দৌলতের কাঙাল, তাকেও বিয়ে করলেন। একদিন সেই হতচ্ছাড়া এসে উপস্থিত, বলে- যদি তিন দিনের মধ্যে আমার আসল নামটা বলে দিতে পার, তাহলে তোমার সন্তান তোমারই থাকবে। রাজ্যের চতুর্দিকে রাণী লোক পাঠিয়ে দিলেন, যত উদ্ভট নাম শুনবে তার তালিকা আনতে। প্রথম দু’রাতে রাণী ঐ লোকটার ঠিক নাম বলতে পারলেন না। তৃতীয় রাতে রাণী ঠিকই বলেছিলেন। সেই অদ্ভুত লোকটির আসল নাম। নাম শুনেই অবাক লোকটি দাপাতে শুরু করে। এক সময় রাগে ও ক্ষোভে সে অবাক। লোকটি নিজেই তার শরীরটা দু’টুকরো করে ফেলে। হাজার হাজার বছর আগের এই কাহিনী ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে এখনও ছেলে-বুড়ো সকলেই আগ্রহ সহকারে পড়ে থাকে।
গ্রীম ভাইদের প্রথম গল্প সঙ্কলন বের হয় ১৮১২ সালে। দ্বিতীয়টি বের হয় ১৮১৪ সালে। তারা সারাজীবন রূপকথার সংগ্রহ ছাড়া বিদেশি ভাষায় কবিতাও অনুবাদ করেছেন। জার্মান সাহিত্যে প্রচুর পাণ্ডিত্য থাকার জন্যে তারা দু’ভাই বেশ কয়েকবার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। একবার হ্যানোভার সম্রাটের অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যে তাদের দুই ভাইকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। বেশ কিছুদিন আগে ভিয়েনায় ইন্দ্রজারের দোহাই দিয়ে তাদের কিন্ডার এ্যান্ড হাউজ মারচেন বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
গ্রীম ভাইদের সিন্ডেরেলা, দি স্লিপিং বিউটি, মাদার হোলে, রাইডিং হুড, হেসেল এ্যান্ড গ্রেটেল, স্নো হোয়াইট প্রভৃতি গ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জ্যাকব গ্রীম ১৯৬৩ সালে এবং হীল হেলম গ্রীম ১৮৫৯ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে মারা যান।
মোস্তাফিজুর রহমান জুয়েল