সহপাঠী

ক্লাসের ফার্স্টবয় তারিক আর দুষ্টের শিরোমণি মিথুনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তারিকও স্কুল বন্ধ করে না, মিথুনও না। তবে স্কুল বন্ধ না করার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কারণ। অর্থাত্ তারিক স্কুল বন্ধ করে না এক কারণে, মিথুন বন্ধ করে না আরেক কারণে। তারিক রোজ স্কুলে যায়, কারণ লেখাপড়ার প্রতি তার প্রচণ্ড মনোযোগ। আর মিথুন রোজ স্কুলে যায় বাড়িতে ঘুমানোর ভালো পরিবেশ না থাকার কারণে। পরিমাণের চেয়ে একটু বেশি ঘুমালেই মা-বাবা বকাবকি করেন। ভাইয়া তো পারলে পা ধরে খাট থেকে টেনে নামান। অথচ ক্লাসে ঘুমানোর চমত্কার পরিবেশ। দেখে-শুনে পেছনের দিকের একটা বেঞ্চে বসে পড়তে পারলে একটানা ঘুম দেয়া যায়। ঘুম না এলে দুষ্টুমিটাও করা যায় মন ভরে। স্যারের হাতে ধরা পড়লে বড়জোর দু-চারটা ধমক খেতে হয়। এর চেয়ে বেশি কিছু না। মিথুনের দুষ্টুমিতে বৈচিত্র্য আছে বটে। রোজ সে নতুন নতুন দুষ্টুমি করার চেষ্টা করে। সব স্যার তার দুষ্টুমি ধরতে পারেন না। যে ক’জন স্যার ধরতে পারেন, তাদের ব্যাপারে সে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে। এমনকি তাদের ক্লাসে ঘুমানো থেকেও বিরত থাকে। আর যখন তার চোখে ঘুম থাকে না, তখন তার আশপাশের ছাত্রদের ভালোই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন কাকে খোঁচা মারে, কার পিঠে কলম আঁক দিয়ে বসে, কাকে কাতুকুতু দিতে শুরু করে- বলা মুশকিল। তার কারণে ক্লাসের নিরীহ ছাত্ররা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহায়। বেচারারা হয়তো শান্তশিষ্ট হয়ে বসে স্যারের বক্তব্য শুনছে, হঠাত্ সে কাতুকুতু দেয় আর তারা লাফিয়ে ওঠে। ক্লাসের নিরীহ ছাত্রদের তালিকা করলে সবার আগে যার নামটি আসবে, সে হলো মুকিত। সে চুপচাপ ক্লাসে আসে, চুপচাপ বাসায় চলে যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কারো সঙ্গে কথা বলে না। ক্লাসের বেঞ্চে বসা নিয়েও তার মধ্যে কোন প্রতিযোগিতা নেই। যে বেঞ্চে জায়গা পায়, সে বেঞ্চেই বসে পড়ে। বসার পর কেউ কোন কারণে তার ব্যাগ সরিয়ে দিলে সে বিনা প্রতিবাদে আরেক বেঞ্চে গিয়ে বসে। তবে তার খুব ইচ্ছে ফার্স্টবয় তারিকের পাশে বসার। সে প্রায় প্রতিদিনই আগে আগে স্কুলে আসে তারিকের পাশে বসার জন্যে। ভালো ছাত্র বলতে যা বোঝায়, মুকিত সেটা না। কোনরকমে টেনেটুনে পাস করে। যে জন্যে তারিকের পাশে বসার সুযোগ তার কমই হয়। তবু সে চেষ্টার ত্রুটি করে না। স্যারদের নিয়ে আরো কয়েক বছর আগেই মিথুন খুব সূক্ষ্ম গবেষণা করে রেখেছে। কোন্ স্যারের দৃষ্টিশক্তি কেমন, কোন্ স্যার অল্পতে রেগে যান, কোন্ স্যার একদমই রাগেন না, কোন্ স্যার রেগে গেলে ‘গেট আউট’ বলে ক্লাস থেকে বের করে দেন, সব তার মুখস্থ। তার খুব আফছোস হয়, কেন সব স্যার বাংলা দ্বিতীয় পত্র স্যারের মত না। এই স্যার যখন ক্লাসে ঢোকেন, তখন মিথুনের মনে হয় সে শিশুপার্কে ঢুকে পড়েছে। অতএব, যা ইচ্ছে তাই করো। স্যার কিছু দেখবেনও না, দেখলেও কিছু বলবেন না। রাগ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। কোনো ক্লাসের কোনো ছাত্র বলতে পারবে না, তাকে কোনদিন রাগ করতে দেখেছে। এই জন্যেই তিনি মিথুনের প্রিয় স্যার। সে মনে করে, সব স্যারদের উচিত বাংলা দ্বিতীয়পত্র স্যারের মত হওয়া। সেদিন বাংলা দ্বিতীয়পত্র ক্লাসই হচ্ছিল। আর পেছন দিকের বেঞ্চে বসে গভীরভাবে ঘুমুচ্ছিল মিথুন। ভাগ্যিস তার নাক ডাকানোর অভ্যাস নেই। নইলে ততক্ষণে নাক ডাকানোর শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে যেতে হতো সবাইকে। ক্লাস যখন প্রায় শেষ, তখন পাশেরজনের ধাক্কায় ঘুম ভাঙে মিথুনের। গভীর ঘুমের মধ্যে কেউ ধাক্কা মারলে তার খুব মেজাজ খারাপ হয়। আজও হয়েছিল। কিন্তু ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে যখন দেখল স্যার দাঁড়িয়ে আছে, তখন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে আনল। তবে সে একটা বিষয় বুঝতে পারছে না, স্যারের মুখ এতো কালো