দুটি মৃত্যু
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:১৩
‘এক্সকিউজ মি, এটা কোন থানা?’
গুলশান থানার ওসি আকরাম হোসেন মহাবিরক্ত হয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক মাঝারি উচ্চতার একজন মানুষ। মাথার কোঁকড়ানো চুল জেল মেখে সূক্ষ্ম দাঁতের চিরুনি দিয়ে টেনে সোজা করার চেষ্টা করা হয়েছে। চেষ্টা মোটামুটি ব্যর্থ বলা চলে। কারণ, জেল আর চিরুনির কড়া শাসন ভেঙে কোঁকড়া চুল তার স্বরূপে ফিরতে শুরু করেছে। কপালের চিন্তার সিঁড়ি এবং কোঁচকানো ভ্রুর নিচে উদ্বিগ্ন দুটি চোখ দামি ফ্রেমের চশমায় ঢাকা। চশমাটি তাঁর সম্ভ্রান্ততা রক্ষা করলেও এর পুরু কাচ নির্ঘুম চোখের কালিকে স্পষ্টতর করে তুলেছে। স্যুট পরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে প্রথম দর্শনে কালের কর্কশ কশাঘাতে পতনোন্মুখ কোনো প্রাচীন মূর্তি বলে মনে হয়।
‘কী চাই?’ যুগপত্ উদাসীন এবং বিরক্ত কণ্ঠে বললেন আকরাম হোসেন।
‘একটা জিডি করতে চাই।’
‘বসেন।’ হাই তুলতে তুলতে সোজা হয়ে বসলেন আকরাম হোসেন, ‘জিডি করার কারণ?’
‘জি?’
‘বলছি জিডি করতে চান কেন?’
‘জিডি কেন করে মানুষ?’ সরল প্রশ্ন ভদ্রলোকের।
বিরক্ত মুখে সিগারেট ধরালেন আকরাম হোসেন, ‘আপনার কি মানিব্যাগ হারিয়েছে? মোবাইল চুরি হয়েছে? নিজের বউকে খুঁজে পাচ্ছেন না? আইডেন্টিটি কার্ড খোয়া গেছে? কেউ হুমকি-ধামকি দিয়েছে? কী সমস্যা, না বললে জিডি করব কী করে?’
অপ্রস্তুত হয়ে অমায়িক হাসলেন ভদ্রলোক, ‘একটা সিগারেট পেতে পারি? ধন্যবাদ। জি, আমার প্রাণ সংশয়।’
‘কেউ কি আপনাকে খুন করার হুমকি দিয়েছে?’
‘জি।’
‘কীভাবে? মোবাইলে? চাঁদা চাচ্ছে?’
‘না, মুখে কিছু বলেনি। তার আচরণে আমার মনে হচ্ছে সুযোগ পেলেই সে আমাকে খুন করবে।’
কাগজ-কলম নিলেন আকরাম হোসেন, ‘কী নাম আপনার?’
‘নিজামুদ্দিন।’
‘কী করেন?’
‘বিজনেস।’
‘থাকেন কোথায়?’
‘উত্তরা।’
চোখ বড় বড় করে তাকালেন আকরাম হোসেন, ‘উত্তরা থেকে আপনি গুলশানে এসেছেন এই মাঝরাতে জিডি করতে? উত্তরা থানা কি সরকার তুলে দিয়েছে?’
‘ও, এটা গুলশান থানা?’
‘আপনি জানেন না?’
‘জি না। এইমাত্র পথে তাকে দেখলাম তো, তাই সামনে থানা পেয়ে ঢুকে পড়েছি।’
‘কাকে দেখলেন এইমাত্র?’
‘যে আমাকে খুন করবে।’
‘সে কে? নাম কী?’
‘নাম তো জানি না। তবে দেখলে চিনতে পারব।’
‘কোথায় থাকে, জানেন?’
‘জি না। তার চেহারা ছাড়া আর কিছুই আমি জানি না।’
‘মুশকিলে ফেললেন। সে আপনাকে খুন করতে চায়, বুঝলেন কী করে?’
