[ বা জে ট ]
বাজেট অধিবেশনে বিএনপির যোগদান প্রাসঙ্গিক ভাবনা
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৩, ২১:০৮
অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট একনাগাড়ে ৮৩ কার্যদিবস অনুপস্থিত থেকে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গত ৩ জুনে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছে। চলতি অধিবেশনটি নবম সংসদের অষ্টাদশ অধিবেশন, যা বাজেট অধিবেশন নামে সমধিক পরিচিত। জনগণ যে বিরোধী জোটের বাজেট অধিবেশনে যোগদানকে স্বাগত জানাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিএনপি যে বাজেট অধিবেশনে যোগ দেবে তা গত কয়েকদিন যাবত্ দলটির সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছিলো। গত ১৭ মে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ বাজেট অধিবেশনে বিএনপির যোগদানের বিষয়ে বলেন, বিএনপি সংসদে যাবে। তবে তারা কত দিন থাকবে—সেটা নির্ভর করবে সরকারি দলের আচার-আচরণ ও ব্যবহারের ওপর। এদিকে ৩ জুন সংসদ ভবনে বিরোধী দলের সংসদীয় দলের সভায় বাজেট অধিবেশনে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা সংসদে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তা নির্ভর করবে সরকারি দলের সদস্যদের আচার-আচরণের ওপর। তারা আশা করেন, নতুন স্পিকার অতীতের স্পিকারের মতো তাদের কথা বলার সুযোগ হতে বঞ্চিত করবেন না। তারা বিভিন্ন ইস্যুতে ৫০টির মতো মুলতবি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তারা আশা করেন, স্পিকার তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে আলোচনার সুযোগ দেবেন। এর আগে ৩০ এপ্রিল স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের পরদিন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিরোধী দলকে সংসদে যোগ দিতে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর করে তোলার আহবান জানান। তারও আগে ১৮ মে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা যেন কেবলমাত্র সদস্যপদ রক্ষা করতে নয়, বরং প্রস্তাব ও দাবি নিয়ে আলোচনা করতেই সংসদে আসেন। সংসদে এসে উঁকি দিয়ে চলে না যান। সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেন।
বিএনপির বাজেট অধিবেশনে যোগদান এবং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রয়োজন কেন? এক. বাজেট হলো প্রত্যেক অর্থ-বছর সম্পর্কে উক্ত বছরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি, যা জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। সংবিধানে এটি বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নামে অভিহিত। সংবিধানে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিতে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের রূপরেখা উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে বাজেট উপস্থাপন, বাজেটের ওপর আলোচনা, প্রত্যেক মন্ত্রণালয় সম্পর্কে মঞ্জুরি-দাবি ও তার ওপর ভোট গ্রহণ, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট গ্রহণ, বাজেট পাস ইত্যাদি বিষয়ে পদ্ধতির বর্ণনা রয়েছে। মোদ্দা কথা, বাজেটের যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার অধিকার সংসদের রয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট হবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শেষ বাজেট। এ বাজেট নিয়ে কোনো কোন অর্থনীতিবিদ ইতিমধ্যেই বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে এ বাজেট রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নয়। সেখানে অর্থনীতির চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়েরই প্রাধান্য থাকবে। এই বাজেট ভোটমুখী। তাই বাজেট অধিবেশনে উপস্থিত থেকে বিএনপি এ ধরনের অসঙ্গতি জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারে।
দুই. ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ জনগণের সমর্থন লাভের জন্য তাদেরকে অনেক ভালো ভালো প্রতিশ্রুতি দেয়। আওয়ামী লীগের ২৩ দফা নির্বাচনী মেনিফেস্টোর অগ্রাধিকাপ্রাপ্ত পাঁচটি কর্মসূচি হলো—ক. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর দাম কমিয়ে এনে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা; খ. দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; গ. বিদ্যুত্ ও এনার্জি খাতের উন্নয়ন; ঘ. দেশে বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস; এবং ঙ. সুশাসন প্রতিষ্ঠা। ক্ষমতাসীন সরকার গত সাড়ে চার বছরে এসব প্রতিশ্রুতি কোনোটিই সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রধান খাদ্য চালসহ সকল নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী এবং তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে এর ক্ষমতা হ্রাসের উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদে উপস্থাপিত বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার আগে সরকারর অনুমতি নিতে হবে। সুশীল সমাজ ইতিমধ্যেই প্রস্তাবিত এ বিধানের কঠোর সমালোচনা করেছে। গত চার বছরে একাধিকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের অভাবে চলছে লোডশেডিং। লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রীষ্মের গরমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। লোড শেডিংয়ের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ অন্য সব শহরে পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, যা শহরবাসীর জীবনে চরম ভোগান্তি বয়ে নিয়ে এসেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কয়লা নীতি প্রণয়নের কথা থাকলেও এ পর্যন্ত তা করা হয়নি। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য কয়লা সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনেককে বিস্মিত করেছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে পাবলিক সেক্টরে বড় বড় বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন না করে প্রাইভেট সেক্টরে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহবান ছাড়াই ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ছোট ছোট বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনে উত্সাহ প্রদানের মধ্যে তারা গন্ধ পাচ্ছেন। দারিদ্র্য দূরীকরণে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অঙ্গীকার সরকার যে পূরণ করতে পারেনি তা সরকারি দলিলে প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালে দেশে বেকারত্বের হার ছিলো ৪ দশমিক ৩ শতাংশ; ২০১০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে (সূত্রঃ শ্রমশক্তি জরিপ রিপোর্ট ২০০৫-০৬ এবং ২০১০)। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো যথা, ন্যায়পাল নিয়োগ, প্রশাসনকে রাজীতিমুক্তকরণ, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ প্রভৃতির কোনোটি বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থেকে বিএনপি এ সব বিষয় আলোচনার জন্য প্রস্তাব করতে পারে।
এ ছাড়া, জাতীয় সংসদের কার্য-প্রণালী বিধি অনুসরণে বিরোধী দল জন-গুরুত্ব সম্পন্ন বিষয় যথা, রাজধানীতে সভা-মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অব্যবস্থা, সারা দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ইত্যাদির ওপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিবৃতি দাবি করতে পারে। নতুন স্পিকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, বিরোধী দল যদি পুরো বাজেট অধিবেশনে উপস্থিত থাকে, তাহলে তিনি তাদের উত্থাপিত প্রস্তাবাবলী আলোচনার জন্য গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন।
তিন. ২০১২-২০১৩ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অর্জনে ব্যর্থতা, অর্থনীতির প্রাণ কৃষিখাতে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির হার, দারিদ্র্যের হার হ্রাসে প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থতা, সরকারি হিসেব মতে দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পৌনে ৫ কোটি মানুষের মধ্যে আড়াই কোটির বেশি মানুষকে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার আনয়ন ও সংবিধনের নির্দেশনা মোতাবেক প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণে প্রতিশ্রুত সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নে ব্যর্থতা, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণে কোনো প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ না করা ইত্যাদি নিয়ে বিরোধী দল সারা অধিবেশনে উপস্থিত থেকে গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে।
চার. প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অনেক কম আসনে জয়ী হলেও দলটি ৩৩ শতাংশ ভোট পায়, যা আওয়ামী লীগ প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে কমবেশি ৪ শতাংশ কম। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জনগণের চাহিদা, দুঃখকষ্টের কথা সংসদে তুলে ধরা বিএনপির নৈতিক দায়িত্ব। বিএনপি কোনোভাবেই এ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। তাই দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির সংসদ অধিবেশনে যোগদান ও কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
পাঁচ. সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করে। সুতরাং বিএনপি সংসদে তাদের কার্যাবলী দ্বারা জনমনে এ ধারণা সৃষ্টি করতে পারে যে, আগামীতে জনগণের সমর্থনে দলটি সরকার গঠন করলে তা বর্তমান সরকারের চেয়ে ভালো হবে।
সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, বিএনপি দেশের দুইটি বড় দলের একটি। দলটির নেত্রী খালেদা জিয়া তিন মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। জাতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতে বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সম্যক অবহিত আছেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষা ও উন্নয়নে বিএনপির বাজেট অধিবেশনে যোগদান ও কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বিএনপির জনপ্রিয়তা বাড়াবে বৈ কমাবে না।
লেখক :সাবেক সচিব
E-mail: latifm43@gmail.com