খুলনায় দুই প্রার্থীর বাকযুদ্ধ উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজপথে
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৩, ২২:২৬
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনকে কেন্দ করে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ঘটনা বাড়ছে। সেই সঙ্গে রাজপথেও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী ও বিএনপি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থীর মধ্যে পাল্টা-পাল্টি এ অভিযোগ চলছে। অভিযোগ করা থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থীও।
রিটার্নিং অফিস সূত্র জানায়, নগরীর মানিকতলায় ১ নম্বর ওয়ার্ড ট্রাক শ্রমিক লীগ সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের তালা প্রতীকের সমর্থনে রঙিন কাপড় দিয়ে সুদৃশ্য গেট তৈরি, রঙিন ব্যানার টানানো এবং আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে একটি নির্বাচনী কার্যালয় স্থাপন করে। এটি নির্বাচনী আচরণ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে গত ২ জুন রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগপত্র দাখিল করেন ঐক্যবদ্ধ নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি। অভিযোগপত্রের সাথে নির্বাচনী কার্যালয়ের রঙিন ছবি ও প্রতীকের ছবি সংযুক্ত করা হয়।
রিটার্নিং অফিসারের দপ্তরে দাখিলকৃত অপর অভিযোগে মনিরুজ্জামান মনি উল্লেখ করেন, গত ৩১ মে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনের নামে নগরীর ১২ নম্বর ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি তালুকদার আব্দুল খালেকের তালা প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। তার সাথে স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী পারভীন আক্তার ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মোঃ তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। এর আগেও নগরীর কয়েকটি পয়েন্টে তালুকদার খালেকের রঙ্গিন ছবি সম্বলিত প্যানা সাইন টানানোর বিষয়েও মনি লিখিত অভিযোগ করেন। এ ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসারের দপ্তর থেকে তাত্ক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অপরদিকে গত ২৮ মে টাউন জামে মসজিদে জেলা ইমাম পরিষদের নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করেন মনিরুজ্জামান মনি। ওই সভায় তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান ও ভোট চেয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন-মর্মে অভিযোগ করেন সম্মিলিত নাগরিক কমিটির সদস্য ও খানজাহান আলী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি বেগ লিয়াকত আলী। একই অভিযোগে তিনি নগরীর সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ‘টাউন জামে মসজিদে জেলা ইমাম পরিষদের নেতাকর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় মেয়র প্রার্থী মনি বলেন, ‘মসজিদের ইমাম-আলেমদের ওপর গুলি বর্ষণের জবাব দেয়ার সময় এসেছে, ব্যালটের মাধ্যমে তাদের উচিত শিক্ষা দেয়া হবে’। মনি মসজিদের মধ্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সামনে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও ভোট চেয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার খুলনা প্রেসক্লাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণাকালে জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু অভিযোগ করেছেন, নগরীর ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে সন্ত্রাসীরা তার দুইজন কর্মীকে মারধর করেছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে তার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। তদন্ত করে এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা সাংবাদিকদের জানানো হবে বলে তিনি জানান।
নির্বাচনে হেভিওয়েট দুই মেয়র প্রার্থীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিরূপ প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে। সাধারণ ভোটারদের আশঙ্কা, নির্বাচন কমিশন শক্ত হাতে ব্যবস্থা না নিলে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কারণে কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, সংরক্ষিত ৪ নম্বর আসনের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী পারভীন আক্তার ও ১২ নম্বর কাউন্সিলর প্রার্থী মোঃ তাজুল ইসলাম রিটার্নিং অফিসারের দপ্তরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। একই সাথে শ্রম প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত শেষ করেছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জোবায়ের হোসেন।
এ ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার মোস্তফা ফারুক বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন সংক্রান্ত বিষয়ে দুই মেয়র প্রার্থীর অভিযোগ পেয়েছেন। এসব ঘটনা তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
জাপা প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা :খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তার ১৫ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে এ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। ইশতেহারে বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনকে সত্যিকারভাবে জনগণের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, মহানগরীর উন্নয়নে পরিকল্পনা ও পরামর্শক কমিটি গঠন, সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্তকরণ, মাদকমুক্ত নগরী গঠন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা প্রদান, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতকরণ, নগরীর রাস্তাঘাট ও কালভার্ট সংক্রান্ত সমস্যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরসন এবং জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, সুইমিংপুল স্থাপন, খালিশপুর শিল্পাঞ্চল পুনরুজ্জীবন ও বেকারত্ব দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ, নগরীর পার্ক, উদ্যান ও বৃক্ষ সংরক্ষণ, নতুন আয়ের উত্স সৃষ্টি, শিক্ষাবৃত্তি ও গুণীজন সম্মাননা, খেলাধুলার উন্নয়ন, ট্যাক্স না বাড়ানো ও বিবিধ।
এ সময় শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, আমি নির্বাচিত হলে নির্বাচিত ইশতেহারে দেয়া অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার জন্য সচেষ্ট থাকবো।
এ সময় জাতীয় পার্টির (এ) প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ দিদার বখ্ত, নাগরিক উন্নয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান মোল্লা মুজিবর রহমান, শেখ আবুল হোসেন, অ্যাডভোকেট মাহতাব উদ্দীনসহ জাপার নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।