সাভার ট্রাজেডি :যেন ভুলে না যাই
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০১৩, ২১:১৪
সাভারে রানা প্লাজা ধসে নিহত হয়েছেন বহু মানুষ। তাদের শোকে দেশের মানুষ কেঁদেছেন। চড়া মূল্য দিয়ে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন অনেক শ্রমিক। কেউ কেউ হয়ে গেছেন সারা জীবনের জন্য পঙ্গু। দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন আহত মানুষগুলো এবং তাদের পরিবার। অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাভার ট্রাজেডিতে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা গরিব, বঞ্চিত, খেটেখাওয়া মানুষ। অনেকের লাশ পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি। উদ্ধার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও অনেকে তাদের নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এই যে এতো প্রাণহানি, এতো পঙ্গু মানুষ, এর দায়ভার কার? আর কত দেখতে হবে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ? এ কেমন মৃত্যু, যেখানে লাশেরও নিশ্চয়তা নেই ? যাদের কারণে এই লাশের মিছিল, তাদের শাস্তির জন্য সরকারের তদন্ত রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও এর আগের অনেক ঘটনার সুরাহা আজ পর্যন্ত হয়নি। ভবন ধসের ১৭ দিন পরে রেশমাকে জীবিত উদ্ধার কিংবা উদ্ধারকর্মী ইজাজউদ্দিন কায়কোবাদের আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্তে সাভারের ক্ষত মুছে যাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, দায়িত্বের জবাবদিহিতা যতদিন নিশ্চিত করা না যাবে, ততদিন এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। অন্য সব সৃষ্টির থেকে মানুষের পার্থক্য এই যে, মানুষের বিবেক আছে। বিবেক দিয়েই সে সবকিছু পরিচালিত করে। কিন্তু যাদের কাছে বিবেকের কোন স্থান নেই, যাদের কাছে মানবতাবোধ নেই, মনুষ্যত্ব যে তাদের অন্তরে কোনোদিনই জায়গা করতে পারে না তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ সাভারের রানা প্লাজা। ভবনে ফাটল ধরার পরেও কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করে মুনাফাখোরী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশে শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করা ও ভবন ধসে সহস্রাধিক মানুষের করুণ মৃত্যুসহ হাজার হাজার মানুষের মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার ঘটনা। তবে, বিবেক বিসর্জনের মহাযজ্ঞের মাঝেও অনেকে আছেন যারা বিবেক জাগ্রতকরণের মশাল নিয়ে ঘুরে বেড়ান। সাভার ট্রাজেডি সংঘটিত হওয়ার পর উদ্ধার কাজে বিস্ময়করভাবে সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসে সেটাই প্রমাণ করেছেন। আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকা রাজনৈতিক-সামাজিক দুর্বৃত্তপনায় ক্লান্ত জনসাধারণ যেভাবে সহযোগিতা, অদম্য মনোভাব আর সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা জাতির জন্য ভীষণ গর্বের। এর মধ্যে জীবন দিয়ে ইজাজউদ্দিন কায়কোবাদ নামের একজন সাধারণ মানুষ প্রমাণ করলেন, মানুষ এখনো নষ্ট হয়ে যায়নি। সাভার ট্রাজেডি একই সাথে অমানবিকতা আর মানবিকতার এক যুগপত্ দৃষ্টান্ত। অতি মুনাফা বা লাভই মুখ্য হিসেবে বিবেচ্য ব্যক্তিরা অমানবিকভাবে শ্রমিকদের জীবনের মূল্যকে অস্বীকার করেছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মানবিকতার চরম নিদর্শন হিসেবে শ্রমিকদের জীবনের মূল্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেছেন। সাভারের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এটাই দেখিয়ে দিলো, দেশে দিনের পর দিন আইন না মানার বহমান সংস্কৃতি কি ধরনের ভয়াবহ জাতীয় বিপর্যয় পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে, যার নির্মম শিকার হলেন নির্দোষ শ্রমজীবী মানুষগুলো। অকালেই তারা হারিয়ে গেলেন জীবন থেকে। আহারে, এতো লাশের মিছিল দেখেও কি আমাদের বোধোদয় হবে না ? আমরা কি এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে গেছি? এতো মানুষের কান্না আমাদের সপর্শ করে না কেন ? আমরা লোভকে এতটাই প্রশ্রয় দিয়েছি যে, মানুষের জীবনও এখানে মূল্যহীন। শ্রমজীবী মানুষের জীবনের মূল্য এতো কম কেন ? তারা অতিশয় দরিদ্র বলে? তাদের মাথা গোঁজার ঠাই নাই, সেটাই পুঁজি। দারিদ্র্যই জীবনের অভিশাপ, এটাই সব কিছুর মূলে। এটাই মোক্ষম হাতিয়ার তাদেরকে শোষণ করার। প্রাকৃতিক হোক বা মানবসৃষ্ট হোক, দরিদ্র মানুষের মৃত্যু অবধারিত। সস্তা শ্রম নামক যে বিশেষণটি পোশাক শিল্পের সাথে একাকার হয়ে আছে, সেখানে এখন প্রশ্ন উঠছে শ্রম সস্তা না মানুষের জীবন সস্তা। পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশে মানুষের চেয়ে সস্তা আর কিছু নেই।
যারা পোশাক শিল্পে কাজ করেন তারা কথিত উন্নত জীবনের অধিকারী হওয়ার জন্য নগরীতে আসেন না। জীবন ধারণের ন্যূনতম সংস্থান নিশ্চিত করার জন্যই তাদের আগমন। জীবন যুদ্ধে পরাজিত না হওয়ার দীপ্ত প্রত্যয়েই এই মাটি কামড়ে পড়ে থাকা। সকল বঞ্চনা মুখ বুজে সহ্য করে যাওয়া। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আয়-ব্যয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পার্থক্য, বাড়ি ভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শ্রম আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকা, ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করাসহ নানাবিধ শোষণ বঞ্চনার উপস্থিতিতে তাদের জীবনের স্বপ্ন ক্রমান্বয়ে আমাবস্যার অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এছাড়া, ভবন ধসে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনায় সৃষ্ট শ্রমিকদের সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিতো রয়েছেই। ফলে, মাঝে মাঝে শ্রমিক অসন্তোষের মতো ঘটনার সৃষ্টি হয়, যা শিল্পের সামগ্রিক স্বাভাবিকতা ব্যাহত করে। তাই, ভবিষ্যতে পোশাক শিল্পকে সব ধরনের নেতিবাচক আলোচনার বাইরে রাখার জন্য সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। কেননা, সাভারের ভবন ধসের পর সারা বিশ্বে ওঠা বিতর্কে শেষ পর্যন্ত যদি পোশাক রপ্তানিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। যার প্রভাবে শ্রমিক, মালিক, সরকার, জনগণ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। সামাজিক অস্থিরতা প্রকট থেকে প্রকটতর হবে। এ কারণে মালিক-শ্রমিক ও সরকারকে মিলিতভাবে শ্রমিক নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রচলিত আইন কানুনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে শিল্প মালিকদেরও সচেতন হতে হবে।
তবে আশংকা থেকেই যাচ্ছে, হয়তো একদিন সব আলোচনা থেমে যাবে, হারিয়ে যাবে দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান সব ধরনের প্রতিশ্রুতি। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে সবকিছু, যেন কিছুই হয়নি। তারপর, আবার অপেক্ষা। আবার কোথাও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নেমে আসবে। আবারও কোথাও নামবে লাশের মিছিল। মানুষের মৃত্যুর আগের রেকর্ডটি ছাড়িয়ে যাবে। শোকবার্তায় ভাসবে দেশ। সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন হয়ে টিভি পর্দায় চোখ রেখে হা-হুতাশ করবে। সংবাদকর্মীরা লাইভ সম্প্রচার করতে করতে হয়রান হবেন। কেউ কেউ আবার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে থাকা মানুষের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইবেন কিংবা পাঁচ দিন পরে উদ্ধার হওয়া আহত ব্যক্তির কাছে জানতে চাইবেন, বেঁচে থেকে কেমন লাগছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবেই চলবে সভ্যতা, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের সমাজ। তবু থামবে না শ্রমে নিয়োজিত অসংখ্য শ্রমিকের লাশের মিছিল। এটাই যেন নিয়তি।
লেখক : ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
ashadullah.bd@gmail.com