সৌর বিদ্যুতে চাঙ্গা গ্রামীণ অর্থনীতি
মুক্তার হোসেন, গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৩, ১৮:২১
রাজশাহীর গোদাগাড়ী চরে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বিদ্যুত্ সুবিধা বঞ্চিত চরের মানুষ কেরোসিনের বদলে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার করার কারণে রাতের বেলায় বেশি সময় দোকান, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খুলে থাকায় বিক্রি বেড়ে গেছে। সে সঙ্গে শিশুরা পড়াশুনা করতে পারছে বেশি করে। ফলে চাঙ্গা হয়ে উঠছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি। ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রুলার ইলেক্ট্রিফিকেশন অ্যান্ড রিনিউয়্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইআরইডি) প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ শক্তি গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলাতুলী ইউনিয়নে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপনের কাজ শুরু করে। পদ্মা নদীর পাড়ের এ চরাঞ্চলে কখনো বিদ্যুত্ সরবরাহ করা সম্ভব হবে না বলেই চরের মানুষ বাড়ি, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আলোকিত করতেই সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নে ৫ হাজার পরিবারের মধ্যে ৩ হাজার পরিবারে এবং ২ শতাধিক দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতাধিক দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপনের মাধ্যমে লাইট জ্বালানোর পাশাপাশি সাদাকালো ১৭ ইঞ্চি টেলিভিশন ও মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুত্ স্থাপন করে কম্পিউটার-ইন্টারনেট ব্যবহূত হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। গ্রামীণ শক্তি গোদাগাড়ী শাখা অফিস সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলে প্রতিমাসে ৪০টি সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপিত হচ্ছে। ব্র্যাক, আবহাওয়াসহ ৩টি কোম্পানি প্রতিমাসে আরো ২০টি সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করছে। চরের মানুষ যাদের সামর্থ্য আছে তারাই সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করে বাড়ি ও দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আলোকিত করছে। চর নওশেরা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত ১২ বছর ধরে বাড়ির ছাউনিতে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করে ঘরে ৭ ওয়াটের ৮টি টিউব লাইট ও একটি ১৭ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন চালাচ্ছে। গরমে ছোট ছোট ২টি ফ্যানও চলছে সৌরবিদ্যুত্ থেকে। বিদ্যুতের চাহিদা মিটে যাওয়ায় তার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে ভালমত লেখাপড়া করতে পেরেছে। সাহেবনগর বাজারের মিষ্টি বিক্রেতা জানান, আগে সন্ধ্যা হওয়া মাত্রই মিষ্টির দোকান বন্ধ করে দিতে হত। সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করে ২টি ৫ ওয়াটের টিউবলাইট জ্বালানোর কারণে রাত ১১টা পর্যন্ত মিষ্টির দোকান খুলে রাখার কারণেই বিক্রি আগের চেয়ে বেড়েছে। চর আষাঢ়িয়াদহ উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শেখার জন্য উপজেলা সদর এলাকায় গিয়ে স্কুল-কলেজে ভর্তি হতো একমাত্র বাড়িতে রাতে আলোর ব্যবস্থা না থাকার কারণে। কিন্তু ২০০২ সালের পর থেকে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করে আলোর ব্যবস্থা হওয়ায় ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে অবস্থান করে চরের স্কুলে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রতিদিন নদী পার হয়ে উপজেলা সদরের কলেজগুলোতে যাচ্ছে। রাতে লেখাপড়া বেশি করতে পারার কারণেই শিক্ষার হারও বেড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণ শক্তি বিভাগের রিজিওনাল ম্যানেজার আবুল কাশেম বলেন, সৌরবিদ্যুত্ ব্যবহারের সুবিধা হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং পরিপূর্ণ বিদ্যুত্ ব্যবস্থা, লোডশেডিং নেই, পড়ালেখার উপযোগী, মাসিক বিল বা জ্বালানি খরচ নেই, পরিবেশ দূষণমুক্ত ও নিরাপদ, কমপক্ষে ২০ বছর নিশ্চিত ব্যবহার করা যায়, প্রয়োজনে সম্পূর্ণ সিস্টেমটি স্থানান্তর করার কারণেই সৌরবিদ্যুতের প্রতি মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দরিদ্র মানুষরা যাতে করে বাড়িতে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট স্থাপন করতে পারে এজন্য সহজ কিস্তিতে সৌরবিদ্যুতের প্লেট, ব্যাটারি, চার্জ কণ্ট্রলার, লাইটসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ সর্বনিম্ন ৯ হাজার ৫শ টাকা ও সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তবে গোদাগাড়ীর চরাঞ্চলে ১২ হাজার ১শ টাকা মূল্যের ও ৪২ হাজার ৭শ টাকা মূল্যের সৌরবিদ্যুত্ সিস্টেম বেশি বিক্রি হচ্ছে। সৌরবিদ্যুত্ সিস্টেম স্থাপনের পূর্বে মোট মূল্যের ২৫ ভাগ অগ্রিম এবং অবশিষ্ট ৭৫ ভাগ মূল্য বার্ষিক ৬ ভাগ (ফ্লাট রেটে) সার্ভিস চার্জসহ ২৪টি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়। মসজিদ-মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে ২৫ ভাগ অগ্রিম টাকা দিয়ে ১২টি মাসিক কিস্তিতে সার্ভিস চার্জ ছাড়াই পরিশোধ করতে হবে। তবে সরকারিভাবে সৌরবিদ্যুত্ সরবরাহ করা গেলে মূল্য অনেক কম হবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর চেয়ে। গোদাগাড়ী বিদ্যুত্ সরবরাহ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চর আষাঢ়িয়াদহ রাস্তার ধারে ৮টি সৌর বিদ্যুত্ চালিত ল্যাম্প পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ৪টি ল্যাম্পপোস্ট অকেজো হয়ে গেছে। বন্ধ হতে চলেছে বাকি ৪টি। এদিকে গোদাগাড়ী চরে বসবাসকারী মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দারিদ্র্যতা বিমোচনে আইরিশ-এইড ও কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের অর্থায়নে বেসরকারি সংস্থা ইউডিপিএস নদী ও জীবন-২ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্প ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের আওতাধীন ১ হাজার ৫শ পরিবারের আর্থিক ক্ষমতায়ন ঘটানোর পাশাপাশি এসব পরিবারের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে বিনামূল্যে সৌরবিদ্যুত্ হারিকেন সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন থেকেই এসব পরিবারের মধ্যে অধিকাংশই পরিবারে সৌরবিদ্যুত্ প্লেট বাড়িতে স্থাপন করে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলের খামারে আলোর ব্যবস্থা করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।