‘তার সাথে আমার যেখানে-সেখানে দেখা হয়। বাসে, ট্রেনে, ফুটপাতে, রেস্টুরেন্টে। আমার দিকে তাকিয়ে সে হাসে, সেই হাসিতে মিশে থাকে তীব্র বিদ্রূপ আর কটাক্ষ। তার ডান হাতটা সবসময় জিনসের পকেটে লুকানো থাকে। আমি আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকি, কখন ওই পকেটে লুকানো কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের একটিমাত্র বুলেট আমাকে ভেদ করে অদৃশ্য হয়ে যাবে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এক মোহনীয় আকর্ষণ আছে তার চোখে, হাসিতে। আমাকে প্রায় হিপনোটাইজ করে ফেলে ওই চেহারা। অনেক কষ্টে আমি তার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখি।’
‘হুম।’ চিন্তিত মুখে থুতনি চুলকালেন আকরাম হোসেন, ‘ঘটনা শুনে মনে হচ্ছে, কেউ আপনার পেছনে ভাড়াটে খুনি লেলিয়ে দিয়েছে। সে আপনাকে যত্রতত্র ফলো করছে। মোক্ষম সুযোগ খুঁজছে গুলি করার। তবে ব্যাপারটা অন্যরকমও হতে পারে। হয়তো কেউ আপনার সম্পর্কে খোঁজ-খবর করছে। টিকটিকি লাগিয়েছে পেছনে। লোকটা দেখতে কেমন?’
‘পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, লম্বা চুল, খদ্দরের পাঞ্জাবি আর জিনস পরা, ডান হাত পকেটে।’
‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? কোনো ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী?’
এক মুহূর্ত চিন্তা করলেন নিজামুদ্দিন, ‘আসলে ব্যবসা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা মানেই প্রতিদ্বন্দ্বীর উপস্থিতি। তবে আমাকে খুন করতে চাইবে এমন কারও কথা মনে পড়ছে না। আমি কোনো বিজনেস ম্যাগনেট নই, ছোটখাটো ব্যবসা করি। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীরা খুব বেশি হলে ফোনে হুমকি-ধামকি দিতে পারে, কিংবা বদনাম রটিয়ে আমার বাজার খারাপ করতে পারে। খুন করার বা টিকটিকি লাগানোর কোনো দরকার দেখছি না।’
‘তবুও খুন হয়, নিজামুদ্দিন সাহেব। আমার তেইশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কারণের চেয়ে অকারণে খুনের সংখ্যা কম নয়।’
‘তা অবশ্য ঠিক। মানুষ তো নিজেকেও খুন করে। এ জন্য আপনি কাকে গ্রেফতার করবেন? হতাশা, অবসাদ, বিতৃষ্ণা এদেরকে তো আর গ্রেফতার করা সম্ভব না।’
‘বেশ ইন্টারেস্টিং কেস।’ নড়েচড়ে বসলেন আকরাম হোসেন, ‘এ রকম ঘটনা এই প্রথম শুনলাম। প্রতিদিন অসংখ্য চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-জমি নিয়ে গন্ডগোল আর রাজনৈতিক মামলা নিয়ে মুখস্ত দৌড়াদৌড়ি। প্রতিটি কেসের ফলাফল কম-বেশি জানি। চা খেলে কেমন হয়?’
‘ভালো হয়, কিন্তু এত রাতে কি চা পাওয়া যাবে? আর আপনি নিশ্চই ব্যস্ত।’
‘নিজামুদ্দিন সাহেব, এটা থানা। ঘুষ, কয়েদি, চা আর ফাইলবন্দি কেস, এই চারটি জিনিস এখানে চব্বিশ ঘণ্টা অ্যাভেইল্যাবল। মাঝরাতে এসেছেন বলে সরাসরি আমার ঘরে ঢুকে পড়লেন। দিনের বেলা এলে কতকক্ষণ বাইরে সিরিয়ালে থাকতেন, বলা যায় না। হয়তো সেন্ট্রিকে ঘুষও দিতেন। আর ব্যস্ত! হুম, সাধারণত ব্যস্তই থাকতে হয়, তবে মাত্র চার দিন আগে ঈদ গেল তো, থানাও ফাঁকা দেখছেন না? সেন্ট্রি!’
চা এল, সিগারেট জ্বলল। আকরাম হোসেনের চেহারায় একটা করুণ ভাব চলে এসেছে, ‘বুঝলেন মিজানুদ্দিন সাহেব...’
