পরিবেশ
জীবাশ্ম জ্বালানির ভয়াবহ দিক
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০১৩, ২১:৩৭
বৈজ্ঞানিকভাবে এটা আজ প্রমাণিত, আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলাফল হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গমন। এ প্রক্রিয়ায় নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। আর এ সবের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে- জলবায়ুর ভয়াবহ পরিবর্তন। প্রশ্ন হচ্ছে, কত দ্রুত এই পরিবর্তন ঘটবে? এই প্রশ্নটিকেই নতুন দিশায় সামনে এনেছে, ‘দ্য টু-মাইল টাইম মেশিন: আইস কোরস, অ্যাবরাপ্ট ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড আওয়ার ফিউচার’ বইটি। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ চমকপ্রদ তথ্য-উপাত্তসম্বলিত এই বইটি লিখেছেন প্রখ্যাত জলবায়ু বিশারদ রিচার্ড বি. অ্যালে (Richard B. Alley)।
অ্যালে দীর্ঘদিন ধরে আইস কোর (Ice core) সংগ্রহ ও এগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন। আইস কোর (Ice core) হচ্ছে স্তরীভূত বরফের বিশালাকার স্তূপ বা হৈমাবরণ (Ice sheet) থেকে গবেষণার উদ্দেশ্যে বিশেষ উপায়ে সংগৃহীত বর্তুলাকার বরফ খণ্ড। গ্রীনল্যান্ডের ২ মাইল গভীর বিশাল বিস্তৃত বরফের স্তূপ থেকে এই আইস কোর বা বরফ খণ্ডগুলো সংগ্রহ করা হয়। কমপক্ষে ১ লাখ বছর ধরে ধীরে ধীরে পরতে পরতে পুঞ্জীভূত বা জমাটবদ্ধ হয়েছে গ্রীনল্যান্ডের এই অতিকায় বরফাচ্ছাদন। এক বছরের পরতের সঙ্গে অন্য বছরের পরতে সুস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে যা সহজেই দেখা যায়। এভাবে লাখো বছরের গঠনকালে এই হৈমাবরণ হয়ে উঠেছে বিশ্বের জলবায়ুর বিবর্তনের ইতিহাসের সাক্ষী আর বিজ্ঞানীদের উপাত্তের ভাড়ার। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আবহাওয়াগত উপাত্ত এখান থেকেই বের করা যায়, এর প্রতিটি পরত বা স্তর এক একটি বছরের আবহাওয়ার প্রাকৃতিক রেকর্ড। প্রকৃত বিচারে এই বিশাল বরফের আচ্ছাদন (Ice sheet) পৃথিবীর প্রাকৃতিক মহাফেজখানা বা আর্কাইভ। এর বাত্সরিক পরত বা স্তরগুলো অনেক রাসায়নিক তথ্য সংরক্ষণ করে, যা থেকে বিজ্ঞানীরা অতীতকালের তুষারপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা ইত্যাদি মৌলিক তথ্য উদ্ধার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এই আইস কোরে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ‘‘ইয়ংগার ড্রাইয়াস’’ (Younger Dryas) বরফ যুগের সমাপ্তিকাল জানা গেছে।
গ্রীনল্যান্ডে সংগৃহীত আইস কোর (Ice core) বা বিশেষ বরফ খণ্ড থেকে উদ্ধার করা বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত এটাই বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন যখনই হোক না কেন, এটা হতে পারে অকস্মাত্ ও চরম বিধ্বংসী। সে ক্ষেত্রে আমাদের দূর ভবিষত্যের উত্তরসূরীরাই কার্বন নির্গমনের কুফল ভোগ করবেন, এমনটা নাও হতে পারে। তেল, কয়লা, গ্যাস ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর মরণ নেশায় যে ভাবে আমরা আসক্ত তাতে আমাদের অতি নিকট পরবর্তী প্রজন্ম, আমাদের সন্তান বা নাতি-পুতিরাই সেই দুর্যোগের শিকার হবেন। কাজেই এখনই সময় সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও পারমাণবিক জ্বালানি শক্তিকে জীবাশ্ম জ্বালানির স্থলাভিষিক্ত করা। আমরা যারা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্ব চাই তাদের আজ সক্রিয় হতে হবে, সচেতন হতে হবে।
লেখক :হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস-এর গ্রাজুয়েট