বৃক্ষরোপণ এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:১৯
প্রকৃতিতে এখন রঙের মেলা। গ্রামে গঞ্জে, বন-বাদাড়ে এমনকি ইট-কাঠ-লোহার শহর রাজধানীতেও এই রঙ লেগেছে। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, হিজল, সোনালু (বাঁদরলড়ি) এসব হরেক রকম গাছে এখন নানা রঙের ফুলের সমারোহ। সবুজের মাঝে রঙের এই খেলা প্রকৃতিতে এক ভিন্ন মাত্রিকতা, ভিন্ন আমেজ এনে দিয়েছে। রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকা কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে কারো নজরে পড়বে বর্ণময় এই খেলা।
কিন্তু গুটিকয়েক এলাকা বাদ দিলে রাজধানীতে প্রকৃতির এই রঙের খেলা (মেলা)-য় অপরিকল্পনা, অযত্নের ছাপা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। বিভিন্ন সড়ক, সড়কদ্বীপ, ফুটপাত, রোড ডিভাইডার, উন্মুক্ত স্থান—এসব জায়গায় কী ধরনের বৃক্ষরোপণ করা হবে এ ব্যাপারে কোনো পূর্ব পরিকল্পনা, প্রস্তুতির ছাপ দেখা যায় না রাজধানীতে (এবং অন্যান্য শহরগুলোতে)। যেমন ছোট পরিসরের রোড ডিভাইডারে বৃহত্ আকৃতির গাছপালা লাগানো উচিত নয়। কারণ ঐ গাছের চারাটির বৃদ্ধির জন্য যে জায়গা প্রয়োজন হবে তা পাওয়া যাবে না ডিভাইডারে। অথচ দেখা যাচ্ছে অপরিসর রোড ডিভাইডারে রোপণ করা হয়েছে আম, কাঁঠাল, বকুল, দেবদারু এমনকি বট, রেইন ট্রি-র মতো বৃহত্ আকৃতির বৃক্ষ; যা অদূরদর্শিতা, অবৈজ্ঞানিক জ্ঞানেরই বহিঃপ্রকাশ। এমন দৃশ্য লক্ষ করা যাবে খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে শাহজাহানপুর হয়ে রাজারবাগে যে সড়কটি এসেছে এর ডিভাইডারে। আরেকটি বিষয় খুবই দৃষ্টিকটু যে, গাছপালার কোনো চিহ্ন নেই (এক সময় হয়তো বা কোনো চারা রোপিত হয়েছিল) অথচ দামি ইট দিয়ে বেষ্টনী বানানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউ, বঙ্গভবনের সামনের রাস্তায় এ দৃশ্য চোখে পড়ে। এতে আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি প্রকৃতির বিশ্বস্ত উপাদান বৃক্ষের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক যে, ফুটপাতে রাস্তায় কোন স্থানে কোন ধরনের বৃক্ষ রোপণ করা হবে তা অভিজ্ঞদের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ফুটপাত যেমন অবৈধ দখলদারদের আয়ত্তে চলে গেছে, তেমনি ফুটপাত বা সড়কে বৃক্ষরোপণের দায়িত্বটাও যেন তারাই পালন করছে। আর এক্ষেত্রে তারা তাদের ব্যবসায়িক সুবিধাটাই বিচার করছে। যেমন খোলা আকাশের প্রচণ্ড রোদে ছায়া পাবার জন্যে তারা ফুটপাতে পুঁতে দিচ্ছে বটের ডাল/ চারা। বছর পেরোতে না পেরোতেই মহীরূহ হয়ে পুরো ফুটপাত দখল করে নিচ্ছে বৃক্ষটি। হকাররা এর ছায়ায় দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ বায়তুল মোকাররমের উত্তর পাশের ফুটপাত।
রাজধানীবাসীর স্বপ্নের হাতিরঝিল প্রকল্পের সমাপ্তির পর জনগণের জন্যে উন্মুক্ত হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে। নাগরিকজীবনে এ প্রকল্প এক আশীর্বাদ। কিন্তু প্রচুর অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের বৃক্ষরোপণের বিষয়টি রয়ে গেছে অবহেলিত। এই ঝিলের আশেপাশে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে এক নৈসর্গিক আবহ তৈরির যে সম্ভাবনা ছিল তা যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা হয়েছে। কারণ এই প্রকল্পে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে বৃক্ষ চয়ন, রোপণ, পরিচর্যার ক্ষেত্রে অপরিকল্পনার বিষয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এই ঝিলের পাড়ে কী ধরনের বৃক্ষরোপণ করা হবে