‘জি, আমার নাম নিজামুদ্দিন।’
‘ওহ, সরি। কিছুই না বুঝে পুলিশের চাকরিতে ঢুকে পড়েছিলাম। জীবনটা নষ্ট করে ফেললাম। ঘুষ খেতে খেতে সরষে-ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছি।’
নিজামুদ্দিনও যেন দেহটা চেয়ারের পিঠে এলিয়ে দিয়ে চোখে সামান্য কটাক্ষ নিয়ে বললেন, ‘আপনার কাছে কেউ কেস করতে এলে কি আপনি তাকে নিজের ঘুষ খাওয়ার কাহিনি শোনান? আমি যে কোনো সাংবাদিক নই, নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?’
‘হো হো। সাংবাদিকরা আমাদের চেয়ে চালাক নয়, বুঝলেন? তেনারা আসার মিনিমাম দুই ঘণ্টা আগে আমরা টের পাই।’
‘তবুও, একজন অচেনা মানুষের কাছে অকপটে আপনি নিজেকে ঘুষখোর হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়?’
আধপোড়া সিগারেটটা অ্যাশ-ট্রেতে গুঁজে দিয়েই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আকরাম হোসেন দীর্ঘশ্বাস ফেললে ধোঁয়ার রূপে তার দীর্ঘশ্বাসটা যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, ‘আপনি ডিভাইন জাস্টিসে বিশ্বাস করেন?’
‘মানে? ওহ, আমার বিশ্বাস করা না-করায় কিছু যায়-আসে না। আপনার বিষয়ে কথা হচ্ছে, কাজেই আপনিই বলুন।’
‘আমার মনে হয় ঐশ্বরিক পুরস্কার ও শাস্তি—দুটোই বাস্তব। আজ আমার মেয়েটার জন্মদিন। একমাত্র সন্তান আমার। ক্লাস টুতে পড়ে। সে জন্মদিনের কেক সামনে নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আর আমি এখানে শূন্যপ্রায় থানার ভাঙাচোরা বিল্ডিংয়ে বসে আছি। ডিউটি। “না” বলার কোনো পথ নেই। তাকে বোঝানো যায়নি, আমি কেন আসতে পারব না। কাজেই মিথ্যে কথা বলে এসেছি। আমি যখন বাসায় ফিরব, তখন সে অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। আজ আমার মনটা খুব খারাপ। এই মাঝরাতে থানায় বসে বসে নিজের পুরো অতীতটা যেন দেখতে পাচ্ছিলাম আর মন আরও খারাপ হচ্ছিল। আজ এই মুহূর্তে এখানে আপনার উপস্থিতি তাই স্পেশাল।’
‘আই অ্যাম সরি। তা ঘুষের স্বাদ সরষে-ইলিশের চেয়েও চমত্কার না কি?’
‘ঠিক তা না। তবে সত্য কথা হচ্ছে, ঘুষ না খেলে বর্তমানে ইলিশ খাওয়া দুষ্কর। আবার ঘুষ খেলে ইলিশের স্বাদ নেবার ক্ষমতা কমে যায়, তাও সত্য।’
‘আমারও অবস্থা আপনার চেয়ে খুব একটা ভালো না।’
‘তাই নাকি?’
সিগারেটে সুদীর্ঘ টান দিয়ে বিলীয়মান ধোঁয়ার সাথেই যেন মিশে গেলেন নিজামুদ্দিন, ‘এখন ভাবলে অবাক লাগে, ছাত্রজীবনে আমি বই পড়তাম। আরও অবাক লাগে যখন ভাবি, বেকার থাকতে আমি রাতে শান্তিতে ঘুমোতাম।’
‘এখন কি রাতে ঘুম হয় না?’
‘ওসি সাহেব, ব্যবসায়ীরা মোটামুটি দুটো কমন সমস্যায় ভোগে। গ্যাস্ট্রিক আর ইনসমনিয়া। চোখের নিচে কালি দেখে বুঝতে পারছেন না? আমার মাথার দিকে চেয়ে দেখুন। ছত্রিশ বছর বয়সে শতকরা চল্লিশটি চুল পেকে গেছে। ক্লিন শেভড না হলে দেখতেন, সিংহভাগ দাড়ি সাদা। হাঁটার সময় আমি আপনাআপনি কুঁজো হয়ে যাই।’
‘ওহ!’
