দোষীদের শাস্তি হয় না বঞ্চিত হয় যোগ্যরা

সরকারি ও আধা-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ থেকে শুরু করে বিসিএস পরীক্ষা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা—কোনটিতেই জালিয়াতির সুযোগ ছাড়ছে না দুষ্টচক্র। বিভিন্ন কায়দায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশে নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এবং পেশাদার জালিয়াত চক্র মিলে প্রশ্ন ফাঁস করছে অনেক বছর ধরেই। প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অধিকাংশ সময়ই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না। আবার অনেক সময় তদন্ত কমিটিই গঠিত হয় না। ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগ দেয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রশ্ন ফাঁস কিংবা পরীক্ষার্থীকে অসদুপায় অবলম্বনে সহযোগিতা করে বিপুল অংকের টাকা আয় করে জালিয়াত চক্র। এমনকি ‘প্রশ্ন ফাঁসের ভুয়া আওয়াজ’ তুলেও তারা হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। প্রতিটি জালিয়াতির ঘটনার সাথে সরকার দলীয় কিছু লোকের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু কাউকেই শাস্তির আওতায় আনা যায় না। গত ৩১ মে অগ্রণী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা ‘পরিষ্কার ও নিশ্চিত’ হলেও গতকাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকেই নিয়োগ সম্পন্ন করতে ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষীয় একটি অংশ চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ৩৪ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়, পিএসসি, দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রথম আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায়। এরপর ১৯৯১ ও ১৯৯৭ সালে এসএসসি পরীক্ষারই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তখনো কারো কোন শাস্তি হয়নি। ১৯৯৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে ভোলার একটি কেন্দ্র থেকে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু কারো শাস্তি হয়নি। দেশের নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা শুরু হয় ২০০৩ সাল থেকে। ওই বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা, ডিগ্রি পরীক্ষা, সমবায় অধিদপ্তরের পরিদর্শক নিয়োগ পরীক্ষা, সাব-রেজিস্ট্রার পদে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা এবং পুলিশের এসআই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০০৪ সালে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, ২০০৫ সালে ২৫তম বিসিএস-এর লিখিত এবং ২৭তম বিসিএস-এর প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ২৭তম বিসিএস পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন আন্দোলন করে। প্রায় দশটি রিট আবেদন করে প্রার্থীরা। পরে ঐ পরীক্ষার ফল (আংশিক) বাতিলও হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের চিত্র সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের অক্টোবরে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার আবশ্যিক নয়টি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় গত ৬ অক্টোবর পিএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে। কিন্তু এর আগেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। তখন প্রশ্নের সেট ৩ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। একই বছরের ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ওই বছরের ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীক্ষা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। ওই বছরের ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। গত বছরের ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কয়েকটি চক্র এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ওই বছরই ২৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের নার্সিং ইউনিটের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ফাঁসের কৌশল বদলেছে গোয়েন্দা সূত্র এবং চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশ জানায়, আগে পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তা আগ্রহীদের কাছে বিক্রি করা হত। কিন্তু এ কৌশল সম্প্রতি অকেজো হয়ে পড়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর ফাঁস হয়ে যায়। ফলে এখন পরীক্ষা অনুষ্ঠানের শেষ দিন কিংবা আগের দিন প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বাজারে আনে জালিয়াতরা। কিন্তু গণহারে তা বণ্টন না করে বিশ্বস্ত আগ্রহীদের কাছে পরীক্ষার আগে ওই প্রশ্ন পৌঁছে দেয়া হবে বলে আগে থেকে চুক্তি করে। এক্ষেত্রে পরীক্ষার আগে তারা আগ্রহী প্রার্থীদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র ও উত্তর দিয়ে ওই প্রার্থীকে পড়তে বলে। পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগ পর্যন্ত ওই প্রার্থীরা জালিয়াতচক্রের অধীনেই থাকে। আবার ফাঁসকৃত প্রশ্নপত্র হাতে লিখে উত্তরসহ পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা আগে আগ্রহী ও বিশ্বস্ত প্রার্থীদের কাছে হস্তান্তর করে দুষ্কৃতকারীচক্র। এজন্য আগে থেকেই তারা আগ্রহীদের সাথে যোগাযোগ করে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে মডেল টেস্ট আকারেও তা বিক্রি করে জালিয়াতরা। পরীক্ষার আগে কয়েক দফায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়িয়ে দিয়ে ভুয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করে তারা। পরে নিজেদের সুবিধামত আসল প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বাজারে ছাড়ে তারা। এছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষার হলে ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও নানা কৌশলে তা ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তর সরবরাহের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা। আইনের প্রয়োগ নেই, তাই বেপরোয়া ওরা প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড। পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নম্বর ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রণয়নের পর বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ৭০ বারের বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও শাস্তির নজির নেই। তদন্ত হয়েছে মাত্র ৩৩টির। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতিটি ঘটনায়। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পিএসসি এবং বিজি প্রেসের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এরপর অনেকবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। ২০১০ সালে মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর বিজি প্রেসের গোপনীয় শাখার শৃঙ্খলা ও ত্রুটি দূর করতে ১৩টি সুপারিশ করে সেই সময়ের তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না নিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলো। হতাশ-ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পর হতাশা ও দুর্ভোগ বাড়ে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের। দুর্ভোগের উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশনস সিস্টেমস বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থী মো. ইব্রাহিম খান বলেন, ‘আমাদের সাধারণত অনেক চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। চাকরির আবেদন ও যাতায়াত বাবদ অনেক খরচ। এছাড়া দীর্ঘদিনের পড়শোনা ও প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার হলে যাই। কিন্তু হলে গিয়ে যখন জানতে পারি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অযোগ্যরা ও টাকাওয়ালারা চাকরির সুযোগ পাবে তখন হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়া আমাদের কিছুই করার থাকে না।’ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রতিবার চাকরির আবেদন আর যাতায়াত বাবদ যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা জোগাড় করা একজন বেকারের জন্য কষ্টসাধ্য। অথচ অনেক বছরই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সত্যতা এমন সময় পাওয়া যায় যে ততক্ষণে হয়তো পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছে চলে গেছে। এ প্রসঙ্গে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)-এর চেয়ারম্যান এ টি আহমেদুল কবির বলেন, ‘বিভিন্ন চাকরির আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো গুজব বলে প্রমাণিত হয়। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা একেবারেই ঘটেনি এমনটা দাবি করা যায় না। অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান চালাই। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করি।’ তিনি বলেন, ‘পিএসসির অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এখন শূন্যের কোঠায়। আমরা সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। বিভিন্ন সময় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ থেকে নতুন ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।