জাকারিয়া তামেরের গল্প
দশ দিনে অসভ্য বাঘও সুসভ্য নাগরিক হয়ে যায়
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:১৪
অনুবাদ :ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
লোহার খাঁচায় বন্দী বাঘ ভুলতে পারছে না প্রিয় বনভূমির কথা। তাকে ঘিরে দাঁড়ানো মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রাগে আর ঘৃণায় সে গর্জাতে থাকে। লোকগুলোর কোনো ভয়-ডর নেই। দু-চোখ দিয়ে তাকে একেবারে গিলে খাচ্ছে।
লোকগুলোর একজন ভারি মাতবরি ফলিয়ে বলেন, ‘আমার মতো হতে চাইলে, পশুকে পোষ মানানোর বিদ্যাটা শিখতে চাইলে, একটা জিনিস তোমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, সেটা হচ্ছে শিকারের পেট। পেটটাই হবে তোমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। পশু বশ করার কাজটা খুব সহজ, আবার খুব কঠিন। দেখো, এই বাঘটাকে দেখো, নিজের শক্তি-সামর্থ ও স্বাধীনতার জোরে সে কেমন হিংস্র, দাম্ভিক আর বেপরোয়া। এই বাঘও কিন্তু বদলায়। শিশুর মতো আলাভোলা, নম্র আর বাধ্য হয়। কীভাবে হয়? ধরো, তোমাদের একজনের হাতে খাবার আছে আর আরেকজনের হাতে নেই। দুজনের পার্থক্যটা বোঝার চেষ্টা করো আর তা থেকে শিক্ষা নাও।’
বশীকরণ পেশার শিক্ষার্থীরা হাঁ হয়ে বশীকরণবিদের কথা শোনে। তাদের আগ্রহ দেখে বশীকরণবিদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাঘটির দিকে মশকরা করে বলেন, ‘এই যে, সম্মানিত অতিথি? কেমন আছেন?’
গম্ভীর গলায় বাঘটি বলে, ‘আমার এখন খাওয়ার সময়। খেতে দাও।’
বিস্মিত হওয়ার ভান করে বশীকরণবিদ বলেন, ‘আ রে বাপ রে! তুমি তো আমার বন্দী, তুমিই আমাকে আদেশ দিচ্ছ। তুমি তো বেশ মজার বাঘ! তোমার তো বোঝা উচিত, এখানে আদেশ দেব কেবল আমি।’
বাঘটি আগের মতোই গম্ভীর গলায় বলে, ‘বাঘকে কেউ আদেশ দিতে পারে না।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘তুমি তো এখন আর বাঘ নও। বনে তুমি বাঘ ছিলে, এখানে তো খাঁচায় বন্দী, এখানে তুমি আমার দাস, আমার আদেশ শুনবে, আমার ইচ্ছামতো কাজ করবে।’
রাগে গর্জাতে গর্জাতে বাঘ বলে, ‘আমি কারও দাস নই।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘আমাকে তোমার মানতেই হবে। খাবার তো আমার হাতে।’
বাঘ বলে, ‘তোমার খাবার আমি চাই না।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে তুমি না খেয়েই থাকো। তুমি যা করতে চাও না, তা করার জন্য আমি তোমার ওপর জোর খাটাব না।’
উত্সুক শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে বশীকরণবিদ বলেন, ‘উঁচু মাথা ক্ষুধার্ত পেটের কোনো কাজে লাগে না। তোমরা দেখো, এই বাঘও তার মন বদলাবে।’
