ড্যাপ-এর বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে কিছু কথা
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৩, ২১:০৪
ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন হয় মুগল আমলে। ভৌগোলিকভাবে প্রাচীন বাংলার কেন্দ্রস্থল এবং চারদিক বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায় নদীপথে যোগাযোগের সুবিধার জন্য ১৬১০ সালে তদানীন্তন মুগল সুবেদার তার রাজধানী রাজমহল থেকে স্থানান্তর করে প্রথমবারের মতো ঢাকায় নিয়ে আসেন যা ১৭০৪ সাল পর্যন্ত বলবত্ থাকে। এ সময় ফরাসি, পর্তুগিজ এবং ডাচ ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় ঢাকার অবকাঠামো উন্নয়ন বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। কিন্তু বৃটিশ শাসন আমলে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে এখানকার উন্নয়নের ধারা বিঘ্নিত হতে শুরু করে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ রাজধানী মর্যাদা পায়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের ৮ম বৃহত্ (জনবসতি বিবেচনায়) নগরী হিসেবে খ্যাত। প্রথম দিকে এই শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে, যার নিদর্শন লালবাগের কেল্লা এবং আহসান মঞ্জিল। সময়ের পরিক্রমায় এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শহর ক্রমান্বয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে বিস্তৃত হয়।
ঢাকা শহরকে আধুনিক এবং বাসযোগ্য রাখতে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। ফলে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে গজিয়ে উঠেছে দালানকোঠা আর বস্তি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকা শহরে যেভাবে মানুষের আগমন ঘটেছে ঠিক সেভাবে ঢাকা শহরের বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তার ওপর সঠিক পরিকল্পনা এবং কঠোর তদারকির অভাবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা এবং রাস্তাঘাট যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হওয়ায় ঢাকা শহর হয়ে গেছে বসবাসের অযোগ্য। প্রতিটি শহরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয় পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন। শহরের যে কোনো অবকাঠামো উন্নয়নে এদের ভূমিকাই সর্বাধিক। যদিও সিটি কর্পোরেশন এবং রাজউক নামক দুটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা শহরের এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের অদক্ষতা এবং সীমাহীন দুর্নীতিতে ঢাকা শহরের পরিস্থিতি আজ এ অবস্থায় পৌঁছেছে।
আশির দশকে বাংলাদেশে যখন তৈরি পোশাক কারখানার ব্যাপক প্রসার ঘটে তখন গ্রাম-গঞ্জ থেকে ছেলেমেয়েরা কাজের জন্য ঢাকায় আসতে শুরু করে। এভাবে প্রতিনিয়ত মানুষ ঢাকায় আসায় এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসনসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা তৈরি হয়নি। ব্যক্তি উদ্যোগে অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে দালানকোঠা তৈরি হয়েছে, যার ফলে জলাবদ্ধতাসহ সীমাহীন যানজটের কারণে নাগরিকজীবন হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। এক্ষেত্রে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এবং বর্ণিত সংস্থাগুলো কখনোই বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। যদিও ১৯৯৫ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভলপমেন্ট প্ল্যান নামে একটি নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, তবে তার বাস্তবায়নে সরকারের তেমন জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং ঢাকা শহরের কর্মজীবী মানুষগুলোর আবাসন সমস্যা নিয়ে সরকার বরাবরই উদাসীন থেকেছে। রাজউক বিভিন্ন সময়ে আবাসিক সমস্যা সমাধানে সরকারি জায়গা উন্নয়ন করে প্লট আকারে বিতরণ করেছে বটে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি নিজস্ব জমি বা দখলি জমিতে ঘরবাড়ি তৈরি করে মানুষের চাহিদা মিটিয়েছে।
সময়ের পরিক্রমায় ঢাকা শহরের জনসংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু একই আনুপাতিক হারে সরকারি উদ্যোগে আবাসিক সুবিধা তেমন বাড়েনি। ফলে বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু কোম্পানি বিভিন্ন এলাকার জায়গা-জমি ক্রয় বা দখল করে তা ভরাট করে প্লট আকারে মানুষের কাছে কিস্তিতে বিক্রি করছে। তারা এই বিক্রি প্রক্রিয়ায় ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া ব্যবহার করে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তাদের প্রকল্পকে উপস্থাপন করছে। এতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন মেয়াদের কিস্তিতে প্লট বুকিং দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়েই এই ধরনের প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করছেন। তাঁরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনব্যয়কে সীমিত রেখে অর্থ সঞ্চয়ের মাধ্যমে ঐসব ভূমি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানকে জমি/ প্লটের দাম মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করছেন। এই ধরনের গ্রাহকের সংখ্যা ঢাকা শহরে কম করে হলেও কয়েক লাখ হবে। এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকারও হচ্ছেন। ঐসব ভূমি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কাছে তাঁরা এক ধরনের জিম্মি হয়ে আছেন। অনেকেই কিস্তির সমুদয় টাকা পরিশোধ করেও জমি বা প্লট পাচ্ছেন না।
এত অনিশ্চয়তার মধ্যে আবার ড্যাপ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) নামে দুঃস্বপ্নের এক ভূত তাড়া করে ফিরছে ঐ বিনিয়োগকারীদের। ড্যাপ-এর বাস্তবায়ন অবশ্যই একটি যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে তা এত পরে কেন? ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (DMDP) ঘোষণা হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তখন থেকেই ড্যাপের বাস্তবায়নের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? গত ১৬ বছর এই সেক্টরে বিস্তর অনিয়ম এবং দুর্নীতির ফলে অত্যন্ত অপরিকল্পিত ও নাজুকভাবে বেড়ে উঠেছে আজকের ঢাকা শহর। এ ক্ষেত্রে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বা রাজউক তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের ড্যাপ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত অসহায় ঐ সাধারণ গ্রাহকদের সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলবে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে। কারণ ড্যাপ-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হলে শত শত আবাসন কোম্পানি তাদের প্রকল্প বন্ধ করতে বাধ্য হবে। কেননা তাদের অধিকাংশ প্রকল্পই অনুমোদনবিহীন এবং ড্যাপ-এর আওতাধীন বিভিন্ন গ্রিন জোন বা বন্যা নিয়ন্ত্রক জলাধারের অন্তর্গত। আর সাধারণ গ্রাহকরাও ড্যাপ প্রকাশিত হওয়ার আগেই না জেনে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে। এ অবস্থায় ড্যাপ-এর বাস্তবায়ন করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই, যাঁরা তাঁদের অতিকষ্টে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনব্যয়কে সঙ্কুচিত করে ঐ সকল ভূমি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। অন্যদিকে ড্যাপ-এর বাস্তবায়নে আবাসন কোম্পানিগুলো ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ তারা তাদের গ্রাহকদের কিস্তির টাকা দিয়ে প্রকল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে নিজস্ব সম্পদের পাহাড় গড়েছে। এ ছাড়া ড্যাপ-এর দোহাই দিয়ে প্রকল্পের ব্যর্থতার জন্য সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে সাধারণ গ্রাহককে বঞ্চিত করারও সুযোগ পাবে। এভাবেই তারা তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঐ বিনিয়োগকারীদের কী হবে? তাদের স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে। ড্যাপ-এর বাস্তবায়ন হোক তা আমরা সবাই চাই। তবে এর বাস্তবায়নের সময় অবশ্যই আমাদের মতো বিনিয়োগকারীদের দুঃখ-কষ্টের কথা মনে রাখতে হবে। তারা যেন কোনোভাবেই বঞ্চিত না হয়।
ঢাকা