এ ব্যাপারে কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলেই ধারণা করা যায়। কেননা একটি চারা থেকে আরেকটি চারার দূরত্ব কত হবে তা গ্রামের কৃষকও জানেন, অথচ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে যেন অনভিজ্ঞ। অথবা তাদের মতামত/ নির্দেশ রোপণকারী কর্মচারী/ ঠিকাদার বা তাদের শ্রমিক পালন করেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রোপিত নারকেল চারার মধ্যবর্তী দূরত্ব খুবই কম। এদের মাঝে আবার চালতা বা অন্য কোনো গাছের চারা রোপিত হয়েছে। সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে ইস্কাটনের বিয়াম স্কুলের পাশে ঝিলের পাড়ে দাঁড়ালেই এ কর্মকাণ্ড চোখে পড়বে।
ফুটপাতে রোপিত গাছগুলো এমনিতেই মাটির সংস্পর্শ কম পায়। তার ওপর আবার এদের যেন গলা টিপে ধরা হয় ইট, পাথর আর সিমেন্টের ঢালাইয়ের মাধ্যমে। অথচ যখন ফুটপাতে ঢালাই কাজ চলে অথবা ইট বিছানো হয় তখন গাছের গোড়ায় পরিমাণমতো ফাঁক রাখলে গাছটি সহজে বাড়তে পারে, মোটা হতে পারে, বৃষ্টির পানি গোড়ায় ঢুকতে পারে। এ দিকটি দেখার, তদারকির যেন কেউ নেই। এছাড়াও মাটিতে গজানো সবুজ ঘাস নিড়ানি দিয়ে উঠিয়ে নেওয়া হয়। ঘাস থাকলে মাটিতে আর্দ্রতা থাকে, ধুলোবালি কম হয়। মাটিতে গাছের জন্যে প্রয়োজনীয় রস থাকে। আর গাছে পেরেক ঠোকার প্রসঙ্গটি যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া ভ্রমণে গিয়েছিলাম। রাজধানী কুয়ালালামপুরে তো বটেই, রাজধানী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের হাইওয়ের দু’পাশের রাস্তায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে, হচ্ছে। জেনটিং হাইল্যান্ডে যেতে যেতে চোখে পড়বে পাহাড়ের পাদদেশে বৃক্ষরোপণের পরকল্পিত কারুকাজ। রাস্তার বিভিন্ন অংশকে নাম্বারিং করে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে এবং এক এক অংশে এক এক ধরনের গাছপালা লাগানো হয়েছে। রাস্তার পাশ দিয়ে পাতাবাহার জাতীয় গাছ, ওপরের দিকে পাহাড়ে বৃহত্ আকৃতির গাছ। এসব বৃক্ষরোপণ পরিবেশকে করেছে আরো মোহনীয়, আকর্ষণীয়।
চীনের রাজধানী বেইজিং-এর রাস্তায় লক্ষ করেছি রঙ-বেরঙের পিটুনিয়া ফুলের সমারোহ। বৃষ্টিতে এসব নরম ফুলের পাপড়ি নেতিয়ে পড়লেও রোদে চকচক করে ওঠে যেন পথচারীদের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে। রোড ডিভাইডারে রোপিত কলম চারার জীবন রক্ষার জন্য সে কী প্রাণান্তকর চেষ্টা—খুঁটি দিয়ে, পলিথিনের শেড দিয়ে, নিয়মিত জল সিঞ্চন করে।
অথচ আমাদের দেশে, শহরে কিংবা গ্রামে, বৃক্ষরোপণ বলতে মেহগিনি, দেবদারু, নিম, শিশু, রেইন ট্রি, ইউক্যালিপটাস এসবকেই বোঝায়। এসব থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না। প্রকৃতিতে বিদেশি বৃক্ষের যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সে বিষয়টি আমরা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি। বৃক্ষের ফলের ওপর পাখিদের নির্ভরতার দিকটি অবজ্ঞা করছি। আর একবার কোনো স্থানে কোনো একটি বৃক্ষের বীজ, চারা বা কলম রোপিত হলে তা বড় আকার ধারণ করলে তা কাটা, উত্পাটন করা সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরাধ।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করে আসুন আমরা এই বৃক্ষরোপণের সময়ে আরো সজাগ হই। আমরা যেন—
দেশীয় বৃক্ষরোপণের প্রতি নজর দেই
পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করি
বৃক্ষরোপণের নামে অর্থের অপচয় না করি।
আমাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ হয়ে উঠুক পত্রপুষ্পশোভিত একটি দেশ।
ঢাকা