বাঘটির খাবার জোটে না। বিষণ্ন মনে সে তার বনের দিনগুলোর কথা ভাবে। বনে কোথাও কোনো বাধা ছিল না। হাওয়ার মতো দুরন্ত গতিতে সে শিকারের পেছনে ধাওয়া করত।
পরের দিন আবার শিক্ষার্থীদের নিয়ে বশীকরণবিদ বাঘের খাঁচার সামনে এসে দাঁড়ান।
বাঘের কাছে জানতে চান, ‘কী হে, তোমার ক্ষুধা লাগে না? প্রচণ্ড ক্ষুধা তোমাকে খুব কষ্ট দেবে। তারচেয়ে বলো যে, তুমি ক্ষুধার্ত। বললেই তোমাকে এই সবটুকু মাংস দেব।’
বাঘ চুপ করে থাকে।
বশীকরণবিদ বলেন, ‘যা বলি, তা করো। বোকামি করো না। স্বীকার করো যে তুমি ক্ষুধার্ত। তাহলে তোমাকে এখনই খাবার দেব।’
এবার বাঘটি নিরীহ গলায় বলে, ‘আমি ক্ষুধার্ত।’
বাঘের কথা শুনে বশীকরণবিদ হাসতে থাকেন। হাসতে হাসতে শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘এবার সে একটা ফাঁদে পড়েছে। এই ফাঁদ থেকে আর বের হতে পারবে না।’
বশীকরণবিদ বাঘের জন্য খাবার আনতে বলেন। বাঘটিকে প্রচুর মাংস খেতে দেওয়া হয়।
তৃতীয় দিনে বশীকরণবিদ বাঘকে বলেন, ‘আজ খাবার খেতে চাইলে আমি তোমাকে যা বলব, তা করতে হবে।’
চাপা গর্জনে বাঘ বলে, ‘আমি তোমার আদেশ মানব না।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘এমন হুটহাট না বলো না। আমার অনুরোধ তো খুবই সামান্য। এই যে তুমি খাঁচার মধ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছ। আমি থামতে বললে থেমে যাবে। ব্যস!’
খাঁচার মধ্যে পাক খেতে খেতে বাঘটি মনে মনে ভাবে, ‘এটা তো সত্যিই খুব সামান্য একটা ব্যাপার। একগুঁয়েমি করে না খেয়ে থাকার তো কোনো মানে নেই।’
বশীকরণবিদ খুব কড়া গলায় আদেশ করেন, ‘থামো!’
সঙ্গে সঙ্গে বাঘটি থেমে যায়।
বশীকরণবিদ বন্ধুর মতো বলেন, ‘আ রে, ইয়ার, তুমি তো বেশ ভালো করেছ!’
প্রশংসা শুনে বন্দী বাঘেরও বেশ খুশি খুশি লাগে। তাকে প্রচুর মাংস এনে দেওয়া হয়। সে হালুম হালুম করে খেতে থাকে। বশীকরণবিদ শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘তোমরা দেখো, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এই বাঘ একটা কাগুজে বাঘ হয়ে যাবে।’
চতুর্থ দিন খাঁচার কাছে আসতেই বশীকরণবিদকে বাঘ বলে, ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে, আমাকে তুমি থামতে বলো।’
শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে বশীকরণবিদ বলেন, ‘এই তো, এই তো সে আমার আদেশ পছন্দ করতে শুরু করেছে।’
বাঘের দিকে ফিরে তিনি বলেন, ‘ছোট্ট বিড়ালের মতো মিউ মিউ না করলে আজ তুমি খাবার পাবে না।’
বাঘ মনে মনে গর্জায়। রাগে কটমট করতে করতে রাগটা হজম করে। নিজের মনেই সে বলে, ‘না না, ঠিক আছে, বিড়ালের মতো মিউ মিউ করাটা বেশ মজার হবে।’ সে তা-ই করে। বাঘের মিউ মিউ শুনে বশীকরণবিদ কঠিন চোখে তাকিয়ে বলেন, ‘ওহ! কী ভয়ানক! এভাবে গর্জন করার নাম বুঝি মিউ মিউ?’