‘আরেকটা সিগারেট দিন, ওসি সাহেব। থ্যাংকস। হ্যাঁ তাই। আকাশটা যেন আমার মাথার চেয়েও দু-ইঞ্চি নিচে নেমে এসেছে, ‘উন্নত মম শির’ আমার আর হচ্ছে না। এক সময় যদিও তা-ই ছিল। ব্যবসায় লোকসান হলে দুশ্চিন্তা, পরিবারের খরচ চলবে কী করে? লাভ হলে দুশ্চিন্তা, সামনের মাসেও এই পরিমাণ লাভ থাকবে তো? দিন দিন খরচ যেভাবে বাড়ছে, মাঝে মাঝে ব্যবসায় কিছু ভেজাল না দিলে চলে না। আমি না দিলে অন্যরা দেবে। পিছিয়ে পড়ব প্রতিযোগিতায়। নিয়মিত দলবদল করি, কমার্শিয়াল এরিয়ার নেতাদের তোষামোদ করে চলি। এভাবে দিন যাচ্ছে আর কি। তার ওপরে এই প্রাণসংশয়। মাঝে মাঝে বিবেক বড় যন্ত্রণা দেয়। কম হোক আর বেশি হোক, লোক ঠকিয়ে খাচ্ছি। পঁচিশ বছর আগের কথা ভাবলে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। রূপকথার মতো সুন্দর! কতই না সরল ছিল জীবনটা। অথচ তখন বুঝতে পারিনি সরলতার মর্ম। শিশু কি জানে যে সে নিষ্পাপ? পাপীরাই বোঝে ইনোসেন্স কী। আচ্ছা ওসি সাহেব, একটা কথা বলুন তো।’
‘কী কথা?’
‘আমরা কোথায়?’
‘ভুলে গেলেন? এটা গুলশান থানা।’
‘গুলশান এলাকাটা কোথায়?’
‘কী বলছেন বুঝতে পারছি না।’
‘বলুন না, গুলশান এলাকাটা কোথায়।’
‘ঢাকা শহরে।’
‘সেটা কোথায়?’
‘বাংলাদেশে।’
‘এই দেশটার অবস্থান কোথায়?’
‘পৃথিবী নামক একটি গ্রহে।’
‘আমরা এখানে কেন?’
‘মানে?’
‘আমি কেন এই গ্রহের বাসিন্দা?’
‘আপনার বাবা-মা আপনাকে এখানে এনেছেন, তাই।’
‘বাবা-মা আমাকে পেলেন কোথায়?’
‘তাঁরা ভালোবেসে আপনাকে পৃথিবীতে এনেছেন, একে-অপরকে উপহার দিয়েছেন, আর সন্তান কে না চায়?’
‘আমার মতামতের কোনো প্রয়োজন পড়ল না?’
সিগারেটে টান দিতে যাচ্ছিলেন আকরাম হোসেন, সেটা তাঁর ঠোঁটের কাছাকাছি এসে থেমে গেল, ‘কী বলছেন, নিজামুদ্দিন সাহেব?’ ‘আমার কোনো মতামত ছাড়াই আমাকে এই জগতে প্রবেশ করানো হলো। আমাকে একবার অন্তত জিজ্ঞেস করার
প্রয়োজন ছিল না? আমার তো পৃথিবীতে আসার ইচ্ছে না-ও থাকতে পারত। জোর করে আমাকে এখানে এনে বলা হলো পুণ্য করো, ভাল পথে চলো, মিথ্যা কথা বলো না, অসত্ পথে চলো না। অথচ এমন জায়গায় আমি প্রবেশ করেছি যেখানে সত্যবাদী হয় পাগল, পুঁজিবাদী হয় মানুষ। সত্য বলা, সরল পথে চলা আর অনাহারে থাকা পরস্পর পরিপূরক। ওসি সাহেব, আমিও সন্তান জন্ম দিয়েছি। সে ক্লাস এইটে পড়ে, মাঝে মাঝেই আমার পকেট থেকে দশ-বিশ-পঞ্চাশ টাকা চুরি করে। আমি হয়তো তাকে ধমক দিই, মাঝেমধ্যে চড়ও দিই। অথচ আমি জানি, ভবিষ্যতে দুই নম্বরি না করলে তার সংসার চলবে না। সে প্রচুর মিথ্যে কথা বলে, আমি শাসন করি, সততার কথা বলি। কিন্তু আমি জানি, ভবিষ্যতে ‘সদা সত্য কথা’ বললে তার রিজিক জুটবে না। আপনিই বলুন, আপনার বাবা-মা আপনাকে সত্ পথ দেখাননি? সত্য কথা বলতে বলেননি? লোক ঠকাতে নিষেধ করেননি? পরীক্ষার খাতায় আপনিও কি নীতিকথা লিখে আসেননি? আপনিও কি ছোটবেলায় পড়েননি, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’? পড়েননি? অথচ আপনি দুটোই করছেন, করছেন না? অথচ করছেন যে, এতে আপনাকে দোষও দিতে পারছি না। পৃথিবী আর ব্ল্যাকহোলের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না আমি। এই ভয়ংকর বিশ্ব এক সর্বনাশা বেশ্যার মতোই আমাকে আকর্ষণ করে। সর্বনাশ জেনেও বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে ভাবি, পৃথিবীর পরেও আরও কোনো দোজখ আছে?’
