ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ

দেশের আরও দশটি সেবাখাতের ন্যায় নৌ পরিবহন খাতেও যথারীতি অব্যবস্থা চরমে পৌঁছিয়াছে। নৌ পরিবহন বিষয়ে গত শনিবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ খাতে বিদ্যমান অব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিশদ বিবরণ তুলিয়া ধরা হইয়াছে। প্রতি বত্সরই কর্তৃপক্ষীয় গাফিলতি, অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদগ্র বাসনা, যাত্রীসাধারণের সচেতনার অভাব ইত্যাদি নানা কারণেই মারাত্মক সব নৌ দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। এই সকল দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে অথচ এই ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুও যেন সকলের গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। তাই দুর্ঘটনার পর কয়েকদিন ধরিয়া তদন্ত কমিশন গঠন, নিহতদের পরিবার-পরিজনকে কোন কোন ক্ষেত্রে সামান্য ক্ষতিপূরণ প্রদান ইত্যাদি চলিলেও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই আইনের ফাঁক গলাইয়া অথবা টু পাইসের জোরে বা মামার জোরে পার পাইয়া যায়। এই পর্যন্ত নৌ পরিবহন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাজনিত কারণে ২০ হাজার মামলা হইয়াছে আর তন্মধ্যে নিষ্পত্তি হইয়াছে মাত্র ২০০টির। এই পরিসংখ্যান এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষীয় চরম ঔদাসীন্য ও অবহেলার ছবিটিকেই মূর্ত করিয়া তুলিতেছে কেবল। কোন সভ্য দেশে এমন চিত্রতো ভাবাই যায় না। কিন্তু আমাদের এই সব সম্ভবের দেশে সবকিছুই এলোমেলোভাবে চলে। এখানকার কর্তৃপক্ষীয় মহলের মনবাসনাটিই যেন ‘ওলট-পালট করে দে মা, লুটেপুটে খাই’। আর এ কারণেই সকলে মিলিয়া এখানে সব কিছুকে ওলট-পালট করিয়া দিতে সচেষ্ট থাকে। নৌ পরিবহন খাতটি এই নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য সর্বাপেক্ষা পরিবেশ-বান্ধব, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর খাত হিসাবে গড়িয়া উঠিতে পারিত এবং এই খাতটিকে সেইরূপভাবে গড়িয়া তোলাটাই উচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে এই খাতের প্রতি এত ঔদাসীন্য, উপেক্ষা ও অবহেলা দেখানো হইয়াছে এবং হইতেছে যাহা কিনা ভাবাই যায় না। বাংলাদেশের মতো এই ধরনের নদীবৈচিত্র্যের তথা নদীমাতৃক একটি দেশ বিশ্বে দ্বিতীয়টি খুঁজিয়া পাওয়া ভার। মালামাল কিংবা যাত্রী উভয় পরিবহনের ক্ষেত্রেই নদীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হইলে এই দেশের দরিদ্র জনসাধারণের যাতায়াত এবং মালামাল পরিবহন ক্ষেত্রে তাহাদের জন্য ব্যাপক সুবিধাপ্রাপ্তি সহজতর হইতো বৈ কি! কিন্তু আমাদের পরিকল্পনাবিদগণের কিংবা রাষ্ট্র পরিচালকগণের ইহা লইয়া গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিবার অবকাশ কোথায়? দেশের প্রাণীবৈচিত্র্য আজ অবলুপ্তির পথে আর এই জন্য যে কয়টি কারণ রহিয়াছে তন্মধ্যে প্রধানতম কারণটি হইতেছে নদীর প্রতি আমাদের হূদয়হীনতা! নৌপথে এখন যাত্রীদের যাতায়াত কম তাহা নহে; কিন্তু ফিটনেস ছাড়া নৌযান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের প্রবণতা, লক্কড়মার্কা লঞ্চ বা নৌযানের অবাধ যাতায়াত ইত্যাদি কারণে নৌপথ মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৭২ হইতে ২০১৩ সাল অবধি ৪১ বত্সরে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার যাত্রী নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছে। সারা দেশের নৌপথে বর্তমানে চলাচলের অযোগ্য লঞ্চসহ লক্ষাধিক নৌযান নিয়মিত চলাচল করে। প্রতিদিন কেবল ঢাকার নৌপথেই সহস্রাধিক ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচল করিতেছে। লঞ্চ মালিকরা মুনাফার লোভে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ইহা যেমন সত্য তেমনি আবার যাত্রীরাও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে উঠিতে কখনোও কুণ্ঠা বোধ করে বলিয়া মনে হয় না। অর্থাত্, তাহাদের মধ্যেও রহিয়াছে সচেতনার ব্যাপক অভাব। তাহাছাড়া, নদীর নাব্যতার সংকটসহ নদীপথে যান চলাচলের জন্য যে সকল অপরিহার্য উপকরণ থাকা প্রয়োজন উহারও রহিয়াছে দারুণ অভাব। এসব দেখভালের কেহ আছে বলিয়া মনে হয় না, থাকিলেও তাহারা ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নাই’ অবস্থায় আছে নিশ্চয়ই! রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও এই খাতে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না এমন অভিযোগও কম নাই। এমতাবস্থায়, এইসব বিষয়ে এতো উদাসীনতা চলিতে পারে না নিশ্চয়ই।