বাঘ আবার চেষ্টা করে। বশীকরণবিদের চোখ-মুখ নরম হয় না। খুব বিরক্ত হয়ে খেঁকিয়ে ওঠেন তিনি, ‘থামো, থামো। তোমার মিউ মিউ এখনো ভীষণ ভয়ানক! আমি তোমাকে একদিন সময় দিচ্ছি মিউ মিউ শেখার, কাল তোমার পরীক্ষা নেব। সফল হলে খাবার পাবে।’
ধীরে ধীরে হেঁটে খাঁচা থেকে দূরে সরে যান বশীকরণবিদ। শিক্ষার্থীরা মুখ চেপে হাসে আর ফিসফিস করতে করতে তাদের শিক্ষককে অনুসরণ করে। বাঘ চিত্কার করে। হাউমাউ করে কেঁদে তার বহু দূরের প্রিয় বনভূমিকে ডাকে। সেই বনে তার ডাক পৌঁছায় না।
পঞ্চম দিনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাঘের খাঁচা ঘিরে দাঁড়ান বশীকরণবিদ। বাঘকে বলেন, ‘ছোট্ট পুষি বিড়ালের মতো মিউ মিউ করো তো, সোনা! একদম, ইয়া বড় এক টুকরা তাজা মাংস দেব।’
বাঘটি ছোট্ট বিড়ালছানার মতো মিউ মিউ করে।
বাঘের মিউ মিউ শুনে আহ্লাদে হাততালি দেন বশীকরণবিদ। খুশিতে ডগমগো হয়ে বলেন, ‘দারুণ! চমত্কার! তুমি তো এক্কেবারে উঠতি বয়সের একটা গরম হুলোর মতো মিউ মিউ করলে।’ বাঘের দিকে বড় এক টুকরা মাংস ছুড়ে দেন তিনি।
ষষ্ঠ দিনে বশীকরণবিদ খাঁচার কাছে যেতেই বাঘটি মিউ মিউ করতে থাকে। তাতে কিন্তু বশীকরণবিদের ভ্রু আর কপালের ভাঁজ ভাঙে না। বশীকরণবিদের মন পেতে বাঘ আগ বাড়িয়ে বলে, ‘আমি তো বিড়ালের মতো মিউ মিউ করেছি।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘গাধার মতো আওয়াজ করো তো!’
বাঘ রাগে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। হতাশায় মরিয়া হয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, ‘আমি বাঘ! বনের সব পশু আমার ভয়ে এক ঘাটে পানি খায়। মরে যাব, তবু গাধার মতো ডাকব না।’
বশীকরণবিদ কোনো কথা না বলে খাঁচার কাছ থেকে দূরে সরে যান।
সপ্তম দিনে বশীকরণবিদ আবার হাসিমুখে বাঘের খাঁচার কাছে এসে বলেন, ‘কী হে, তুমি কি কিছু খেতে চাও না?’
বাঘ খুব নরম গলায় বলে, ‘হ্যাঁ, খেতে চাই।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘যে মাংস তোমাকে দেওয়া হয় তা কিনতে তো টাকা লাগে। গাধার মতো ডাকো, খাবার পাবে।’
বাঘটি বনের কথা স্মরণ করার অনেক চেষ্টা করে, কিন্তু তার আর কিছু মনে পড়ে না। সে চোখ বুঁজে গাধার মতো ‘হি-ই-ই-হা-উ-উ’ শব্দ করে।
বশীকরণবিদ গম্ভীর গলায় বলেন, ‘তোমার গাধার ডাকটা তেমন ভালো হয়নি। তারপরও দয়া করে তোমাকে এই এক টুকরো মাংস দিচ্ছি।’
অষ্টম দিনে খাঁচার কাছে এসে বশীকরণবিদ বলেন, ‘আমি আমার বক্তৃতার প্রথম অংশটা শুরু করছি। শেষ করার সাথে সাথে তুমি এমনভাবে হাততালি দেবে যেন বক্তৃতাটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
শান্ত বাঘ বলে, ‘ঠিক আছে, আমি তালি বাজাব।’
বশীকরণবিদ বক্তৃতা শুরু করেন, ‘প্রিয় নাগরিকগণ, এর আগেও বিভিন্ন উপলক্ষে আমরা বর্তমান সময়ের চরম সমস্যা ও সংকটগুলো চিহ্নিত করে আমাদের অবস্থানের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি। আগ্রাসী শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্রই করুক, আমাদের এই সুদৃঢ় ও সত্ অবস্থান কিছুতেই বদলাবে না। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বিজয় আমাদের হবেই।’
