বাজেট :বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ রহিয়াই গেল
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:১৮
বিশাল ব্যয়ের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবত্সরের বাজেট ঘোষণা করিয়াছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই বাজেট বর্তমান সরকারের পঞ্চম ও শেষ বাজেট। যদিও অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছেন যে, আগামীতেও তাহার দল ক্ষমতায় যাইবে এবং মন্ত্রী না থাকিলেও তিনি বিশেষ একজন হিসাবে থাকিবেন। অর্থমন্ত্রীর এই আশাবাদ যদি স্বপ্ন না হইয়া থাকে, তাহা হইলে বলা যায় বাজেটটি প্রণয়নে তিনি বেশ আন্তরিক ছিলেন। বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়া গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলিয়াছেন, ‘বাস্তবায়নও সম্ভব হইবে’। কিন্তুু কিভাবে- সে প্রশ্নও অমূলক নহে। ইতোমধ্যে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বাজেটের সমালোচনায় মুখর হইয়াছেন। তাহাদের সমালোচনাও অর্থমন্ত্রী করিয়াছেন। যাহা হউক, বাজেট পেশের পর এই সংস্কৃতি আমরা বহুদিন ধরিয়া দেখিয়া আসিতেছি। ইহাও আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি যে, কোন বত্সরই সম্পূর্ণ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নাই।
সঙ্গতকারণেই আগামী অর্থবত্সরের বাজেট বাস্তবায়ন লইয়া সংশয়-সন্দেহ থাকিয়া যায়। কারণ, এত বিশাল ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়া তিনি বাজেট দিয়াছেন তাহা বাস্তবায়ন করিতে হইলে যেই পরিমাণ আয়ের দরকার হইবে, সেটি অর্জন দুরূহ। তিনি ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা মোট ব্যয়ের লক্ষ্য স্থির করিয়াছেন। ইহার মধ্যে মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরিয়াছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এই অংকে ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা ঘাটতি থাকিয়া যায়। যদিও ঘাটতি মিটাইবেন কিভাবে, তাহা তিনি বলিয়াছেন। ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ এবং বৈদেশিক উত্স হইতে ঋণ ও অনুদান গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি অর্থায়ন মোকাবেলা করিবার প্রক্ষেপণ করিয়াছেন তিনি। এখন প্রশ্ন হইতেছে চলতি বত্সরেই যেখানে আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় নাই, সেখানে আগামী অর্থবত্সরে কিভাবে রাজস্ব আদায় বাড়াইবেন। উপরন্তু, নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক ঢামাডোলে আদায় কার্যক্রমে কিছুটা শৈথিল্য আসিতে পারে। সেই ক্ষেত্রে যদি ধরিয়া নেওয়া হয় যে, তিনি ব্যাংক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করিবেন, তাহা হইলে তিনি বেসরকারি খাতে কিভাবে ঋণ জোগাইবেন- এমন প্রশ্ন আসাই যৌক্তিক। আর এই ইস্যুতেই ইহা স্পষ্ট যে, আগামী বাজেটটি বাস্তবায়ন করিবার ক্ষেত্রে অর্থ সংস্থানের চ্যালেঞ্জ থাকিয়া গেল। আর অর্থসংস্থান করিতে না পারিলে বাজেট যথাযথ বাস্তবায়ন হইবে না, এমনটি তো নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
যদিও অর্থমন্ত্রীর আশাবাদ শোনা গিয়াছে, এই ধরনের আশাবাদ সব সময়, সব বাজেট বক্তৃতায়ই আমরা দেখিয়াছি। কিন্তুু বত্সর শেষ হইয়া আসিবামাত্র তাহাদের আশা যেমন বিফলে পর্যবসিত হইয়াছে, তেমনি জনগণ একটি কার্যকর বাজেটের মাধ্যমে দেশের ভাগ্যোন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখিয়াছিল, তাহাও শুধু স্বপ্নই থাকিয়া যায়। আর আগামী বত্সরের বাজেট লইয়া এই ধরনের অনিশ্চয়তা আরও বেশি। কেননা, বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হইয়া গেলে যদি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কোন সরকার দায়িত্ব নেয়, তাহারা রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলিকেই বেশি গুরুত্ব দিবে। যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই সরকারের উপর বর্তাইবে এই বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব। নূতন সরকারের পক্ষে এই বাজেট বাস্তবায়ন লইয়া সংশয় থাকিবে এবং কাটছাঁট করিবে। তাহাতে বাজেটে অর্থমন্ত্রীর ‘কথার ফুলঝুরি’ বাজেট বক্তৃতার বইতেই লিপিবদ্ধ থাকিয়া যাইবে। সেই কারণেই আগামী বত্সরের বাজেটটি হওয়া উচিত ছিল সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক। পরিস্থিতি আঁচ করিয়া ‘ধোঁয়াশাচ্ছন্ন’ বাজেট না দিয়া প্রকৃতই জনগণের উপকারে লাগিতো এমন একটি বাজেট দিলে জাতি উপকৃত হইতো। তথাপি আমরা আশা করিবো বাজেটের সঠিক বাস্তবায়ন হইবে। কে ক্ষমতায় থাকিলো আর কে থাকিলো না, তাহা বড় কথা নহে। জাতীয় অগ্রগতির স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করিবে- তাহাই হইবে যৌক্তিক এবং দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক।