দেশি ধান ও একজন ইউসুফ মোল্লা

কোনো কিছুর প্রতি ভালোবাসা অতি নিবিড় হইলে তাহা লইয়া হাজারো ঠাট্টা-বিদ্রূপও ফুত্কারে উড়িয়া যায়। তাহার প্রমাণ উত্তরবঙ্গের ইউসুফ মোল্লা। লুপ্ত ধানের ৬০টি প্রজাতির বীজ তিনি সংরক্ষণ করিয়াছেন শখের বশে নহে, গভীর ভালোবাসায়। সুগন্ধী ও বিরল প্রজাতির বিভিন্ন দেশি জাতের ধানের বীজ সংরক্ষণের এই ভালোবাসা তিনি পাইয়াছিলেন তাহার পিতার নিকট হইতে। পিতা নাই ২৫ বত্সর, কিন্তু তিনি ৩০ বত্সর ধরিয়াই নিবিষ্ট চিত্তে নিজের কাজটি করিয়া গিয়াছেন। বাহবা কিংবা স্বীকৃতি দূরঅস্ত, সকলে তাহাকে এমন ‘ফাও’ কাজের জন্য এতদিন ভর্ত্সনা করিয়াছেন, পাগল ঠাওরাইয়াছেন। এইবার সেই ইউসুফ মোল্লাই জাতীয় পরিবেশ পদকে ভূষিত হইয়াছেন। ইউসুফ মোল্লা স্বীকৃতির জন্য এমন কাজ করেন নাই। এখানেই তিনি অনন্যসাধারণ। স্বনিয়োজিত কর্মের অধিকারেই তিনি আত্মহারা, ফল একটি সময় আপনাআপনিই আসিয়াছে। তিনি যেইসকল প্রজাতির ধানের বীজ সংরক্ষণ করিয়াছেন তাহার বেশিরভাগই খরা ও বালাইসহিষ্ণু। এই সকল ধান চাষ করিতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করিতে হয় না বলিলেই চলে। স্বাদ-গন্ধেও ইহারা বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। অভিজ্ঞরা বলেন, রান্নার সময় ভাপ ওঠা ভাতের ম-ম গন্ধে মোহিত হইতে হয়। রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের ইউসুফ মোল্লা কৈশোর হইতেই বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করিয়াছেন। বাবাকে দেখিয়াছেন এইসকল বিশেষ বৈশিষ্ট্যের সুগন্ধি মিহি ধানের আবাদ করিতে। এক সময় লক্ষ্য করিলেন—হারিয়ে যাইতেছে এইসব ধান। তখন হইতেই স্বউদ্যোগে নিজের মতো করিয়া নিজ গ্রামে এসব ধানের সংগ্রহশালা গড়িয়া তোলেন তিনি। নিরবচ্ছিন্নভাবে ইউসুফ মোল্লার এই কাজ যাহাদের নিকট বাড়াবাড়ি ‘পাগলামি’ ভিন্ন অন্যকিছু মনে হয় নাই, আজ তাহারাই তাহার জাতীয় পদক প্রাপ্তির আনন্দে তাহাকে মাথায় তুলিয়া লইয়াছেন। দেশের কোণে কোণে এইরূপ কতশত বিষয় লইয়া নিভৃতে রহিয়াছেন এমন অসংখ্য ‘ইউসুফ মোল্লা’। তাহারাও স্বীকৃতির কাঙ্গাল নহেন। কিন্তু এমন সুসংবাদ নিশ্চয়ই তাহাদের আরো সাহস জোগাইবে। প্রাপ্তি এইখানেও। আমরা দেখিতেছি, দেশি জাতের বিশেষ গুণাগুণ সম্পন্ন যেইসকল ধান সংরক্ষণ করিবার কথা রাষ্ট্রের, তাহা করিয়াছেন গ্রামের একজন কৃষক। নেশায় নহে, স্বীকৃতির লোভেও নহে, শুধুমাত্র ভালোবাসায়। একসময় নাকি আমাদের দেশে দেশি ধান ছিল প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির। আর এখন রহিয়াছে মাত্র এক হাজার প্রজাতি। অর্থাত্ নব্বই শতাংশই হারাইয়া গিয়াছে। অথচ দেশি ধান প্রকৃতিবান্ধব। সার, কীটনাশক ও সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এসব ধানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অধিক। কিন্তু তাহার পরও ইহারা বিলুপ্ত হইয়াছে যাইতেছে মূলত উচ্চফলনশীল (উফশি-হাইব্রিড) ধানের কারণে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের রাহুছায়া সর্বাধিকভাবে পড়িয়াছে যেই সকল দেশের উপর, বাংলাদেশ তাহাদের ভেতরে প্রথম সারিতে। এই পরিবর্তনে আমাদের পানির স্তর ক্রমশ নিম্নমুখী হইতেছে। এই অবস্থা আরো সঙ্গীন হইলে ইউসুফ মোল্লার এইসব ধানের কাছেই আমাদের ফিরিয়া যাইতে হবে একদিন। তাহা ব্যতীত ভালো উপায় খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। কিন্তু বৈচিত্র্যময় শত শত প্রজাতির বীজই যদি সঠিকভাবে সংরক্ষিত করা সম্ভব না হয়, তাহা হইলে কীরূপে পরিবর্তিত প্রতিকূল পরিবেশেও আমরা সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে এই প্রধান খাদ্যশস্যের উত্পাদন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখিতে পারিব? কিংবা কীভাবে সম্ভব হইবে ইহাদের লইয়া উন্নততর গবেষণার? প্রাচীনতম দেশীয় জাতের ধান শুধুমাত্র অপেক্ষাকৃত কম লাভজনক বিধায় কৃষকের আগ্রহ কমিয়াছে। কিন্তু তাহাদের পরোক্ষ গুণ ও উপকারিতা হইতে ক্রমশ বিস্মৃত হইয়া পড়িতেছে পুরো জাতি। ফলে প্রতিনিয়তই দেশীয় জাতের ধান একে-একে হারাইয়া যাইতেছে আমাদের কৃষিজগত্ হইতে। সরকারিভাবে চাষী পর্যায়ে বীজ উত্পাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণ করিয়া বিলুপ্তপ্রায় বিরল গুণের বিভিন্ন দেশি জাতের ধান চাষ বৃদ্ধির বিকল্প নাই। তাহা ব্যতীত এইসকল ধানের ছবি একসময় শুধু জাদুঘরেই স্থান পাইবে।