[ বা জে ট ]
বাজেট ২০১৩-১৪ :বাস্তবায়নই সমস্যা
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:০৩
জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী কর্তৃক ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বাজেট পেশ করা হলো। কাজেই জনকল্যাণের পাশাপাশি করারোপের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। গত চার মাসে যে ধরনের অসহিষ্ণুতা ছিল সেটি এখন আবার কমে আসছে। ফলে অর্থনীতির চাকা আবার ঘুরতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের রানা প্লাজার ট্র্যাজেডি পোশাক খাতের জন্য হুমকি সৃষ্টি করলেও আশা করা যায় দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক এ ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। এদিকে ইত্তেফাকের ৭ জুনের রিপোর্টে দেখা যায় যে, নবম জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে ২৫ অক্টোবর। সেদিক বিবেচনায় বর্তমান সরকার সময় পাবেন বাজেট বাস্তবায়নের জন্য পৌনে চার মাস। এই স্বল্প সময়ে বাজেটকে যাতে বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হয় সেজন্য একটি সমন্বিত কর্মসূচি প্রণয়ন করা দরকার। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে রাজনীতিবিদরাই অর্থনৈতিক রূপরেখা দেন। তার ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদরা অন্যদের সহায়তায় সমন্বিতভাবে কর্মসূচি দিয়ে থাকেন। আর বাস্তবায়নের ব্যাপারটি দাঁড়ায় যে সমস্ত মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠানের উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে তাদের উপর। যেহেতু দীর্ঘ সময় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে, এক্ষেত্রে সরকারি আমলাদের ভূমিকা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুখ্য। অনেকেই মনে করছেন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর অতিরিক্ত আরোপ করা হয়েছে। আসলে ষোল কোটি মানুষের দেশে স্বাধীনতার ৪২ বছর পর যেখানে কোটিপতির সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৫০ লক্ষ, সেখানে করের বোঝা বাড়ানো তেমন কিছুই নয়। মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১.৬৭ ট্রিলিয়ন টাকা। আসলে দীর্ঘদিন হয়ে গেলেও এনবিআর কর আদায়ের ক্ষেত্রে তেমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। ঐতিহ্যগতভাবে অবশ্য আমরা কর ফাঁকি দিতে পছন্দ করি, আর এটি বিত্তশালীদের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। কর দেয়ার ক্ষেত্রে বিত্তশালীদের অবস্থা দাঁড়িয়েছে দুই বিঘা জমির মতো। এ কারণেই বিভিন্ন সরকারকে প্রত্যক্ষ করের বদলে পরোক্ষ করের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। অথচ পরোক্ষ করের বোঝা একজন বিত্তহীন যেটুকু বহন করেন, ঠিক ততটুকুই বহন করেন একজন উচ্চবিত্ত। বাংলাদেশের ট্যাক্স/জিডিপি অনুপাত স্বল্প হওয়ায় দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি আগামী দুই মাসের মধ্যে এনবিআরকে ঢেলে সাজানো যায়, কর যারা ফাঁকি দিতে চান তাদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব থেকে কর ঠিকমত পরিশোধ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যায় এবং রাজনৈতিক সংহিসতা না থাকে তবে এই কর আদায় করা মোটেই চ্যালেঞ্জিং নয়। নচেত্ রাজস্ব আদায় ও রাজস্ব ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতি বাড়বে। চলতি অর্থ বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন ৬.০৩%-এর মধ্যে থাকায় কিংবা আরো বাড়লে একটি ভালো কাজ হয়েছে মনে করি। একদিকে যখন বৈশ্বিক মন্দা চলছে, অন্যদিকে আরব স্প্রিং ও অশান্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তারপরও জিডিপির প্রবৃদ্ধি যথাযথ হয়েছে। যদি যথাসময়ে প্রকল্পসমূহে অর্থ বরাদ্দ করা যেত এবং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যেত তবে এই প্রবৃদ্ধি আরো বাড়ানো যেত। উচ্চ প্রবৃদ্ধি যেমন দরকার, তেমনি ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ভারতের মতো ৯% থেকে ৫%-এ নেমে যাওয়া যেন না হয়।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ হচ্ছে ১১.৭%। শিক্ষা খাতে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নসহ বরাদ্দ হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, অনেক প্রাথমিক স্কুলে এখন পড়াশোনা হয় না। শিক্ষকরা নিজেরা যেমন নৈতিক মূল্যবোধের ধারধারেন না, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষাও হয় না। এজন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন তাদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি যারা দায়িত্ব পালন করেন না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