বক্তৃতা শুনে বাঘ বলে, ‘তুমি যে কী বললে, কিছুই বুঝলাম না।’
রাগ দেখিয়ে বশীকরণবিদ বলেন, ‘আমি যা বলছি, তা তোমার পছন্দ করতে হবে এবং তুমুল উত্সাহে হাততালি দিতে হবে।’
বাঘ বলে, ‘মাফ করো আমাকে! আমি মূর্খ, আমি নির্বোধ। মহান, মহান তোমার বাণী! তুমি যা চাও তা-ই করছি, এই যে তালি দিচ্ছি।’
বাঘটি সামনের দু-পা তুলে তুমুল হাততালি দিতে থাকে।
বশীকরণবিদ বলেন, ‘দেখো, ভণ্ডামি আমি একদম পছন্দ করি না, ভণ্ডদেরও দেখতে পারি না। আজ তুমি কোনো খাবার পাবে না। এটাই তোমার ভণ্ডামির শাস্তি।’
নবম দিনে এক ব্যাগ খড় নিয়ে খাঁচার কাছে আসেন বশীকরণবিদ। বাঘের দিকে খড়কুটো ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘নাও, খাও!’
কাণ্ড দেখে বাঘ একেবারে বেকুব হয়ে যায়। বশীকরণবিদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই, এইগুলো কী? আমি তো, আমি তো মাংস খাই, মাংসাশী।’
বশীকরণবিদ বলেন, ‘এখন থেকে তুমি খড় ছাড়া আর কিছু পাবে না।’
একসময় প্রচণ্ড ক্ষুধায় বাঘটি সেই খড় চিবানোর চেষ্টা করে। বিস্বাদ খড় তাকে মর্মাহত করে। মুখ থেকে থু থু করে ফেলে দিয়ে বিরক্ত হয়ে সরে যায়। ক্ষুধার জ্বালায় আবার ফিরে আসে খড়ের কাছে। এইভাবে ধীরে ধীরে সে খড় খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
দশম দিনে বশীকরণবিদ, শিক্ষার্থীর দল, বাঘ আর লোহার খাঁচা—সবকিছু অদৃশ্য। বাঘটি হয়ে যায় সুসভ্য এক নাগরিক আর খাঁচাটি হয়ে ওঠে এক সুরম্য নগরি।
[আরব বিশ্বের অন্যতম গল্পকার জাকারিয়া তামেরের জন্ম ১৯৩১ সালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে। শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হওয়ায় শৈশবেই বিদ্যালয় ছেড়ে কাজ শুরু করেন কামারশালায়। ১৯৮০ সালে সিরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ‘আল মারিফাহ’ পাক্ষিক পত্রিকা থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর চলে যান যুক্তরাজ্যে। তিন দশকের বেশি সময় লন্ডনেই আছেন তিনি। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর অনেক লেখা অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদে তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি গল্পগ্রন্থ ‘টাইগার অন দ্য টেন্থ ডে’ এবং ‘ব্রেকিং নিস’। শিশুদের জন্য অনেক লিখেছেন তিনি। যুক্তরাজ্য এবং সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক কলাম লেখেন জাকারিয়া তামের। তাঁর গল্প ফ্যাবল, প্যারাবল, পরাবাস্তবতা, মুসলিম সমাজে প্রচলিত মিথ ও গল্প-গাথার আশ্রয়ে দ্রোহের ব্যঙ্গাত্মক তীর। অমানবিকতা, দমন-পীড়ন আর দেশ ও বিশ্বের রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর হাতিয়ার এই গল্পগুলো। অনূদিত গল্পটি ডেনিস জনশন ড্যাভিসের ইংরেজি অনুবাদ থেকে তর্জমাকৃত।]