আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস
দলিলপত্র সংরক্ষণ প্রসঙ্গে
প্রফেসর ড. শরীফউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৩, ২২:১৭
আজ ৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। আর্কাইভস এবং দলিল সংরক্ষণ বিষয়ে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (সংক্ষেপে আইসিএ) ভিয়েনাতে তাদের কংগ্রেসে ২০০০ প্রতিনিধির সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা প্রতি বছর ‘আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস’ পালন করবেন। দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ৯ জুন, কারণ ঐদিন আইসিএ (১৯৪৮ সালের ৯ জুন) ইউনেস্কোর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। আর্কাইভস দিবসের মূল আবেদন হচ্ছে জনসাধারণ ও নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আর্কাইভস বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। স্বীকার করতে কোনো আপত্তি নেই যে, বাংলাদেশে আর্কাইভস ও দলিল সংরক্ষণ বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই অস্বচ্ছ, আর নীতি নির্ধারকদের অনেকেই আর্কাইভস বা দলিল সংরক্ষণের গুরুত্ব বিষয়ে উদাসীন। অনেকে মনে করেন যে, দলিলপত্র আর আর্কাইভস তো ইতিহাসবিদ আর গবেষকদের প্রয়োজন, অন্যদের এ বিষয়ে চিন্তা করা জরুরি না। কিন্তু আর্কাইভস একটি জাতির স্মৃতির ভাণ্ডার। আর্কাইভসে জমা থাকে জাতির সকল ধরনের তথ্য।
প্রতিটি দেশেই সরকারি পর্যায়ে একটি জাতীয় আর্কাইভস থাকে, যার অধীন একাধিক প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক আর্কাইভস থাকতে পারে। আমাদের দেশে একটি মাত্র জাতীয় আর্কাইভস আছে, কিন্তু কোনো আঞ্চলিক আর্কাইভস নেই। সরকারি আর্কাইভসের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পৌরসভা আর্কাইভস সৃষ্টি হয়। এখানে মূলত শহরের বিভিন্ন সংগঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্থাপনা, বাসস্থান, খাজনাসহ প্রতিটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্যাদি সংরক্ষণ করা হয়। যে কোনো পৌরসভা আর্কাইভসে এলাকার যাবতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডের দলিল সংরক্ষণ করা হয়।
জাতীয় ও আঞ্চলিক আর্কাইভসে সাধারণত রাষ্ট্রীয় ও সরকারি দলিলপত্র গুরুত্ব পেয়ে থাকে তবে গুরুত্বপূর্ণ হলে বিভিন্ন সামাজিক এবং ব্যক্তি পর্যায়ের দলিলপত্রও সরকারি আর্কাইভসে সংরক্ষণ করা হয়।
বাংলাদেশে আর্কাইভস এবং দলিল সংরক্ষণে সরকারের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হচ্ছে ন্যাশনাল আর্কাইভস অব বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস। জাতীয় আর্কাইভস আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণাগার। এখানে জমা থাকে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি দলিল। জাতীয় আর্কাইভসকে বলা হয় জাতির স্মৃতির আধার। জাতীয় আর্কাইভসকে শক্তিশালী করা বা কার্যকর করার জন্য ১৯৮৩ সালে জারি হয় ন্যাশনাল আর্কাইভস অর্ডন্যান্স। এই অর্ডন্যান্সের বলে জাতীয় আর্কাইভস সারাদেশ থেকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সংগ্রহ করবে, বিদেশ থেকে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট বা বাংলাদেশ থেকে সূত্রপাত হওয়া দলিল সংগ্রহ করবে, বেসরকারি পর্যায়ের সকল আর্কাইভসকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিবে, দলিলপত্র প্রদর্শনী করবে, সংগৃহীত দলিলপত্রের তালিকা প্রস্তুত ও প্রকাশ করবে।
জাতীয় আর্কাইভস পরিচালনার জন্য এর নিয়মিত স্টাফের অতিরিক্ত সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষাবিদদের একটি বেশ ক্ষমতাশালী এডভাইজারি কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এই কাউন্সিল সরকারি দলিলপত্র সংরক্ষণ, হেফাজত ও ধ্বংস করার বিধি প্রণয়ন করবে।
আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসের মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতে আনতে পারি যে, দলিলপত্র শুধু ইতিহাস রচনার উপকরণই নয়, এটি দেশের আত্মপরিচয় এবং অধিকার প্রতিষ্ঠারও হাতিয়ার। একই সাথে নীতি নির্ধারকদেরকেও জানানো যায় যে, দলিলপত্রের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ সুশাসন ও উন্নয়নের সহায়ক।
জাতীয় আর্কাইভসকে শক্তিশালী করতে হবে। এখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষিত স্টাফের নিয়োগ দিতে হবে। জাতীয় আর্কাইভসকে স্বতন্ত্র পরিদপ্তরের মর্যাদা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে।
বর্তমানে দলিলপত্র সংরক্ষণের অবস্থা বাংলাদেশে বেশ নাজুক অবস্থায় আছে।
লেখক :অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়