আকরাম হোসেন এবং নিজামুদ্দিন একে-অপরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন, কিন্তু দেখছেন না। নিজামুদ্দিন বলতে লাগলেন, ‘আমার যদি জন্ম না হতো, তবে বিশ্বশান্তির কি কোনো সমস্যা হতো? যেদিন আমি থাকব না, সেদিন কি এই পৃথিবী কিছু হারাবে? তবে কেন আমি এখানে? তার ওপরে আবার এই খুনি আমার পেছন পেছন ঘুরছে।’
ঘোরলাগা চোখে কিছুকক্ষণ বসে রইলেন আকরাম হোসেন। অকালে-অপঘাতে নিভে যাওয়া সিগারেটটা অ্যাশ-ট্রেতে গুঁজে দিলেন। শেষবারের মতো একবার পোড়া তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে মুখ থুবড়ে ছাইয়ের গাদায় পড়ে রইল সেটা, নিজামুদ্দিন সেটার দিকে হিংসাত্মক চোখে তাকালেন, আকরাম হোসেন বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি, কী করা যায়। ব্যাটা খুব সাহসী বলে মনে হচ্ছে না। নইলে এত দিন পেছন পেছন ঘোরে? প্রফেশনাল খুনিরা কখনোই খুন করার আগে সামনে আসে না। কটাক্ষমাখা হাসি তো দূরের কথা। নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যান। আমাদের গাড়ি আপনাকে পৌঁছে দেবে। ভয়ের কিছু নেই।’
২
গালিয়াকান্দা থানার ওসি আমিনুল্লাহর মন আজ বেশ ফুরফুরে।
আজ তিনি তিন তিনটে ঘুষের প্রস্তাব আনন্দের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতার হুমকি-ধামকিকেও উপেক্ষা করেছেন নির্বিকার ভাবে। দীর্ঘদিন সাধনার পর তিনি ঘুষ না খাওয়াটাকে এক ধরনের আর্ট হিসেবে নিতে শিখেছেন। আর্টিস্ট হয়ে ওঠার উপযুক্ত পুরস্কারও পেয়েছেন। দারিদ্র্যের কশাঘাত সয়ে, নানান রাজনৈতিক নেতার ব্ল্যাক বুকে নাম লিখিয়ে, বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে হতে আপাতত এসে ঠেকেছেন এই জরাজীর্ণ মফস্বল শহরে। এই বোধহয় শেষ। আগামী মাসেই তাঁর অবসর নেবার কথা।
‘আসতে পারি?’
আমিনুল্লাহ বিষণ্ন বিকেলের আলোয় থানার দরজার কাছে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের এক তরুণকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। মাথার অযত্নলালিত ঈষত্ কুঞ্চিত কুচকুচে কালো চুল এলোমেলো। গালে সপ্তাহখানেকের খোঁচা খোঁচা দাড়ি। পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর জিনস। তার ডানহাত জিনসের পকেটে। ভাঙাচোরা দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে দেখে প্রাচীন ফ্রেমে বাঁধানো একটি সামপ্রতিক ছবি বলে মনে হচ্ছে। আমিনুল্লাহ মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন। ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। ভালো করে দেখলেন ছেলেটিকে। এই ছোট মফস্বল শহরের প্রায় সবাইকে তিনি চেনেন। একে কখনো দেখেছেন বলে মনে পড়ছে না।
‘কী ব্যাপার বলুন।’
‘একটা জিডি করতে চাই।’
‘কারণ?’