কেন। এই স্যার তো কখনও গোমড়া মুখে থাকেন না! তাহলে কি এই স্যারও অন্যান্য স্যারের মতই রাগী হয়ে গেলেন? মিথুন পরিস্থিতি বোঝার জন্যে এর ওর মুখের দিকে তাকায়। এমন সময় স্যার বলেন- আমি আবারও তোমারে অনুরোধ করছি, কেউ তারিকের মোবাইলটা নিয়ে থাকলে দিয়ে দাও। তোমরা জানো ব্যাপারটা প্রিন্সিপাল স্যারের কান পর্যন্ত চলে গেছে। হয়তো তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন। যদি তিনি আসার আগে মোবাইলটা বের না হয়, তাহলে কিন্তু বিশাল সমস্যা হয়ে যাবে। তখন আমার কিছু বলার থাকবে না। যদি ভালো চাও, মোবাইলটা দিয়ে দাও। স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই দুজন স্যার আর একজন পিয়নকে সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হন প্রিন্সিপাল স্যার। সবাই উঠে দাঁড়ায়। প্রিন্সিপাল স্যার সবাইকে হাতের ইশারায় বসতে বলেন। আর শেষবারের মত নির্দেশ দেন তারিকের মোবাইল ফেরত দেয়ার জন্যে। পাঁচ মিনিট চলে যায়। কেউ মোবাইল ফেরত দেয় না। স্যার পিয়নকে বলেন সবার বডি এবং ব্যাগ তল্লাশি করার জন্য। কয়েকটা ব্যাগ তল্লাশি করতেই মুকিতের ব্যাগের পকেটে মোবাইলের সন্ধান পাওয়া যায়। মুকিতের ব্যাগে মোবাইল পাওয়া গেছে দেখে স্যাররাসহ ছাত্র-ছাত্রী সবাই হ্যাঁ হয়ে যায়। এটা কি করে সম্ভব! এমন নিরীহ একটা ছেলে কিভাবে অন্যের মোবাইল চুরি করতে পারে? গণিত স্যার বললেন- এমন বহু ছাত্র আমি দেখেছি, যারা উপরে উপরে ভালো মানুষী দেখায়। কিন্তু তলে তলে দুনিয়ার বদ। এদিকে তারিক বেশ ভালোভাবে বুঝতে পারে, মুকিত কেন সব সময় তার সঙ্গে মিশতে চাইত। কেন প্রতিদিন তার পাশে বসতে চাইত। তার দামী মোবাইল সেটটার লোভে সে এসব করতে পারে, তারিক চিন্তাও করতে পারেনি। প্রিন্সিপাল স্যার কোন মন্তব্য করলেন না। তিনি বেশি কথা খরচ করার মানুষও নন। মুকিতকে অফিসে ডাকলেন। টিসি ধরিয়ে দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দিলেন। কোন চোরকে তিনি তার স্কুরে রাখতে চান না। আজ সে একজনের মোবাইল চুরি করেছে। কাল যে অফিসের কম্পিউটার চুরি করবে না, তার নিশ্চয়তা কি? স্কুল ছুটি হলো। সবাই নিজ নিজ বাড়িতে চল যায়। কিন্তু মিথুন সিদ্ধান্ত নেয়, মুকিতদের বাড়িতে যাবে। অনেক কষ্টে সে মুকিতদের বাড়ি খুঁজে পায়। মিথুন মুকিতের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। এমন সময় তার মায়ের বয়সী একজন মহিলা এগিয়ে আসে তার দিকে। মুকিতের মা মনে করে মিথুন তাকে সালাম দেয়। কিছুক্ষণ কথা বলেই মিথুন জানতে পারে তিনি আসলে মুকিতের মা নন। বরং তিনি এই বাড়ির মালিক। মুকিতরা এই বাড়িতে ভাড়া থাকত। মুকিতরা বলতে মুকিত আর মুকিতের মা। মহিলা জিজ্ঞেস করেন মুকিতকে কেন খোঁজ হচ্ছে। মিথুন বলে- আজ স্কুলে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর দুর্ঘটনা ঘটিয়েছি আমি। দুষ্টুমি করতে গিয়ে তারিক নামে একজনের মোবাইল এনে রেখে দিয়েছিলাম মুকিতের ব্যাগে। ভেবেছিলাম পরে দিয়ে দেবো। কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, বলতে পারবো না। যখন ঘুম ভাঙল, দেখি স্যাররা জেনে গেছেন। তখন ভয়ে স্বীকার করিনি কাজটা যে আমি করেছি। স্যাররা তখন মুকিতকে চোর মনে করে স্কুল থেকে বের করে দিয়েছেন। মিথুনের কথা শুনে মহিলা বললেন- ঘটনাটা আমি জানি। কিন্তু তুমি হয়তো জানো না মুকিতের মা কত কষ্ট করে মুকিতকে পড়াশোনা করাচ্ছিলেন। ছোটবেলায় তার বাবা মারা গেছেন। তিনি হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মুকিতের স্কুলের খরচ যুগিয়েছেন। শুধুমাত্র মুকিতকে ভালো একটা স্কুলে পড়ানোর জন্যে তিনি জমিজমা বিক্রি করে শহরে চলে এসেছিলেন। কিন্তু আজ যখন জানতে পারলেন তার ছেলে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, তিনি সহ্য করতে পারলেন না। সব ছেড়ে-ছুঁড়ে ছেলেকে নিয়ে গ্রামে চলে গেলেন। হয়তো এতোক্ষণে রেলস্টেশনে পৌঁছে গেছেন। মুকিতরা গ্রামে চলে যাচ্ছে শুনে মাথায় বাজ পড়ে মিথুনের। সে হন্যে হয়ে ছোটে রেলস্টেশনের দিকে।