বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

একটাই ঝুঁকি :রাজনৈতিক অস্থিরতা

ঘোষিত ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, সব বাজেটই উচ্চাভিলাষী এবং জনতুষ্টির। আগামী বাজেট বাস্তবায়নে একটাই ঝুঁকি রয়েছে। আর তা হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী, সন্ত্রাসী, জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের ফলে অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন অর্থমন্ত্রী। রাজস্ব আদায়ে উচ্চাভিলাষ রয়েছে তবে এ লক্ষ্যও বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করেন তিনি। একইসাথে জরিমানা দিয়ে যেকোন খাতে কালো টাকা সাদা করা যাবে বলেও জানান তিনি। সাংবাদিক সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার বীর উত্তম, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. এস এ সামাদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, পরিকল্পনা সচিব ভুঁইয়া শফিকুল ইসলাম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রঞ্জিত কুমার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বক্তব্য রাখেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের পূর্ব সময়ের বাজেটকে অনেকেই বিশাল, ঋণ নির্ভর, ভোটের বাজেট, জনতুষ্টির বাজেট, উচ্চাভিলাষী বলে থাকেন। কিন্তু আমি বলবো সরকারের দেয়া সব বাজেটই জনতুষ্টির এবং উচ্চাভিলাষী।’ বাজেটে ব্যয়ের পরিকল্পনা স্বচ্ছ নয় এমন সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যয়ের পরিকল্পনা আগের বাজেটগুলোতে যেমন ছিলো এখনও তেমন রয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের আবাসন খাতে বিপর্যয় ঘটেছিলো; তাই এ খাতে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে আবাসন খাতও একটি উত্পাদনশীল খাত। উন্নত বিশ্বের আবাসন খাতের প্রতি অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়েছে। অপ্রদর্শিত আয়ে যে করহার প্রযোজ্য তার সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে তা বিনিয়োগ বা বৈধ করা যাবে। বিশেষ সুযোগ হিসাবে এবার এলাকাভেদে ফ্ল্যাট অথবা প্লট কিনতে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে। গতকাল অর্থমন্ত্রী বলেছেন, শুধু আবাসন নয়, যেকোনো খাতে জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যাবে। তিনি আরো বলেন, কালো টাকা অবিচার করে আদায় করা যায় না। অর্থনৈতিক কৌশলের মাধ্যমেই তা আদায় করতে হবে। বৃহস্পতিবার ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এটিও অর্জনযোগ্য বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী এবং গভর্নর ড. আতিউর রহমান। গভর্নর তার বক্তব্যে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলো আগের চেয়ে অনেক ভালো রয়েছে দাবি করে বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে এবং আসছে অর্থবছরে আর্থিক ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে বেঁধে রাখা যাবে। এই বাজেট তিনটি সরকারের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন হবে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। তিন সরকার নয়, দুই সরকার এই বাজেট বাস্তবায়ন করবে। কারণ অন্তর্বর্তী যে সরকার থাকবে তাতে আমাদেরই প্রাধান্য থাকবে।’ বাজেটের অর্থায়ন নির্বাচনের বছরে বাজেটের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয়ের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থায়নের ব্যবস্থা নেই-এমন মন্তব্য ভ্রান্তিমূলক। বিদেশি সাহায্য অন্যবারের তুলনায় বেশি ধরা হয়েছে, কারণ এ বছর সাহায্য আসার পরিমাণ অনেক বেড়েছে। আগামী বছর আরো বাড়বে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত ৫ বছরে সরকার যে রাজস্ব আদায় করে দেখিয়েছে, গত ৩০ বছরেও তা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মোবাইল ফোনের সিমকার্ড আমদানিতে শুল্ক বেশি হওয়ায় বাজারে একটি কোম্পানির মনোপলি সৃষ্টি করেছে, এমন মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সিমকার্ডে কর কমানোর উদ্দেশ্য হলো এই মনোপলি ভাঙ্গা, যাতে অন্য প্রতিষ্ঠানরাও সমান সুযোগ পায়। গ্রামীণফোনের উপর কর বেশি ধার্য করা হয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর বৈষম্য বিলোপ করার জন্যই কর্পোরেট করের পার্থক্য কমিয়ে আনা হয়েছে। আসছে বাজেটে তাই কর্পোরেট কর ৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৩৪০ কোটি টাকার কাজ হয়ে গেছে। জাজিরা এলাকায় এপ্রোচ সড়ক ও নদী শাসনের কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পূর্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি হতো, আগের সরকারের সময়ে কোন বড় টেন্ডার হয়নি। কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে নিম্ন পর্যায়ে কিছু দুর্নীতি রয়েছে স্বীকার করেন তিনি। ৬ মাসে অনেককিছু সম্ভব বাজেট বাস্তবায়নে বর্তমান মেয়াদের সরকার সময় পাবে প্রায় ৬ মাস। এ সময়ে কতটুকু বাজেট বাস্তবায়ন করা সম্ভব, এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ৬ মাসে অনেককিছু করা সম্ভব। অন্তত কাজের পরিকল্পনাগুলো ভালোভাবে করা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভর্তুকি অর্থমন্ত্রী বলেন, এবার কৃষি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা এবং বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়ার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে যা মোটেই বড় নয়। মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৫ ভাগেরও কম টাকা ভর্তুকি থাকছে। ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ গ্রহণের বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব রঞ্জিত কুমার জানান, সরকারের প্রয়োজন না হলে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করবে না। চলতি অর্থবছরে যে পরিমাণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো এখনও তা অতিক্রম করেনি। তাছাড়া আগামী অর্থবছরেও তেমন কোন প্রভাব পড়বে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। সস্তা দামে নিউজপ্রিন্ট আমদানির কোন মানে হয় না নিউজপ্রিন্টের কর রেয়াত সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করায় সংবাদ পত্র শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ দশমিক ২ লাখ মেট্রিক টন নিউজপ্রিন্ট কাগজ উত্পাদন হয়। অন্যদিকে সংবাদ পত্র শিল্পে প্রয়োজন হয় মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন। তাই বিদেশ থেকে এতো সস্তা দামে নিউজপ্রিন্ট আমদানির কোন মানে হয় না বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাজেটে ব্যর্থতা বাজেটের বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে আশাবাদী হলেও এর ব্যর্থতা স্বীকার করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সব সময়কালেই বাজেটের পূর্ণাঙ্গ ব্যয় করার একটি চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে বিভিন্ন চাপ রয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে চাপের সম্মুখীন হই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমি পূর্বে সিএনজি ও পেট্রোলের দাম সমান করার কথা বলেছি, সেখানেও চাপের সম্মুখীন হয়েছি। সরকারি বেসরকারি অংশিদারিত্ব (পিপিপি) বাস্তবায়নের কথা বললেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত কল কারখানাগুলোর লোকসান কমিয়ে আনার চেষ্টা করেছি কিন্তু সেখানেও ‘কম্প্রোমাইজ’ করতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ‘অশোভন’ শব্দটি ঠিক হয়নি অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন, আমি আশিতে পদার্পণ করেছি, জীবনের হতাশা ও সাফল্যের দোলাচলে বারবার নিক্ষিপ্ত হয়েছি। তবে সর্বদাই আমি ঘনঘটার মধ্যে শান্তি দেখেছি। মেঘের আড়ালে রূপালী নয় সোনালী রেখা দেখেছি। আমি আসলেই কর্মশক্তি পাই আমার প্রবল তথা ‘অশোভনীয়’ আশাবাদে। এ বক্তব্য বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, শব্দটি হওয়া উচিত ছিলো ‘অসম্ভব’ আশাবাদ। ‘তবে আমার মতো স্বভাব সুলভ আত্মতৃপ্ত লোক কমই আছে’ উল্লেখ করেন তিনি। আমার অশোভন আশাবাদ নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছে সেটি ‘ভুল সামালোচনা’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিদ্যুত্ খাত বিদ্যুত্ খাতের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় ৫ বছরে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলো। আগামী ডিসেম্বরে ক্ষমতার শেষ সময়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ ৯ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ গুলোতে উচ্চ ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করায় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২ থেকে ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার বক্তব্যে অতীত সরকারের দুর্নীতির সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে ‘বন্ধক’ দেয়ার যে রীতি পূর্বে চালু ছিলো তা মহাজোট সরকার ভেঙ্গেছে এবং দিন বদলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন, চক্রান্তের পথ থেকে গণতন্ত্রের পথে আসুন।