রানা প্লাজায় নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের আহাজারি

রানা প্লাজা ধসিয়া পড়ার পর একমাসের বেশি সময় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু অজানাসংখ্যক নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারি আজো থামে নাই। অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় হইতে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র গুটাইয়া নেওয়া হইয়াছে আগেই। দুর্ঘটনা স্থলটিও কাঁটাতারের বেড়া দিয়া ঘিরিয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু দূর দূরান্ত হইতে আসা বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে সেইখানে ছুটিয়া যাইতেছেন। ধরনা দিতেছেন স্থানীয় থানা ও প্রশাসনসহ সম্ভাব্য সকল স্থানে। নিখোঁজ শ্রমিকদের ‘সঠিক’ তালিকা প্রকাশসহ বিভিন্ন দাবিতে ইতিমধ্যে বিক্ষোভ সমাবেশ হইয়াছে। ঘটিয়াছে সড়ক অবরোধের ঘটনাও। স্বজনহারা মানুষের এই আহাজারি কিংবা ক্ষোভ মোটেও অপ্রত্যাশিত নহে। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই ভবনধসের ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত ২৪ এপ্রিল। কিন্তু এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয় নাই। সাভারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও বিষয়টি স্বীকার করিয়াছেন। প্রসঙ্গত তিনি জানাইয়াছেন যে, এ পর্যন্ত ৩৩২ জন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করা হইয়াছে। ইহার পরও প্রতিদিন দুই-একজনের নাম আসিতেছে। অতএব, সঠিক বা চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কাজটি যতোটা সহজ মনে করা হইতেছে বাস্তবে যে ততোটা সহজ নহে—তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। এই প্রেক্ষাপটেই প্রশাসনের পক্ষ হইতে বলা হইতেছে যে, বিজেএমইএ কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত তথ্য ও ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল মিলাইয়া নিখোঁজদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হইবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা চূড়ান্তকরণে দীর্ঘসূত্রতা লইয়া ভুক্তভোগীদের যতো ক্ষোভ-অসন্তোষই থাকুক প্রশাসনের অবস্থানকে বেঠিক বলিবারও উপায় নাই। কারণ বিষয়টি জটিল শুধু নয়, স্পর্শকাতরও বটে। নিহত ১১৩০ জন পোশাকশ্রমিকের মধ্যে এ পর্যন্ত ৮৩৯ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গিয়াছে। বাদবাকি ২৯১ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি হিসাবে সরকারি উদ্যোগে দাফন করা হইয়াছে। পাশাপাশি, মৃতদেহ হস্তান্তরের সময়ে নির্দোষ কিছু ভুলভ্রান্তিও হইয়াছে। এখন তাহাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার একমাত্র উপায় হইল ডিএনএ পরীক্ষা। সেই জন্য সকলের নমুনাও সংগ্রহ করা হইয়াছে। পরীক্ষাটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ। সেই সাথে তিনশতাধিক স্বজনের ডিএনএ নমুনা মিলাইয়া দেখার ব্যাপার তো আছেই। কিন্তু নিখোঁজ স্বজনের জন্য প্রতীক্ষিত মানুষের ব্যাকুল হূদয়ে এইসব যুক্তি প্রবেশ করিবার কথা নহে। তাহাদের বেদনা গভীরতর। একদিকে স্বজনের খোঁজ নাই, অন্যদিকে মারাত্মক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, অনেকেই হারাইয়াছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। কিন্তু নিখোঁজ ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত না হওয়ায় সেই স্বীকৃতিটুকুও জুটিতেছে না তাহাদের ভাগ্যে। ফলে সর্বপ্রকার সহায়তা প্রাপ্তি হইতেও বঞ্চিত হইতেছেন তাহারা। ইহা সত্য যে, ক্ষতিপূরণ লইয়া পরিচয় লইয়া সংশয় নাই এমন হতাহতদের স্বজনদের মধ্যেও নানা ক্ষোভ-অভিযোগ আছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার হিসাবে স্বীকৃতিটুকু তো অন্তত তাহাদের আছে। নিখোঁজ ব্যক্তিবর্গের শোকাহত স্বজনদের সেই সান্ত্বনাটুকুই বা কোথায়? স্মরণকালের ভয়াবহ এই শিল্পবিপর্যয় মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হইয়াছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারসমূহের পুনর্বাসনে সরকারের আন্তরিকতা লইয়াও কোনো সংশয় নাই। ইতোমধ্যে সাড়ে ৪ শতাধিক নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেওয়া হইয়াছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাহা স্বজনদের হাতে তুলিয়া দিয়াছেন। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরকেও দেওয়া হইবে। আহতদের চিকিত্সা লইয়াও কোনো অভিযোগ শোনা যায় নাই। অঙ্গহীন ও গুরুতর আহতদের উন্নততর চিকিত্সারও উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। নিখোঁজদের স্বজনরাই কেবল ভগ্নহূদয়ে রিক্ত হাতে পথে পথে ছুটিয়া হয়রান হইতেছেন। বাধ্য হইতেছেন মানবেতর জীবন যাপনে। আমরা আশা করি, অতি দ্রুত নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা চূড়ান্ত করা হইবে। সহায়তা ও সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করা হইবে বিপন্ন এই পরিবারগুলির প্রতি।