‘আমার প্রাণ সংশয়।’
‘কীভাবে?’
‘কেউ আমাকে খুন করতে চায়।’
‘কে সে? নাম কী?’
‘নাম-ঠিকানা কিছুই জানি না। তবে দেখলে চিনতে পারব।’
‘সে আপনাকে খুন করতে চায়, বুঝলেন কী করে?’
‘সে আমাকে ফলো করে সব জায়গায়। পথে-ঘাটে, বাসে-ট্রেনে। এমনকি বাড়িতে আমার ঘরে ঢুকে পর্যন্ত বসে থাকে মাঝে মধ্যে। আমি যে থানায় এসেছি, তাও সে জানে।’
‘দেখতে কেমন?’
‘দেখে ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। মধ্যবয়সী, স্যুট পরা, চোখের নিচে কালি। দেখলে মনে হয় রাতে ঘুমোয় না। চোখে পাওয়ারফুল চশমা।’
‘আপনার নাম?’
‘মিজানুদ্দিন।’
‘শোনেন মিজানুদ্দিন। কেউ আপনাকে ফলো করলেই আপনি বলতে পারেন না যে, সে আপনাকে খুন করতে চায়। এমন ভাবার পেছনে কী যুক্তি আছে?’
‘তার চাউনি দেখলেই বুঝতে পারি। অদ্ভুত এক উন্মাদনা তার চোখে। কোনো সুস্থ মানুষ এভাবে তাকায় না। ওই চেহারা দেখলেই এক চরম বিতৃষ্ণা চলে আসে জীবনের প্রতি। ওই লোকটার সবকিছুকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে হয়। তার চকচকে চেহারা, দামি স্যুট, পালিশ করা জুতো, টাই, তার পথচলার ভঙ্গি—সব। তার বাঁ হাতে একগাছা দড়ি। উপযুক্ত সুযোগ পেলেই সে আমাকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে।’
‘স্যুট পরা একজন মানুষ হাতে দড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? আপনি ঠিক দেখেছেন তো?’
‘ওসি সাহেব, হ্যালুসিনেশন একবার হতে পারে। আমি তো রোজই তাকে দেখছি।’
‘আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? কোনো শত্রু?’
‘খুন করার মতো শত্রু আমার কেউ নেই। আমি নির্বিরোধী মানুষ।’
‘নির্বিরোধী মানুষরা বিরোধী মানুষের চেয়ে খুন হয় কম না। কী করা হয়? পড়াশোনা?’
‘পড়াশোনা শেষ করেছি। এখন প্রফেশনাল বেকার।’
‘খরচ চলে কী করে?’
‘এটা কি জানা জরুরি?’
‘হ্যাঁ। যে আপনাকে ফলো করছে তার মোটিভ জানা দরকার।’
‘দু-একটা টিউশনি করি।’
‘ঢাকায় গিয়ে চাকরি খুঁজছ না কেন?’ ছেলের বয়সী কাউকে বেশিক্ষণ আপনি বলতে পারেন না আমিনুল্লাহ। আর নিজে নিঃসন্তান হওয়াতে অনেকের মধ্যেই তিনি সন্তান খোঁজেন, পিতৃসুলভ আচরণের প্রয়াস নেন।
‘সেই সামর্থ্য নেই। ইচ্ছাও নেই হয়তো বা।’
‘ইচ্ছে নেই মানে?’
‘বেশ তো আছি। খাচ্ছি দাচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, রাতে শান্তিতে ঘুমাচ্ছি, নিশ্চিন্তে বই পড়তে পারছি। কারও কাছে দায়বদ্ধতা নেই। এখন যেমন আছি, ঢাকায় গেলে এর চেয়ে ভালো থাকব, এর কী নিশ্চয়তা আছে?’
‘বা রে! চাকরি করতে হবে না? বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে তো।’
‘মানুষ বিয়ে করে কেন?’