দেশে মূল্যস্ফীতির হার আগামী অর্থ বছরে ৭% রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনী বছর হিসাবে ৭% মূল্যস্ফীতির হার বজায় রাখা একটু কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে বৈকি। এক্ষেত্রে ইনফর্মাল সেক্টর বা আনরেকর্ডেড ইকোনমির উপর গুরুত্ব দেয়া দরকার, যাতে আর্থিক লেনদেন পুরোপুরিভাবে সম্ভব না হলেও যতটুকু পারা যায় ততটুকু নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
আগামী অর্থ বছরে কৃষি খাতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯৫০০ কোটি টাকা। একক খাত হিসাবে এটি সর্বোচ্চ। পাশাপাশি খাদ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৭৫৯ কোটি টাকা। খেয়াল রাখা দরকার, কৃষকদের ভালো করতে যেয়ে আবার যেন ক্ষতি না হয়। কেননা সরকারিভাবে খাদ্যশস্য ক্রয় কমিয়ে দিলে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হবে এবং বর্তমানে কৃষকেরা যে মূল্য পাচ্ছে তার চেয়ে কম মূল্য পাবে। অন্যদিকে কিছু কিছু কৃষিজাত উপকরণের সাবসিডি হ্রাস করা মোটেই যৌক্তিক নয়।
জ্বালানি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭৯৫০ কোটি টাকা। এটির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। কুইক রেন্টাল পদ্ধতি নিয়ে অনেক সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু মধ্যম মেয়াদি পদক্ষেপ হিসাবে কুইক রেন্টাল পদ্ধতি দেশের যে বিদ্যুত্ ঘাটতি ছিল তা সাময়িকভাবে স্বস্তি দিয়েছে। ২০০৬ সালের দিকে বিদ্যুতের যে অব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে উত্তরণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাময়িক সমস্যা সমাধানের জন্য গ্যাসনির্ভর বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু করে স্বস্তি দেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে কুইক রেন্টাল পদ্ধতি চালু করে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। তবে আশা কবরো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসাবে কয়লানির্ভর বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং পারমাণবিক চুল্লীনির্ভর বিদ্যুত্ উত্পাদনের ব্যবস্থার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিবেন। দরকার হলে ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার থেকে বিদ্যুত্ আমদানির ব্যবস্থা নেয়া দরকার। শিল্পায়নের জন্য, কৃষি খাতের জন্য বিদ্যুতের নির্ভরতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বিদ্যুত্ ছাড়া দেশ চলে না। সম্প্রতি খবরে জানা গেল যে, পাকিস্তানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২০ ঘণ্টা বিদ্যুত্ থাকে না। আমাদের দেশ যেন বিদ্যুত্ সংকটের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকে তার জন্য হোলিস্টিক এ্যাপ্রোচ দরকার, যার মধ্যে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়। পারমানবিক চুল্লী স্থাপনের ক্ষেত্রে রাশিয়ার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিতে পারলে ভালো হতো।
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের হার ধরা হয়েছে ৬.৫%। সামরিক খাতে ব্যয় আরো বাড়ানো দরকার। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য সামরিক খাতের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের দিকে গুরুত্বআরোপ করা দরকার। দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী দেশের জন্য গর্বস্বরূপ।
বেশ কিছু পণ্যের দামের উপর কর হ্রাস করা হয়েছে। বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে কেন রিকন্ডিশান গাড়ির উপর শুল্ক হ্রাস করা হলো এটি বোধগম্য নয়। বিদেশ থেকে রিকন্ডিশান গাড়ির মাধ্যমে দেশে জাম্পিং করা হচ্ছে। কোন কোন পরিবারে ২/৪টি পর্যন্ত গাড়ি প্রয়োজন ছাড়াও অপ্রয়োজনে রেখে স্নবারি এফেক্টের মতো রাখা হচ্ছে। এজন্য রিকন্ডিশান গাড়ির উপর কর বৃদ্ধি করা এবং একাধিক গাড়ির মালিক পরিবারের ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধি করা দরকার। পাশাপাশি দেশে গাড়ি তৈরির জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেয়া দরকার। একটু অবাক হয়েছি বিড়ির উপর কেবল কর বাড়ালেও অজ্ঞাত কারণে সিগারেট শিল্পকে সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি জর্দা, গুলসহ ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যের ক্ষেত্রে করের ব্যাপারে নীরবতা হতাশাজনক। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের উপকরণের ক্ষেত্রে শুল্ক অব্যাহতি যথাযথ হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহূত নির্বাপণযন্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। দেশীয় কাগজ শিল্প বাঁচানোর প্রস্তাব যথাযথ হয়েছে। চামড়া শিল্পের উপকরণের শুল্কও হ্রাস করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত যৌক্তিক হয়েছে। আবার জাহাজ শিল্পের বিকাশে সহায়তা প্রদান করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। ওয়েবক্যাম ও জিডিটাল ক্যামেরার শুল্ক হ্রাস করার কোন যৌক্তিকতা নেই।
