শিক্ষা কোন পণ্য নয়, জ্ঞানের বিষয়

যে কৃষক রাজা হলে ভাত গুড় দিয়ে খাবে বলেছিলো, আমি তার মত নই। তবু রাজসম্মান-এর লোভের আশা আমার নেই তা বলবো না। আর এ কথা যে অস্বীকার করে যে সত্য বলে না, মিথ্যা বলে। মানুষ মাত্রই ভুলে ভরা-এ কথাও অনেকে অস্বীকার করতে চায়, ভুলেই মানুষ, ভুল তার পায়ে পায়ে, আর এটাই চিরন্তর সত্য ও বাস্তব। আমি কোন তাত্ত্বিক কিংবা পন্ডিত ব্যক্তি নই। তাতেও কোন আফসোস নেই। বাংলাদেশের বিখ্যাত তালিকায় আমার নামটি নেই। তাতেও কোন আফসোস নেই। আমি স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখতেও পছন্দ করি। স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশের বিখ্যাতদের তালিকায় একদিন আমার নামটিও আসবে। স্বপ্ন দেখা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। ইচ্ছে করলেই আমি যে কোন স্বপ্ন দেখতে পারি। আমার আর স্বপ্নগুলোই বাস্তব হয়। তাই আমার স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে। আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে আমার গুরু শ্রী দীপঙ্কর স্যার। তাঁর কারণেই আমার স্বপ্নগুলো রঙীন। আমি ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্ন দেখি না। বসে বসে বা দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত আমি। এইচএসসি পাসের পর মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়ে যখন অর্থনৈতিক কারণসহ অন্যান্য কারণে ভর্তি হতে পারিনি, হতাশায় ভুগছিলাম, জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে পারছিলাম না, তখন আলোর দিশারী হয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ান সেই দীপঙ্কর স্যার। তাঁর সহযোগিতা ও কল্যাণে আজ আমি এই অবস্থানে দাঁড়িয়েছি। অনিশ্চিত ভ্রমণ আমার সব সময় প্রিয় গন্তব্য। আমি আমার জীবনকে অভিশপ্ত মনে করতাম, আমি জানতাম না আমার অভিশপ্ত জীবন শেষ পর্যন্ত আমাকে কোথায় দাঁড় করাবে। যেই মানুষটি আমাকে হতাশা থেকে মুক্তি দিয়েছে, সুন্দরভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে, সেই দীপঙ্কর স্যারকে উত্সর্গ করে আমার লেখা শুরু করলাম। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। এই দায়িত্ব ঠিক রাখার দায়িত্ব শিক্ষকদের, অথচ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বা টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রায়শই যখন দেখতে ও জানতে পারি যে, শিক্ষকরা এখনো অবহেলিত তখন সৈয়দ মুজতবা আলীর পণ্ডিত মহাশয়ের কথা মনে পড়ে যায়, যার মাসিক বেতন ছিল লাট সাহেবের তিন পা- ওয়ালা কুকুরের একটি পায়ের খরচের সমান। বর্তমান সময়েও সকলেরই আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু কোন পরিবর্তন হয়নি কেবল শিক্ষকদের। শিক্ষক যা পড়ান তাই শিক্ষাদান। শ্রীলঙ্কায় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর আমাদের দেশের বাজেট প্রণয়নের সময় সর্বনিম্ন বরাদ্দ খাতে শিক্ষা খাতে। এটা আমাদের দেশে স্বাভাবিক। একটা সময় বিদ্যালাভ করা ছিল বড়লোকদের, এখন শিক্ষা আর কতিপয় বড় লোকের বিশেষ অধিকার নয়। শিক্ষা মানে এখন জনগণের শিক্ষা। শিক্ষার স্ট্যান্ডার্ড মানে জ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড, মিডিয়ামের স্ট্যান্ডার্ড নয়। ইংরেজি শিক্ষা দিলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না। যারা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে ইংরেজি মিডিয়ামে ছেলেমেয়েদের বাল্যশিক্ষা শুরু করিয়ে ভাবছেন যে, সন্তানদের শিক্ষার ভবিষ্যত্ উজ্জ্বল করেছেন তারা আসলে ওদের ভবিষ্যত্টা অন্ধকার করেছেন। ওদের বাংলা সম্পর্কে জানতে হবে। ইংরেজি ভাষা শিক্ষার আমি বিরোধিতা করছি না। বিদেশি ভাষা শিক্ষা নিশ্চয়ই দরকার। সব সভ্য জাতিই তা করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে দুনিয়া আর আগের মত বিচ্ছিন্ন নয়। আকারেও অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও অনেক সহজ হয়েছে। আরও সহজ হবে। কারিগর কেন অবহেলায় দিন কাটাবে। এর উত্তর কোথায় পাবো, কেউ বলবে কি? আমার বাপ-চাচাদের কাছ থেকে শুনেছি, আগে অবিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে বলতেন, ‘স্যার ওকে দিয়ে গেলাম মানুষ করে দিবেন। কোন উল্টাপাল্টা করলে গায়ের চামড়া তুলে নিবেন অথবা হাড়গোড় বাড়িতে পাঠিয়ে দিবেন’ ইত্যাদি। অথচ বর্তমান সময়ে বাচ্চাকে ধমক দিলে উল্টা জিজ্ঞাস করে কেন তাঁর বাচ্চাকে ধমক দেয়া হল ইত্যাদি জাতীয় কথা। শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থা এমন যে, ছাত্রদের শিক্ষাটা দিবেন তারাই কিন্তু কি শিক্ষা দিবেন সেটা ঠিক করে দিবেন ছাত্রের বাপ। এই হচ্ছে আমাদের দেশের শিক্ষার গণতন্ত্র। দেশের অন্য কোন জেলার শিক্ষার পরিবেশ না জানি কেমন, তবে হলফ করে বলতে পারি বর্তমানে আমাদের এই ময়মনসিংহ জেলার শিক্ষার মান অনেক ভালো। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের কর্ণধার যারা আছেন, তাদের কাছে জোর দাবি জানাই, শিক্ষকদের পাশে এসে দাঁড়ান; দয়া নয়, করুণা নয়, একটু ভালোবাসার হাত প্রসারিত করুন, দেখবেন শিক্ষাদান বাণিজ্য নয়, প্রকৃত শিক্ষাদানে রূপ নেবে। কেননা শিক্ষা কোন বাণিজ্যের বিষয় নয়, কেবল দান করার বিষয়। লেখক : সহঃশিক্ষক চারু ও কারুকলা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, মোমেনশাহী।