‘মানে?’
‘মানুষ আসলে বিয়ে করে কী পায়?’
এই সরল প্রশ্ন নিজেকেও করলেন আমিনুল্লাহ। বিয়ে করে তিনি কী পেয়েছেন, সেটা ভাবতে চেষ্টা করলেন। মানুষ বিয়ে করে শান্তির আশায়। সে বস্তু কি তিনি পেয়েছেন? বিয়ে না করলে কি তিনি এরচেয়ে শান্তিতে থাকতেন? যেহেতু বিয়ে করেই ফেলেছেন, কাজেই অবিবাহিত জীবন এরচেয়ে শান্তির হতো কি না, বলা যাচ্ছে না। আবার যদি বিয়ে না করতেন, তাহলে বিবাহিত জীবন তারচেয়ে ভালো হতো কি না, বলতে পারতেন না। অদ্ভুত জটিলতা!
‘আমি জানি,’ মিজানুদ্দিনের কথায় আপাতত অদ্ভুত জটিলতা থেকে মুক্তি পেলেন আমিনুল্লাহ, ‘আমি জানি আমাকে চাকরি করতে হবে। হয়তো ঢাকায়ই যেতে হবে, সেখানে চাকরির সুযোগ বেশি। পরিবারের বড় ছেলে আমি। দায়িত্ব এড়ানো যাবে না। আমার বাপ আমাকে ছাড়বে না। সে যা করেছে, আমাকে দিয়েও তা-ই করিয়ে ছাড়বে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় না খেয়ে থাকতে চায়, সেই উপায়ও নেই। আপনাকে খেতেই হবে। সবাই খাচ্ছে, আমি খাচ্ছি না, তাই কি সমাজ মেনে নেয়? বিয়েও হয়তো করতে হবে। ঢাকা শহরে নাকি বিবাহিত মানুষের জন্য বাসা ভাড়া পাওয়া সহজ হয়।’
মিজানুদ্দিনের দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে আমিনুল্লাহ বললেন, ‘তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও। গালিয়াকান্দা ছোট শহর। ব্যাটাকে খুঁজে বের করা কঠিন হবে না।’
ঋজু ভঙ্গিতে দৃঢ় পদক্ষেপে মিজানুদ্দিন বেরিয়ে গেলে আমিনুল্লাহর কেন যেন মনে হয়, ছেলেটিকে তিনি ভালো করেই চেনেন। এই মফস্বল শহরের যত্রতত্র তাকে দেখেছেন তিনি, রোজই দেখেন।
৩
কয়েকদিন পর একটি অখ্যাত দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞাপনের পাতার নিচে পরিত্যাক্ত খালি জায়গায় দুটি অনুল্লেখযোগ্য অপমৃত্যুর খবর ছাপা হয়।
খবর ১:উত্তরায় নিজামুদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ী নিজের লাইসেন্স করা রিভলবারের গুলিতে নিহত হয়েছেন। ডান চোয়ালের হাড় গুঁড়ো করে বাঁ কানটা উড়িয়ে নিয়ে গেছে বুলেট। রিভলবারে কারও হাতের ছাপ আছে কি না, পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তাঁর মৃতদেহের পাশে কম্পিউটার কম্পোজ করা একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটে লেখা আছে—অনধিকার প্রবেশের অপরাধে নিজামুদ্দিনকে হত্যা করা হলো।
খবর ২:গালিয়াকান্দা থানার রঘুনাথপুর গ্রামে মিজানুদ্দিন নামে একজন যুবকের গলায় ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার রেখে যাওয়া চিরকুটে লেখা—সীমা লঙ্ঘন করার পূর্বেই মিজানুদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো।
চিরকুটগুলো পড়লে মনে হয় কোনো অদৃশ্য বিচারক রায় ঘোষণা করছেন। পত্রিকাটির প্রতিবেদক জানাচ্ছেন, মৃত্যুর পূর্বে তাঁরা দু-জনই থানায় জিডি করেছিলেন যে, কেউ তাঁদের খুন করতে চায়। গুলশান এবং গালিয়াকান্দা থানার পুলিশ জানায়, তাঁরা যে শত্রুর বর্ণনা দিয়েছিলেন, তেমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।