বর্তমান সরকারের আমলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল দেশে- বিদেশে সেক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে সহিংসতার পাশাপাশি দেশের বাইরে যারা মিথ্যে প্রচারণা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। আবার কুরুচিপূর্ণ ব্লগারদের বিরুদ্ধে ধর্মহীন হোক, মিথ্যে প্রপাগান্ডায় বিশ্বাসী হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
ঘোষিত বাজেটে রেলের জন্য ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। ১৯৮২ সালের পর থেকে রেল খাতকে সংকুচিত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত দেড় বছরে রেল খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। রেল খাতের উন্নয়ন সড়কপথের যানজট এড়াতে সহায়তা করবে। একই সাথে আশা ছিল নৌপথের উন্নয়নে আরো অধিকতর ও দৃঢ়তর পদক্ষেপ পাব। এদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৬৮৫২ কোটি টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ শুরু করা দরকার। ধার করে ঘি খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য পরনির্ভরতা বাদ দিয়ে সারচার্জ, লটারির পাশাপাশি নন- রেসিডেন্ট বাংলাদেশিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা দরকার। বিশ্বব্যাংক প্রণীত নকশাটি ঠিক রেখে পদ্মা সেতু সময় নিয়ে হলেও তৈরি করা দরকার। তবে অর্থমন্ত্রীর সাথে একটি বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করবো বিদেশি ঠিকাদার নয়, দেশের বুয়েটের তত্ত্বাবধানে সরাসরি আমাদের দেশি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে পদ্মা সেতু তৈরির পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ৬.১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রয়োজনে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এ বিষয়ে দক্ষ প্রবাসীকে এনে কাজ দেয়া যেতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ব্যাপারটি পরীক্ষা করে দেখা উচিত। পুঁজি বাজারের উন্নয়ন ছাড়া দেশের শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বিশ্বের প্রায় দেশেই পুঁজি বাজারে অস্থিতিশীলতা হয়ে থাকে। কেবল ডিমিউচুয়ালাইনজেশান করলেই চলবে না। নতুন নতুন ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিবেটিবসের প্রয়োজন রয়েছে। পুঁজি বাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রশিক্ষণের দরকার রয়েছে। যারা পুঁজি বাজারে ব্রোকার হিসাবে কাজ করবেন তাদের মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর অন্তত এক বছর ইন্টার্নি করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। আবার পুঁজি বাজারে ফাইন্যান্সিয়াল এ্যাডভাইজারদের তৈরি করা দরকার।
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে রাজস্ব খাতের পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক বিনিময় হার অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে যুক্ত এবং একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। মুদ্রানীতি ধীরে ধীরে সংকোচনমূলক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলারের উপর আছে, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারও স্থিতিশীল। তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ অযৌক্তিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে স্প্রেড নিচ্ছে। তবে উচ্চ সুদের হার, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের অতিরিক্ত মুনাফা গ্রহণের প্রবণতা দেশের প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ীদের বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুত্সাহিত করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান প্রশংসনীয়ভাবে স্প্রেড কম নেয়ার জন্যে ও সুদের হার কমানোর জন্যে বললেও অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক তা মানছে না। এটি খুবই হতাশাজনক। দেশের উন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে আরো বৃদ্ধি করে ৩০-৩৫% করা দরকার। যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয়ের নির্দেশ অমান্য করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংককে অবৈধ সুবিধা দিচ্ছে বা দেখেও না দেখে চুপ থাকার ভান করছে তাদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারী এ্যাকশান নেয়া দরকার। যে সমস্ত ব্যাংকের প্রফিট মার্জিন বেশি হয় তাদের ক্ষেত্রে Special Inspection বাংলাদেশ ব্যাংকের করা দরকার। কালো টাকা সাদা করার জন্য যে ধরনের প্রভিশন রাখা হয়েছে তা যুক্তিযুক্ত। রিয়েল এস্টেট সেক্টরের পাশাপাশি দেশের শিল্পের অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে ব্যয় করার সুযোগ দেয়া দরকার। অফিসিয়ালী কালো টাকা অনেকেই সাদা করেন না। কিন্তু আনঅফিসিয়ালী দেশের অর্ধেক অর্থনীতির লেনদেন হয় অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায়। আর তাই কাগজে-কলমে সুযোগটি না থাকলে, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ঠিকমত কাজ করতে না পারলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ফর্মাল ও ইনফর্মাল সেক্টরকে সমগুরুত্ব দেয়া উচিত। কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই এবং কর্মসংস্থান হলেই মানুষের মধ্যে আয় প্রবণতা বাড়বে এবং আয় প্রবাহ বাড়লে ভোগ প্রবণতা বাড়বে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেমন বাড়বে তেমনি জীবনযাত্রার মান বাড়বে। গ্রামীণ অবকাঠামো বিনির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি পুরুষ ও নারী উভয় শে ণির শ্রমিকেরা যাতে ন্যায্য মজুরি পায় সেজন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। মহার্ঘ ভাতা দিলে ভাল হতো। এবারের বাজেটে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও জেলা বাজেট ঘোষণা করা হলো। এই ঘোষণার সাথে যেন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি যুক্ত থাকে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা দরকার। ট্যুরিজম সেক্টরে ট্যাক্স হলিডে ও কম কর আরোপের বিষয়টি রাখার দরকার ছিল।
আগামী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭.২%। নির্বাচনী বছর হলেও তিনটি সরকারের আমলে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই বাজেটের বাস্তবায়ন যথাযথভাবে ঘটতে হলে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। টাস্ক ফোর্সে অর্থমন্ত্রী/ অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এনবিআর-এর চেয়ারম্যান, সরকারি ও বেসরকারি দলের প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ, প্রাক্তন সচিব, উচ্চপদস্থ আমলারা যুক্ত থাকতে পারেন। একজন অর্থনীতির চর্চাকারী হিসাবে আমি মনে করি, মোটেই অশোভনীয় আশাবাদের বাজেট নয় বরং চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বাজেটটি বাস্তবায়ন করতে হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। ঘাটতি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দেশের জনকল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি এক্ষেত্রে প্রাধান্য পাওয়া উচিত বলে মনে করি। আসলে রাজস্ব বাজেট যদি উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত করা যায় তবে ভাল হয়। এক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণ ছাড়া ধারাবাহিকতা নষ্ট করা উচিত হবে না।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ০.৬৫ ট্রিলিয়ন টাকা যা জিডিপির ৫.৫%। অন্যদিকে অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১.৫৭ ট্রিলিয়ন টাকা যা অনুন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ১৩.২%। এত বিশাল অনুন্নয়ন ব্যয় মোটেই শোভনীয় নয়। তারপরও প্রতিবন্ধীদের সাহায্য দেয়া, বয়স্ক ভাতা অব্যাহত রাখা ভাল উদ্যোগ। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৫৪% বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে একই সময়ে ৫৫% বাস্তবায়িত হয়েছে। আশা করব, জুলাই মাসের প্রথম থেকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি মাসিক ভিত্তিতে যাতে বাস্তবায়িত হয় সেজন্য অর্থ বরাদ্দ এবং দক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাগত কার্যক্রম প্রয়োজন। একইসাথে দুর্নীতি হ্রাসের ব্যবস্থা আমলতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত ও সাদা ফিতার দৌরাত্ম্য মুক্ত কার্যক্রম বাঞ্ছনীয়।
বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ বিধায় অর্থবছরের শুরু থেকেই তাদের জনকল্যাণমুখী বাজেটের বাস্তবায়ন বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির চলকসমূহ ভাল হবে রাজনৈতিক সহিংসতা এড়ানো গেলে।
লেখক: উপাচার্য ও ডীন, ব্যবসা বিভাগ, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনোমিস্ট
ইমেইল: pipulbd@gmail.com