প্রচারণায় এগিয়ে খালেক মনির পক্ষে মাঠে লোক কম

যতই দিন যাচ্ছে ততই খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনের সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে ভোট যুদ্ধে তিন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী ও সদ্য সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। প্রচারণায় দ্বিতীয় অবস্থানে বিএনপি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন জাতীয় পার্টি (এ) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু। দলীয় সূত্র ও সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ‘বাড়ি বাড়ি’ প্রচারণা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের। খালেকের পক্ষে মাঠে কাজ করছে আওয়ামী লীগ, ১৪ দল, সম্মিলিতি নাগরিক কমিটি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও ভ্যান শ্রমিক লীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। অনেক এলাকায় দেখা গেছে, ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি ও নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু গণসংযোগ করে যাওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে সেখানে যাচ্ছেন খালেকের ২৫-৩০ জন সমর্থক। তারা ভোটারদের কাছে গত পাঁচ বছরের খালেকের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। এছাড়াও খালেকের পক্ষে প্রতিদিন ৩-৪টি টিম পর্যায়ক্রমে একই বাড়িতে যাচ্ছেন। মহিলারাও দলে দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন। এছাড়া খালেকের পক্ষে জোরেসোরে মাঠে কাজ করছেন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ ও শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তাছাড়া প্রচার-প্রচারণায় প্রতিদিন খালেকের পক্ষে ১০-১২টি করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি আসছে পত্রিকা অফিসে। অপরদিকে খালেকের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে ভোট চেয়ে প্রচার-প্রচারণা চলছে ধীরগতিতে। তার পক্ষে ভোট চাইতে বিএনপির কেন্দ্র থেকে বড় ধরনের কোন নেতাকে মাঠে দেখা যায়নি। মনির গণসংযোগ ছাড়া যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিকদল, কৃষকদলের গণসংযোগের কোন প্রেস বিজ্ঞপ্তিও পত্রিকা অফিসগুলোতে আসছে না। সূত্র জানায়, মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির নির্বাচন ফান্ডেও তেমন টাকা নেই। প্রতিদিন তার সাথে যারা গণসংযোগ করছেন তাদের বেশিরভাগই নিজেদের খরচে সকাল ও দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, শুধু মাত্র টাকার অভাবে দলের প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাজে লাগানো যাচ্ছে না । একেকটি ওয়ার্ডে অনেক পাড়া-মহল্লা রয়েছে। এসব পাড়া-মহল্লায় কাজ করার জন্য দশ জনের দুটি টিম কাজ করলে তাদের সারাদিনে ন্যূনতম একটি পারিশ্রমিক দিতে হয়। সেটির যোগান দিতে পারছেন না মনি। মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলে অনেক কোটিপতি নেতা আছেন যারা বড় বড় পদ আঁকড়ে ধরে আছেন। কোন আন্দোলন-সংগ্রামে তাদেরকে দেখা যায় না। তারা মনির প্রচারণা জোরদারে অবদান রাখতে পারেন। তালুকদার আব্দুল খালেকের পক্ষে ১৪ দলের নেতারা মাঠ কাঁপিয়ে তুললেও মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে ১৮ দলের শরীক জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদেরকে এখনও মাঠে দেখা যায়নি। সূত্রমতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মাঠে নামলে ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেত। কিন্তু বিএনপি তাদেরকে এখনও মাঠে নামাতে পারেনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে মনিরুজ্জামান মনির নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে দলের মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ধারণা করছেন। সূত্র জানায়, দলীয় ফান্ড না থাকায় শতভাগ প্রচার-প্রচারণা না হওয়া, ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে জামায়াতের সাথে সমঝোতা না হওয়া, বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে বিএনপির একাধিক প্রার্থী, দলীয় অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলাদাভাবে কাজ না করা, কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতি না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ভোট যুদ্ধে মনিরুজ্জামান মনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে না পারলে মনির পরাজয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা চালাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সমস্যা রয়েছে। তাই তারা সরাসরি মাঠে নামতে পারছে না। এদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধুর প্রচারণা চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। তার সঙ্গে প্রচারণায় শুধু জাপা কর্মীরাই অংশগ্রহণ করছেন। সাধারণ মানুষকে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। নতুন প্রজন্মের ৪১ হাজার ও ৩০ হাজার উর্দুভাষীর ভোট খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে আটকেপড়া পাকিস্তানিদের প্রায় ৩০ হাজার ভোটার এবং নতুন প্রজন্মের ৪১ হাজার ভোটার জয়-পরাজয়ে বড় ধরনের ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে। উর্দুভাষী ও নতুন মিলে ৮১ হাজার ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তাই তিন মেয়র প্রার্থী নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছে ছুটছেন। অধিকাংশ উর্দুভাষী ভোটারের সমর্থন পাচ্ছেন ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি এবং নতুন ভোটারের পাল্লা ভারী সম্মিলিত নাগরিক কমিটির মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের দিকে। আবার উর্দুভাষী ও নতুন ভোটারদের কাছে টানতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টি (জাপা) সমর্থিত নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু, অনেকটা সফলকামও হয়েছেন। স্থানীয় রিটার্নিং অফিসারের অফিস সূত্র জানায়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এবার ৪ লাখ ৪০ হাজার ৬৫৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। কেসিসি’র গত নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৫৮ জন। অর্থাত্ গতবারের তুলনায় এবার ভোটার বেড়েছে ৪১ হাজার ২৯৮ জন। যার অধিকাংশই নতুন প্রজন্মের ভোটার।